অন্যরকম ভালোলাগা…

অমিতরূপ চক্রবর্তী

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

বারান্দা থেকে তোলা জয়গাঁ শহরের ছবি। তখন সন্ধ্যে নামছে

জয়গাঁয় গইরিগাঁও বলে একটা জায়গা আছে। জয়গাঁ বাসস্ট্যান্ড পেরিয়ে হাতের ডানদিকে যে গলিগুলো পরে, সেগুলো দিয়ে ঢুকে গেলেই গইরিগাঁও। গলির রাস্তাগুলো সমতল থেকে ক্রমশ পাহাড়ে উঠেছে। পাহাড়ের গায়ে সুন্দর বসতি আছে। পাহাড়ের ধস রোধ করার জন্য পাহাড়ের গা বোল্ডার সসেজ করে বাঁধানো হয়েছে। তাতে শ্যাওলার চাদর। বুনো ফুল আর ফার্নের ঝোপ। বাড়ির হাতায় যেসব গাছ, তাদের ডালে নতুন পাতা। জনবসতের যে স্বাভাবিক ছবি, তা সেখানে চোখে পড়বে। ছোট ছোট বাচ্চাদের হইহল্লা, ইউনিফর্ম পরা স্কুল-ফেরৎ কিশোরী, হেলমেট পরা বাইকার যুবক বা একমাথা শনের মতো চুল নিয়ে ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটা বৃদ্ধা। পাথরে বসে অবসরে গল্পে মশগুল ছেলেমেয়ে। জনবসতির শান্ত জীবনের ছবি।

আমি আগে কখনো এই জায়গাটায় আসিনি। ক’দিন আগেই যাবার সুযোগ হলো। সেদিন কাজের বেশ চাপ ছিলো। আমরা কয়েকজন সেদিন বেশ সময় ধরে কাজগুলো করে শেষ করলাম। শেষ বিকেলে আমাদেরই চেনাজানা কতগুলি ছেলে এসে বলল ‘কাজ তো প্রায় শেষ, চলুন একটা জায়গা থেকে ঘুরে আসবেন।’

এদের মধ্যে দীপক লামা ছেলেটি খুব মিশুকে। বড়োসরো চেহারা কিন্তু সবসময় ওর মুখে হাসি লেগেই আছে। ওদের বাইক ছিল। শেষে ওদের বাইকে না গিয়ে আমরা অটোতে বাসস্ট্যান্ড পেরিয়ে নেমে বাকিটা হেঁটে গেলাম। সময় ক’টা হবে তখন? সাড়ে ছ’টা। কোথাও রোদের চিহ্ন আর নেই। চারপাশে বিকেলের ধূসর সাদা। গলিপথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ক্রমশ পাহাড়ের গায়ে উঠে এলাম। চড়াই রাস্তার একদিকে খাদও চোখে পড়লো। খাদের ওপরে পাথরের সসেজ। তার ওপরে মানুষজন বসে আছ। আকাশে মেঘ। পাখি উড়ছে।

পাহাড়ে উঠেই একটা বাঁক ঘুরে ছোট্ট একটা রেস্টোরান্ট। মাথায় টিন আর দেওয়াল বাঁশের তৈরি। ছেলেগুলো আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে বলল ‘চলুন, পেছনে একটা বারান্দা আছে। ওখানে বসে কিছু খাব।’

বারান্দাটা একবারে পাহাড়ের গা থেকে যেন বেরিয়েছে। নীচে তাকালে জংগল আর পাথরে ভরা খাদ দেখা যায়। দূরে ম্যাপের মতো ছড়ানো জয়গাঁ। সবুজের ফাঁক দিয়ে কখনো সুতোর মতো মেইন রোডের উঁকিঝুঁকি। এখান থেকে ধারণা করা যায় না যে কোথায় কী। শুধু পাহাড় থেকে সমতলে একটা নকশাদার মাদুরের মতো জয়গাঁ শহরটাই চোখে পড়ে।

দীপক লামা ছেলেটি এগিয়ে এসে বললো ‘কেমন মনে হচ্ছে? দার্জিলিং বা কার্শিয়াং-এর মতো নয়?’ আমরা বললাম ‘একদম।’ বারান্দাটায় তখন গা-জুড়োনো প্রচুর হাওয়া বইছে। সমস্ত ক্লান্তি-শ্রান্তি দূর করে দেওয়া হাওয়া। লোহার পাইপ দিয়ে রেলিং করা। তার গায়ে হাত রেখে দূরে নকশিকাঁথার মতো শহরটার দিকে তাকালে মনকেমন লাগে। এই শহরটার কারা থাকে? কেমন মানুষ তারা? তাদের ঘরের ভেতরটা কেমন?- এইসব অদ্ভুতরকমের ভাবনা মাথায় আসে। দীপক লামা বললো ‘এখানে মোমো পাওয়া যায়, খাবেন?’ না করার প্রশ্নই ছিলো না। গরম গরম ভাঁপানো মোমো এলো। চা এলো। সেসব খেতে খেতে আবার দূরে তাকালাম। আবারও মনে হলো ঠিক এই মুহূর্তে ওই শহরটায় সমস্ত ঘরে-পরিবারে আলাদা আলাদা একটা সময় কেটে যাচ্ছে। কোথাও হয়তো আনন্দ, কোথাও হয়তো বিষাদ, কোথাও হয়তো বিপন্নতা, বিপদের ছায়া। সফলতা-বিফলতা পাশাপাশি। যেমন পাহাড়ের গায়ে এই একচিলতে বারান্দাটায় আমরা ভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর, ভিন্ন ভাষাভাষীর কয়েকজন পাশাপাশি বসে মোমো খাচ্ছি, চা খাচ্ছি, কথা বলছি। ইন্টিগ্রেশন ইন ডাইভারসিটি বোধহয় এমনই কিছুকে বলে।

আমি কথা বলছিলাম না। কথা বলতেও ইচ্ছে করছিলো না। শুধু মনে হচ্ছিলো এই অফুরান হাওয়া-মাখা বারান্দাটায় বসে যদি বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া যেতো।

ছবি: লেখক ও গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box