অপার হয়ে বসে আছি!!

আহমেদ মুশফিকা নাজনীন

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

কি করো মা, ব্যস্ত ? তোমার গলাটা খুব শুনতে ইচ্ছে করলো, তাই ফোন দিলাম। একটু ব্যস্ত খালাম্মা। পরে তাহলে ফোন দেই। আপনার শরীর কেমন? ভালো আছি মা। ঠিক আছে, কাজ করো। ফোনটা রেখে দেন বড় খালা শাশুড়ি ( যাকে আমরা সবাই বড়খালাম্মা বলি)। বুঝলাম, দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা রাখলেন তিনি। আমারও খারাপ লাগলো। রাতে যেয়ে ফোন দিব ভেবে কাজে মন দেই। কিছু পরে ভুলে গেলাম খালাম্মার কথা। আব্বা ফোন দিলেন দুপুরে। বললেন, তোমার গলাটা এমন লাগছে কেন ? ঠান্ডা লেগেছে আবার ? হাতে পায়ে সরিষার তেল গরম করে লাগাও। ফ্রিজের পানি খেওনা। আব্বা আমি একটা মিটিংয়ে আছি। একটু পরে কথা বলি ? ও আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে মা। আব্বা ফোনটা রেখে দেন। মনে মনে ভাবি বাসায় যেয়ে রাতে কথা বলবো। আব্বার জন্য দেশাল থেকে নীল, পেষ্ট রঙের টি শার্ট কিনেছি। তা বলতে হবে। ক’মাস আগে দিনাজপুরে যাই। মা ( আমার শাশুড়ি ) আমাকে একটা ডিপ লাল রঙের জামা গিফট করেন। আমি মনে মনে ভাবি, হায়রে মা….. আমার কি আর আপনার মতো গায়ের রঙ! এ জামা আপনার রঙে খুব মানায়। মাঝে মাঝেই মার হাত ধরে বলি, মা আপনি কত ফর্সা, আর আমি কত কালো। মা শান্ত মৃদ হেসে বলেন তোমার রঙ কোথায় কালো, অনেক সুন্দর রঙ তোমার! তারপর আমরা দু’জনই হেসে উঠি। আমি জামাটা বানাই। মনে মনে ভাবি, অফিসে পড়ে যেয়ে ছবি তুলবো তারপর ছবিটা ফেসবুকে দিবো । মা যেন দেখতে পান। আমার আর দেয়া হয়না। পরে দিব ভেবে দিন চলে যায়। একদিন ফোন করেন মা, তার অপির জন্য মন কেমন করছে। শীত চলে গেলেই আসবেন ঢাকায়। আমরা অপেক্ষায় থাকি। কদিন পর শুনি, মা চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আব্বার ফোন আসে। বড় খালাম্মার ফোন আসে। আমি ব্যস্ততায় কখনো কথা বলি, কখনো ফোন রেখে দেই। মাঝে মাঝে বিরক্ত হই। আব্বা একটু পরে কথা বলি? যেন আমার মতো এত ব্যস্ত মানুষ পথিবীতে আর নেই। একদিন বড় খালাম্মা ফোন দেন। দিয়েই বলেন তুমি শুধু কথা বলে যাও। আমি একটু শুনি ? তোমার গলা, অপির গলা খুব শুনতে ইচ্ছে করে। সারাদিন শুয়ে থাকি তো । তোমাদের কথা খুব মনে হয়। আমি কেঁপে ওঠি। রিক্সায় যেতে যেতে অনর্গল কথা বলি তার সঙ্গে।উনি চুপ করে শোনেন। একদিন ফোন আসে, কথা বলেন অন্য স্বর, জানান, বড়খালাম্মা চলে গেছেন নীল আকাশে। ফোন দেই বাবাকে। অষ্পষ্ট কি যে বললেন বুঝলাম না। সারাদিন মনের মধ্যে কু ডাকে। ভাইয়া জানায়, আব্বা ভালো আছেন। নাতিদের সঙ্গে খেলেছেন, দুষ্টামী করেছেন। চিন্তা করো না। ৬ তারিখে ঢাকা যাবেন তোমার কাছে। সেই যে আমি অপেক্ষায় আছি। আর আসেনা আব্বা। আসেনা আর তার ফোন। আমার ফোনের প্রথম নাম্বারটাই আব্বার। মাঝে মাঝে ধরে দেখি তাদের নাম্বারগুলো। আমার মন ভেঙেচুড়ে যায়। রংপুর থেকে ফোন দেন গনি ফুপা। বলেন, বৌমা তোমার কথা খুব মনে পড়লো। তাই ফোনটা দিলাম। আমি ব্যকুল হয়ে থাকি তার ফোনের জন্য। আম্মা ফোন দেন। সকাল, কখনো দুপুর, কখনো রাত সাড়ে ১০টায়। আমি আর বলিনা আমি ব্যস্ত। আমার যত কাজ থাক, পৃথিবী ভেসে যাক। আমি আর কখনো বলবনা পরে ফোন দেই? আমি এখন মাঝে মাঝেই আকাশের দিকে তাকিয়ে গলা ছেড়ে বলি, বড় খালাম্মা, আব্বা , মা, মনি ভাবী, শিউলী আপা, লালা ভাই, মহসিন ফুপা,রানী ফুপু, জ্যোতি ফুপা তোমরা আর একবার ফোন দাও। দেখো তোমাদের মেয়ে কত কথা বলবে তোমাদের সঙ্গে।
ফোন গুলো আর আসেনা। সব চুপ। যেন ওরা বোবা হয়ে গেছে। লিখতে বসে বারবার মনে হচ্ছে আতিকা রোমা, ফাহমিদা আপা, আর স্বপন ভাইয়ের কথা। সম্প্রতি তাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছেন তাদের প্রিয় মা। জানি মায়ের ফোনের রিং টোনের অপেক্ষায় আমার মতই কাটছে তাদের বিষন্ন দিন!

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে