অন্ধকার, অন্ধকার এবং অন্ধকারের গল্প

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

এক.

শাখাইতি বাজারটা ছোট্ট গ্রামের বাজার হলেও লোক সমাগম কম হয় না। চারপাশের ছোট ছোট যতসব গাঁও-গেরাম আছে, সেসব গ্রামের মানুষ অন্যত্র না গিয়ে এখানেই জিনিসপত্র বেচাকেনা করতে আসে। এ বাজার থেকে আবার টাউনের দূরত্ব খুব বেশীও নয়। আবার কমও নয়। গ্রামের সাধারণ মানুষ এই শাখাইতি বাজার থেকেই মাছ, তরিতরকারী, চাল, ডাল, লবণ, তেল অর্থাৎ নিত্যদিনের জিনিসপত্র কিনে থাকে। জেলা শহরে যেতে বাস ভাড়া চলে যায় পনের থেকে সতের টাকার মতো। সিএনজি ওয়ালারা নিয়ে নেয় বাইশ টাকার মতো। তাই চারপাশের গরীব লোকগুলো পয়সা খরচ করে শহরে যেতে চায় না। তারা জানে এই গাড়ী ভাড়ার পয়সা দিয়ে একটা পাঁতিলাউ কিনে নিতে তাদের কষ্ট হবে না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই শাখাইতি বাজারে যে মাছটা যে দামে পাওয়া যায় সেই মাছ শহরের পুরাণ বাজারে একই দামে বিক্রি হয়। তাই মানুষ কোন দুঃখে শহরে যাবে। শুধু মামলা-মোকদ্দমার জন্যে যারা শহরের কোর্ট কাছারিতে যায়, তারা ফেরার সময় সুযোগ পেলে এটা-ওটা কিনে নিয়ে আসে। এছাড়া এখন সময়ের পরিবর্তন হয়েছে। পল্লীবিদ্যুৎ আর সৌরবিদ্যুতের বদৌলতে বাজারের ব্যবসায়ীদের আর কুপি বাতি জ্বালিয়ে ব্যবসা করতে হয় না। ঘরে ঘরে এখন বৈদ্যুতিক বাতি ঝলমল করে। বাজারে কেনাকাটা চলে বলতে গেলে প্রায় রাত দশটা-সাড়ে দশটা পর্যন্ত। তবে এই গল্পটা বাজার নিয়ে নয়। গল্পের কাহিনী হচ্ছে অন্য জায়গায়।

শাখাইতি বাজারের পাশ দিয়ে যে ছোট্ট নদীটা চলে গেছে তার কোনো নির্দিষ্ট নাম নেই। কেউ বলে এটা নদী নয়। এটা বাজারের খাল। সারাদেশে একবার খাল কাটার উৎসব শুরু হয়েছিলো তখন আমাদের চেয়ারম্যান সাব এই খালে কোদালের কয়েকটি কুপ দিয়ে ঢাকা গিয়ে পুরস্কার এনেছিলো। চেয়ারম্যান সাব সেই পুরস্কার আনার পর থেকে এই বাজারের খালের নাম হয়ে যায় পুরস্কার নদী। বর্ষায় খুব বেশী বৃষ্টি হলে নদীটা উঠতি বয়সি কোন কিশোরীর মত উচ্ছসিত হয়ে উঠে। এর বাইরে কোনো ধরণের উন্মত্ততা এই পুরস্কার নদীর মধ্যে দেখা যায় না। বাজারের মনা পাগলা বলে, শালার চেয়ারম্যানের ভাগ্য! খালের মাঝে কোদালের দু’য়েকটা কুপ দিয়ে পুরস্কার পেয়ে প্রথম হয়ে গেলো। ঢাকা গিয়ে বড় বড় মানুষের সঙ্গে ছবি তুলে নেতা বনে গেলো। মনা পাগলার কথায় কেউ কান দেয়না। তাই চেয়ারম্যানের ছেলেপুলেরাও কিছু মনে করে না।

সকাল থেকে বাজারে গুঞ্জন চলছে, পুরস্কার নদীতে একটা নয় দুইটা নয়, চার চারটা লাশ ভাসছে। ছোট্ট বাজারের গুঞ্জন বাতাসে ভর করে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পঙ্গপালের মতো চারদিক থেকে মানুষ ছুটে আসতে থাকলো। আইনের বড় বড় লোক দুই টাকা, তিন টাকা, চার টাকা, সাত টাকা, আট টাকা দামী পত্রিকার সাংবাদিক সহ টেলিভিশনের সাংবাদিকরাও ছুটে এসেছে খবর পেয়ে। সবাই ভীড় জমিয়েছে পুরস্কার নদীর দুই পাড়ে। পুলিশের লোকজন কাউকে কাউকে আবার ধমকাচ্ছে। কারো কারো কাছ থেকে জেনে নিতেও চাইছে নদীতে এরকম লাশ আগে কখনও ভেসে এসেছে কিনা।

সমবেত জনগণ পুলিশের প্রশ্নের উত্তরে বলেছে, আমরা কেন, আমাদের মৃত পূর্বপুরুষেরাও কখনো এই খালে বা তার আশেপাশে এরকম বেওয়ারিশ লাশ দেখেনি। আমরাতো দূরের কথা। একটা পুলিশ কনষ্টেবল, মনা পাগলার উত্তরসূরী বাজারে নুতন আসা পাগলটাকে জিজ্ঞেস করে, ‘বলতো এতোগুলো লাশ কিভাবে এখানে ভেসে এলো             ?’ পুলিশের কথা শুনে পাগলাটা ভেংচি কেটে বলে, ‘মরেছে, মরেছে। কেউ মেরেছে। তাই ভেসে এসেছে।’ পুলিশ পাগলটার পাছায় একটা বারি দিয়ে বলে, ‘ভাগ শালা। পাগলামীর সময় এখন নয়।’ পাগলটাও বলে, ‘ঠিক বলেছো, তোমাদের পাগলামীর সময় এখন নয়।’

থানা পুলিশের বিভিন্ন শাখার লোকেরা এখানে এসেছে। চারপাশে এত লোকজন হয়েছে যে, তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, সবাইকে একে একে জিজ্ঞাসাবাদ করে সবকিছু জেনে নেওয়া। একজন সেকেন্ড অফিসার মুখ ফসকে বলে ফেলে, ‘এদের এতো জিজ্ঞাসাবাদ করে কি হবে? খুনতো আর ওরা করেনি। অন্য কোথাও থেকে মেরে এনে হতভাগাদের লাশ এখানে ফেলে দিয়েছে।’

সেকেন্ড অফিসারের কথা শুনে উর্দিপরা অন্য একজন অফিসার (সম্ভবত থানার ওসি হবে) রাগান্বিত হয়ে সেকেন্ড অফিসারকে বলেন, ‘মাসুম তুমি এতো কথা বল কেন। এখনো ঘটনার তদন্তই হয়নি। আর তুমি একটা সিদ্ধান্ত দিয়ে দিলে।’ ধমক খেয়ে মাসুম নামের অফিসারটি কাচুমাচু হয়ে বললো, ‘সরি স্যার ভুল হয়ে গেছে। এমনটি আর হবে না। এবারের মতো মাফ করে দেন।’

– এমনটি হবে না মানে। তোমার মনে নেই, তোমাকে নিয়ে বাস ডাকাতির একটা তদন্ত করতে গিয়ে কি বিপদে পড়েছিলাম। আমি কয়েকজন লোককে ধরে গাড়ীতে তুলতে যাবো, তখন তুমি বললে, স্যার এদের ধরে কি হবে? ওরাতো আর বাসে ডাকাতি করেনি। যারা করেছে, তারা পালিয়ে গিয়েছে।

– ওরা স্যার নিরীহ মানুষ ছিলো। তাই বলেছিলাম।

– চুপ করো।

– আচ্ছা স্যার।

– আচ্ছা স্যার কি আবার? তুমি কোন কথা বলবে না।

– ঠিক আছে স্যার মুখ বন্ধ করলাম।

দু’জনের কথাবার্তায় বুঝা গেলো, যে লোকটা মাসুম নামের অফিসারটাকে ধমকাচ্ছে সে তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তা হবে।

পুলিশের লোকজন পুরস্কার নদী থেকে লাশ তুলে তাদের সব কাজকর্ম সেরে হতভাগা চারজনের লাশ নিয়ে মর্গে যেতে যেতে বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো। লাশগুলো যখন নদীর পাড়ে তোলা হলো তখন বিকট গন্ধে কেউ কাছে ঘেষতে পারেনি। কেউ নাকে রুমাল দিয়ে, কেউবা নাকে হাত দিয়ে মৃত মানুষগুলোকে চেনার চেষ্টা করছিলো। কিন্তু মৃত ব্যক্তিদের কারও পক্ষে চেনা সম্ভব হয়নি। কখনো তাদেরকে এই তল্লাটে দেখা যায়নি। কয়েকজন সুইপার নাকে মুখে শরীরে কেরোসিন মেখে এবং গলায় পাগলা পানি ঢেলে মাতলামি করতে করতে লাশগুলো পুলিশের গাড়ীতে তুললো। বড় অফিসারটি বাজার কমিটির নেতাদের সঙ্গে কি সব কথা বলে এবং একটা কাগজে তাদের টিপ দন্তখত নিয়ে চারটি  লাশ নিয়ে চলে যায়। মৃত যুবকদের শরীরে কোনো কাপড় ছিলো না। পুলিশেরা বলাবলি করছে, দেখে মনে হয় ওদের শ্বাস রোধ করে কিংবা বিষ প্রয়োগ করে মেরেছে। শরীরে তো কোনো জখমের চিহ্ন নেই। যে পুলিশের লোকটা মৃত চার যুবকের সুরতহাল করেছে, সে বাজার কমিটির নেতাদের বলেছে, এখন কিছু বলা যাবে না। ময়না তদন্ত করলে আসল রহস্য বের হয়ে আসবে। মাসুম নামের সেকেন্ড অফিসারকে যে অফিসারটি ধমকাচ্ছিলো, সেই অফিসারটি গাড়ীতে উঠার আগে, জড়ো হওয়া লোকদের উদ্দেশ্যে আমাদের দেশের নেতাদের মত একটা বক্তব্য দিয়ে সবাইকে আশ্বস্থ করার জন্য বলতে থাকলো, আপনারা এখন বাড়ী যান। এসব কিছুই না। দুস্কৃতিকারীরা মাঝে মধ্যে আমাদের আইন-শৃঙ্খলায় ব্যাঘাত ঘটাতে চায়। এমনিতে দেশের আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিকই আছে। আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অপরাধীদের ধরে ফেলবো। বাড়ীতে গিয়ে চা-নাস্তা করেন। আপনারা অনেক কষ্ট করেছেন। রাতের খাবার খেয়ে শান্তিমত ঘুমান। ভয় পাবেন না। দেশে শান্তি বিরাজ করছে।

পুলিশ লাশগুলো নিয়ে যাবার পর শাখাইতি বাজার এখন নীরব। যে সব দোকানপাট রাত দশটা এগারোটা পর্যন্ত খোলা থাকে, সেগুলোও সন্ধ্যারাতে বন্ধ হয়ে গেছে। আশেপাশের গ্রামগুলিতেও কোনো কোলাহল নেই। শিশুরাও কান্নাকাটি করতে ভয় পাচ্ছে। যুবক, বয়স্করা ভয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে। এই সন্ধ্যারাত্রির অন্ধকার আরো গভীর থেকে গভীরতর হয়ে চারিদিকে তার তমসাচ্ছন্ন অন্ধকারের চাঁদর বিছিয়েছে। তরুণী রাত্রির এই ঘন অন্ধকার গ্রামের বয়স্করাও কখনো দেখেনি। গ্রামে-গঞ্জে যেন অঘোষিত কারফিউ চলছে। কারো মুখে কথা নেই। কথা বলতেও মানুষগুলো ভয় পাচ্ছে। এ অঞ্চলের গ্রামের মানুষ কখনো নদীতে লাশ ভেসে আসতে দেখেনি। তার মধ্যে একটা নয়, দুটি নয়, চার চারটি লাশ পুরস্কার নদীতে ভেসে এলো কোথা থেকে। এটারতো তেমন স্রোতও নেই। কারো কারো কাছে এটা নদীও নয়। খাল বিশেষ। খাল কাটার অভিযানের সময় বড় নদীর সঙ্গে অর্থাৎ খোয়াই নদীর সঙ্গে খালটাকে যোগ করা হয়েছিলো।

শাখাইতি বাজারের চারপাশে প্রায় কয়েকদিন থেকেই শ্মশানের মতো নীরব নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। কোথাও জনমানবের কোনো কোলাহল নেই। মানুষগুলো ভয়ে হাসি ঠাট্টা রাতের খাবারের কথা সব ভুলে গেছে। এখনও শিশুরা কান্নাকাটি করতে ভয় পাচ্ছে। বড়দের মুখে আতঙ্কের ছবি দেখে শিশু বালক-বালিকা আর কিশোর-কিশোরীরাও যেন বুঝতে পেরেছে গ্রামের মানুষের সামনের দিনগুলো ভালো যাবে না। তার মধ্যে আবার অনেক বাড়ী থেকে পুরুষরা উধাও হয়ে গেছে। এক কথায় বাজারের আশপাশের অর্থাৎ পুরস্কার নদীর দুকূলের গ্রামগুলির জনমানবের প্রতিদিনের জীবন যাপনের গতিধারায় ছন্দপতন ঘটেছে যেন। মানুষগুলো নির্বাক। সবার মনে আশংকা কখন কাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। এর মধ্যে যারা কোর্ট কাছারিতে আসা-যাওয়া করে মামলা মোকদ্দমার অভিজ্ঞতা আছে, তারা বলে গেছে মুখ বন্ধ করে চলতে। বেশী কথা বললে বিপদে পড়তে হবে। হাটে বাজারে বসে লাগাম ছাড়া কথা বললে কপালে খারাপি আছে। এখন পুলিশের বাণিজ্যের সময়। উল্টাপাল্টা কথা বললেই পুলিশ মামলায় ফাঁসিয়ে দেবে। পুলিশ যদি একবার কাউকে মামলায় ঢুকাতে পারে তবে তার আর নিস্তার নেই। শুরু হবে তাদের বাণিজ্য। মামলায় আসামী করে রিমান্ডের ভয় দেখিয়েও পুলিশ পয়সাকড়ি নাকি খেয়ে থাকে। এমন কথাও মানুষ শুনেছে। গ্রামের টাউটারও কম নয়। তারাও পুলিশের ভয় দেখিয়ে গ্রাম গঞ্জের সহজ-সরল মানুষের কাছ থেকে টাকা-পয়সা হাতিয়ে থাকে।(চলবে)

ছবি: গুগল

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments