অন্যরকম ইস্ট ভিলেজ বুক

স্মৃতি সাহা

গ্রীষ্মের তপ্তদিন, অনুগামী ছায়া যখন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়, কাঠাফাঁটা রোদ্দুরে ভর দুপুরে একটি দু’টি কাকের তীব্র কন্ঠে “কা কা” ছাড়া আর কোন আওয়াজ নেই, মাথার উপরে সিলিং ফ্যানের ঘটাং ঘটাং আওয়াজে মা নিমগ্ন তখন ভাতঘুমে। আর আমি খুব চুপিসারে মায়ের পাশ থেকে উঠে গিয়ে “দস্যু বনহুর” বা ” ছোটদের মহাভারত” হাতে নিতাম ; বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে আনা এই বইগুলি দিয়েই আমার বই পড়ার সূচনা হয়। এরপর থেকে “বই পড়া” আমার জীবনে এক অন্য জায়গা নিয়ে আজও অধিষ্ঠিত। যখন কোন কারণে খুব স্নায়ুর চাপে ভুগি তখন আমি বই পড়ি, এটা আমার মেডিটেশনের কাজ করে। বাহ্যিক সবকিছু থেকে সরিয়ে মন ওই বইটাতে কেন্দ্রীভূত হয়, আমার মনের অস্থিরতা উপশম হয়। বইয়ের কালো কালো অক্ষরে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়ে আমি কল্পনার রাজ্যে ঘুরতে থাকি, আমি গল্পের চরিত্রগুলোর সঙ্গে হেঁটে বেড়াই, ওদেরকে অনুভব করি। বইয়ের সঙ্গে থাকা সময়টুকু আমি পুরোপুরিভাবে বইয়ের হয়ে যাই বা সময়টা শেষ হবার পরেও কিছু সময় গল্পের চরিত্ররা আমার সঙ্গেই থাকে। এদেশে আসার পর সবথেকে যে জিনিস বেশি মিস করতাম তা হলো বই। তখনো এখানকার পাবলিক লাইব্রেরী’র সঙ্গে পরিচয় হয়নি। একদিন জ্যাকসন হাইটস্-এ গ্রোসারী করতে গিয়ে একটি ভারতীয় দোকানের সন্ধান পেলাম সেখানে সানন্দা,দেশ এসব ম্যাগাজিনের সঙ্গে কিছু বাংলা বইও আছে। বিদেশ বিভুঁইয়ে এমন বই পেয়ে আমার মন যেন সাতরঙা রঙধনু হয়ে উঠলো। কিন্তু সে রঙ খুব বেশীক্ষণ স্থায়ী হয়নি, বই হাতে নিয়ে ডলারে দাম দেখে সব রঙ হারিয়ে মন ধুসর হয়ে উঠলো। বইটা সেলফে ফিরিয়ে দিয়ে সেদিন বাসায় ফিরেছিলাম। আমি তখনো জানতাম না এই নিউইয়র্কেই রয়েছে বইয়ের বিশাল ভান্ডার সমৃদ্ধ বুকস্টোর। আর এইসব বুকস্টোর স্বকীয় যে কোন দিক থেকেই। ব্যস্ত এ নগরীর অধিকাংশ মানুষ বই পড়তে ভালবাসে। যদিও এই শহরের মানুষের হাতে অতিরিক্ত সময় থাকে না, তাই যে টুকু সময় পায় কাজের বাইরে তা তারা বইয়ের পিছনেই দিয়ে থাকে। এখানকার সাবওয়ের ট্রেনগুলোতে সকালে যখন সবাই ছুটে কাজে বা বিকেলে শ্রান্ত হয়ে বাড়ির পথে তখন অধিকাংশ মানুষের হাতে বই থাকে। ট্রেনের ভিতরের এক ঘন্টা বা আধা ঘন্টা তারা কাটিয়ে দেয় বইয়ের সঙ্গে। আর ঠিক এ কারণেই এই শহরে রয়েছে অসংখ্য পাবলিক লাইব্রেরী, বুকস্টোর। তবে এই বুকস্টোর বা লাইব্রেরীর মধ্যে ‘ইস্ট ভিলেজ বুক’ বোধ হয় বেশ একটু আলাদা। নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে ‘ইস্ট ভিলেজ বুক’ ব্যবহৃত বই বিক্রি করে। পুরনো বই বিক্রি যাকে বলে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত বইয়ের সংগ্রহ নিয়ে এই বুকস্টোরটি একটি অন্য মাত্রা এনে দেয় “বুকস্টোর” এর ধারণায়। সাহিত্য, শিল্প, ধর্মীয়, বিজ্ঞান, অংক, রম্য, রিভিউ সহ প্রায় সব ধরণের পুরনো আর ব্যবহৃত বই পাওয়া যায় এই স্টোরে। নিউইয়র্ক টাইমস্-এর বেস্ট সেলার আর কিছু ক্লাসিক সাহিত্যের সংগ্রহ এই বুকস্টোরকে সত্যিই অন্য মাত্রা দিয়েছে। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই বুকস্টোর প্রতি সপ্তাহে ৫০০ কপি ব্যবহৃত বই ক্রয় করে থাকে। তবে এখানে অনেকেই বই ডোনেট বা দান করেন। তাই তাদের সংগৃহীত বইয়ের একটি বড় অংশ আসে এই দান থেকেও।
নিউইয়র্কের মতো এমন সুসজ্জিত শহরের প্রাণকেন্দ্র ম্যানহাটনে ব্যবহৃত বইয়ের দোকান দেখে আপনি যতটা অভিভূত হবেন তার থেকেও বেশী অভিভূত হবেন এখানকার পাঠকদের আগ্রহ দেখে। বুকস্টোর থেকে বই কিনে পাশের কোন কফিশপেই ঘন্টা দু’ই কাটিয়ে দেয় এরা বইয়ের সঙ্গে কফি হাতে! এমন মনোযোগী পাঠকের জন্যই হয়তো এই শহরের আনাচে কানাচে পাবলিক লাইব্রেরি, বইয়ের স্টোর, ব্যবহৃত বইয়ের স্টোর দেখা যায়। নিউইয়র্কের পাঠকদের বই প্রীতি আসলে বলে শেষ করা যাবে না। এরপর কোন একদিন এখানকার পাবলিক লাইব্রেরীর গল্প।

ছবিঃ গুগল