অন্য রবীন্দ্রনাথ…

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যার মধ্যে নিজেকে, নিজের শৈশবকে খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর।কৌতুক ছলে নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে শমী ঠাকুর বলেও ডাকতেন রবীন্দ্রনাথ।শমী ছিলেন বাবার পঞ্চম ও কনিষ্ঠ পুত্র।১৮৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ছ’টায় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে শমীন্দ্রের জন্ম।জন্মের প্রায় চৌদ্দ মাস পরে শিশু শমীর অন্নপ্রাশন অনুষ্ঠিত হয়।পঞ্চম সন্তান হলেও তাঁর অন্নপ্রাশনে আড়ম্বরের অভাব ঘটেনি।এমন সমারোহ বড় দাদা দিদিদের অন্নপ্রাশনেও হয়নি।

ঘোড়ায় বসা শমীন্দ্রনাথ

মাত্র ছয় মাস বয়সে শমী মাতৃহারা হন।মাত্র এগারো বছর বয়সে্ মার মৃত্যুর ঠিক পাঁচ বছর পর শমীও চলে যান পৃথিবী ছেড়ে।সর্বকনিষ্ঠ এই সন্তানের মৃত্যুর ঘটনাকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন ‘একটি বিপ্লব’।এমন নীরব নিষ্ঠুর বিপ্লব কবির জীবনে খুব কমই এসেছে।বাইরে তিনি শান্ত ও অবিচল থেকেছেন। পরিচয় দিয়েছেন ধৈর্য্ ও সংযমের।কিন্তু ভিতরে ভিতরে শমীকে হারানোর শোক তাকে দগ্ধ করেছে সারাজীবন।কবি হয়তো শমীকে নিয়ে বড় কোন স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু শমীর অকাল মৃত্যুর নির্মম আঘাতে সে স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়।
রবীন্দ্রনাথের লেখায় ঘুরেফিরে এসেছে শমী। রচনায় শমীর সাদৃশ্য রয়েছে। ডাকঘর নাটকের অমল,বৃক্ষপ্রেমী বালক বলাই যেন শমীরই প্রতিচ্ছায়া।আর ‘শিশু’ কাব্যের নায়ক খোকা যে শমীন্দ্রনাথ তা রবীন্দ্রনাথ নিজেই স্বীকার করেছেন।
শমীকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নজনের কাছে শমী প্রসঙ্গে তার চিঠিগুলো পাঠ করলেই বোঝা যায় শমী কবির কতটা জুড়ে ছিলো।এখানে শমী প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কয়েকটা চিঠি হুবহু দেয়া হলো।এ থেকেই শমীর প্রতি কবির ভালোবাসার তীব্রতা বোঝা যায়।সামান্য হলেও উপলব্ধি করা যায় কবির নির্বাক শোক।
সুবোধচন্দ্র মজুমদারকে

“কল্যাণীয়েষু,
শমীর প্রতি দৃষ্টি রাখিয়ো।উহার আহারাদির সময় তোমরা একজন কেহ উপস্থিত থাকিলেই শরীরের অবস্থা কতকটা বুঝিতে পারিবে।যেদিন ক্ষুধা নাই বলিয়া খাইবে না সেইদিন সমাধান হইবে।বিদ্যালয় হইতে বাড়িতে যাতায়াতের সময় অথবা খেলার সময় অধিক্ষন রৌদ্র যেন না লাগায়।উমাচরণকে কাছাকাছি সর্বদা হাজির রাখিবে।দাস্ত কোন দিন হইল না বা পেটের অসুখ করিল উমাচরণ যেন তোমাদের খবর দেয়।জ্বরের ভাব আরম্ভ হইবামাত্র Aconite 30 ডিগ্রি অথবা belladonna 30 ডিগ্রি
দিবে- পেটের গোলমালের সূত্রপাতেই NUX 30 ডিগ্রি দিবে। কুঠিবাড়িতে [‘শান্তিনিকেতনে’বাড়ি] দোতলাতেই রথীর সঙ্গে শমী শুইবে- তুমিও যদি সেকানে শুইতে পার ত ভালো হয়।”

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি

( কবিপত্নী মৃণালিনী মৃত্যুর ঠিক দশ দিন আগে ছয় বচরের শিশু শমীন্দ্রকে শান্তিনিকেতনে পাঠিয়ে রবীন্দ্রনাথ মানসিকভাবে যে উদ্বেগ বহন করেছেন তার ছবি এখানে ধরা পড়েছে )

কনিষ্ঠ জামাতা নগেন্দ্রনাথকে

“কল্যাণয়েষু
শমীর য়খন হঠাৎ মৃত্যু ঘটিল তখন সে সংবাদ বিদেশে রথীকে না দেবার জন্য অনেকে আমাকে অনুরোধ করেছিল। কিন্তু সংসারে ঈশ্বর যখন আমাদিগকে দুঃখ দেন তকন সম্মুখে দাঁড়াইয়া কাহাকে বহন করিতেই হইবে- রথীর বাগে যে দুঃখ পড়িয়াছে যতই কষ্ট হউক রথী তাহাকে শিরোধার্য্ করিয়া লইবে ইহাই কর্তব্য জানিয়া শমীর মৃত্যুর পরেই আম তাহাকে সংবাদ দিতে বিলম্ব করি নাই।সেই আঘাত হৃদয়ে গ্রহন করিয়া যদি তাহার কোনো মঙ্গল না ঘটিয়া থাকে,যদি তাহার জীবনধারা পুর্বাপেক্ষা গভীরতর পূর্ণতর না হইয়া থাকে তবে সে দুর্ভাগ্য- কিন্তু মহৎ দুঃখ যখন ঈশ্বর প্রেরন করেন তখন অকুন্ঠিত চিত্তে পৌরুষের সহিত তাহাকে অভ্যর্থনা করিয়া লইতেই হইবে।আঘাত যত বড়, তাহাকে গ্রহন করিবার সামর্থ্যও তত বড় হওয়া চাই। কাপুরুষের ন্যায় শোকের নিকট পরাস্ত হইও না।তোমার সমস্ত মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করিয়া এই শোককে পবিত্র দেবদূতের ন্যায় অন্তঃকরণের মধ্যে স্বকিার করিয়া লও।”
( নগেন্দ্রনাথ এ সময় আমেরিকায় অধ্যয়নরত।তার পিতার মৃত্যুসংবাদ জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে চিঠি লেখেন তারই প্রাসঙ্গিক- অংশ এখানে উদ্ধৃত করা হলো।)

মীরাদেবীকে

“ এসেছি সংসারে, মিলেচি, তারপর আবার কালের টানে সরে যেতে হয়েচে, এমন কত বারবার হোলো, বারবার হবে-এর সুখ এর কষ্ট নিযেই জীবনটা সম্পুর্ণ হয়ে উঠচে।যতবা ফাঁক হোক আমার সংসারে, বৃহৎ সংসারটা রয়েচে, সে চলচে, অবিচল মনে তার যাত্রার সঙ্গে আমার যাত্রা মেলাতে হবে।কত অসহ্য দুঃখবেদনা ঘরে ঘরে আছে, কাল প্রতিদিন তা একটু একটু করে মুছে মুছে দিচ্ছে।আমার জীবনের উপর সেই বিশ্বব্যাপী কালের হাত কাজ করচে। নীতুকে (মীরাদেবীর একমাত্র পুত্র) খুব ভালবাসতুম তাছাড়া তোর কথা ভেবে প্রকাণ্ড দুঃখ চেপে বসেছিল বুকের মধ্যে।কিন্তু সর্বলোকের সামনে নিজের গভীরতম দুঃখকে ক্ষুদ্র করতে লজ্জা করে।অনেকে বললে এবারের বর্ষামঙ্গল বন্ধ থাক- আমার শোকের খাতিরে- আমি বললুম সে হতেই পারে না।আমার শোকের দায় আমিই নেব- বাইরের লোকে কি বুঝবে তার ঠিক মানেটা।যে রাত্রে শমী গিয়েছিল সে রাত্রে সমস্ত মন দিয়ে বলেছিলুম বিরাট বিশ্বসত্তার মধ্যে তার অবাধ গতি হোক, আমার শোক তাকে একটুও যেন পিছনে না টানে।তেমনি নীতু চলে যাওয়ার কথা যখন শুনলাম তখন অনেকদিন ধরে বারবার বলেচি, আর তো আমার কোনো কর্তব্য নেই, কেবল কামনা করতে পারি এর পরে যে বিরাটের মধ্যে তার গতি সেখানে তার কল্যাণ হোক। সেখানে আমাদের সেবা পৌঁছায় না, কিন্তু ভালবাসা হয়তো বা পৌঁছয়- নইলে ভালোবাসা এখনো টিকে থাকে কেন?শমী যে রাত্রে গেল তার পরের রাত্রে রেলে আসতে আসতে দেখলুম জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্চে, কোথাও কিছু কম পড়চে তার লক্ষণ নেই।মনে বললে কম পড়েনি- সমস্তর মধ্যে সবই রয়ে গেছে, আমিও তারি মধ্যে।সমস্তর জন্যে আমার কাজও বাকি রইল।যতদিন আছি সেই কাজের ধারা চলতে থাকবে, সাহস যেন থাকে, অবসাদ যেন না আসে, কোনোখানে কোন সূত্র যেন ছিন্ন হয়ে না যায়-যা ঘটেচে তাকে যেন সহজে স্বীকার করি, যা কিছু রয়ে গেল তাকেও যেন সম্পূর্ণ সহজ মনে স্বীকার করতে ত্রুটি না ঘটে।
( মীরাদেবীর একমাত্র পুত্র নীতীন্দ্রনাথের অকালমৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথ কন্যাকে সান্ত্বনা দিয়ে এই চিঠিটি লেখেন )

আবিদা নাসরীন কলি
তথ্যসূত্র : কবিপুত্র শমী বই থেকে