অপেক্ষা…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নিজামুল হক বিপুল

বয়স আর কত-ই বা হবে। এই তেরো কি চৌদ্দ। গরিব ঘরের মেয়ে হলেও গায়ে গতরে বেশ সুন্দর সুশ্রী। স্বাস্থ্যও মন্দ না। যাকে বলে স্লিম। কালো হরিণ চোখ দুটো দেখলেই গাঁয়ের ছেলেরা একেবারে উথালা হয়ে যায়। বড়গ্রামে রহিমার মত আর একটি মেয়েও নেই। মা মরে গেছে সেই কবে। বাপটাও অভাবে অভাবে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মারা গেছে চোখের সামনে। তারপর থেকেই পিঠাপিঠি পাঁচ ভাই-বোন বড় হয়েছে দারিদ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করে।

এ বাড়ি, ও বাড়ি কাজ করেই ভাই বোনদের বড় করছে শিল্পী। সবার বড় হওয়ায় ভাই-বোনদের দায়িত্বটা তার কাঁধেই নিতে হয়েছে। বড় বোনের কষ্ট দেখে এবং ছোট ছোট ভাই-বোনদের মুখে খাবার তুলে দিতে রহিমাও বোনের সঙ্গে পাশের গ্রামে বিভিন্ন বাড়িতে কাজ করে। চাচা রমজান মিয়া সবাইকে আগলে রেখেছে।

কাজের জন্য রহিমাকে প্রতিদিনই বাড়ি থেকে সেই সাত সকালে বের হতে হয়। মনিবের বাড়িতে ভোর থেকেই ঘর ঝাড়–, উঠোন ঝাড়– থেকে শুরু করে সাত সদস্যের পরিবারের সকালের নাস্তা তৈরি করা, সাহেবের গোসলের পানির বন্দোবস্ত করা, ছেলে-মেয়েদের চারজনকে স্কুলের জন্য তৈরি করে দেয়া সব কাজই করতে হয় এক হাতে। সাত সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দম ফেলার কোন ফুরসত নেই রহিমার। আবার দুপুর হতে না হতেই বেগম সাহেবা উঠেই দৌড়াবেন জরুরি মিটিং এ। সব সামাল দিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায়ই সন্ধ্যা হয়ে যায় রহিমার। এ নিয়েও তার দুশ্চিন্তার শেষ নেই। রাস্তাঘাটে বখাটেদের উৎপাত, নানান অশ্লীল কথা শুনতে হয়।

বড়গ্রামেরই যুবক কলিম মিয়া প্রতিদিন রহিমাদের বাড়ির কাছে তেমাথায় দাঁড়িয়ে থাকে। সকাল-সন্ধ্যা দু’বেলাতেই। বাড়ি বলতে নিজেদের জমি-জিরাত কিছু নেই, সরকারি খালের পাড়ে ছন-বাঁশের একটা খুপড়ি ঘর। এখানেই ভাই-বোনদের নিয়ে বসবাস রহিমা ও শিল্পী’র।

বাবা মরার আগে শিল্পী গ্রামেরই প্রাইমারী ইশকুলে যেতো। তিন কি চার ক্লাশ পর্যন্ত পড়তে না পড়তেই বাবার মৃত্যু তার লেখাপড়ায় ছেদ টানে। ইশকুলে পড়ার সময়ই স্বপ্ন দেখতো বড় হয়ে সে একদিন চাকরি করবে। অনেক টাকা মাইনে পাবে । ছোট ছোট ভাই-বোনদের লেখাপড়া শেখাবে, সংসার থেকে অভাব যাবে। নিজে পছন্দ করে একটা বিয়ে করবে, সংসার করবে… আরও কত কত স্বপ্ন…।

বড় বোন শিল্পী শারিরীক প্রতিবন্ধী হওয়ায় তার উপর পরিবারের চাপ কিছুটা কমাতে চেয়েছিল রহিমা। কিন্ত চাইলেই কি সব হয়। রহিমা যখন সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখে এক ঝাপটি পানি দিয়ে কোনভাবে নিজের পরনের জামা দিয়ে মুখটা মুছে দ্রুত বেরিয়ে পড়তো কাজে, একটু এগুতেই রাস্তার তে মাথায় কলিম মিয়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতো।

দেখতে খুব একটা খারাপ না হলেও সে খুবই অলস। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রহিমাকে দেখা ছাড়া আর কোন কাজই তার সহ্য হয় না। প্রথম প্রথম রহিমাকে কোন রকম বিরক্ত না করলেও কিছু দিন যেতে না যেতেই শুরু হয়ে যায় উৎপাত। মনিবের বাড়ির কাজ শেষে পশ্চিম আকাশে যখন গোধুলি নামতো তখনই রহিমা হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির পথে ছুটত…। কিছু বখাটে ছেলে তার পিছু নিতো আর নানান কটুক্তি করতো। বাড়ির কাছের সেই তেমাথায় গিয়ে দেখা পেতো কলিমের। সে অবশ্য ওই বখাটেদের মত অশ্লীল কথা না বললেও চেষ্টা করতো রহিমার মন জয়ের।

এভাবেই কয়েক মাস কেটে গেছে। এরই মধ্যে গ্রামের বিভিন্ন জনের কাছ থেকে রহিমার বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকলো চাচা ফোরকান মিয়ার কাছে। কলিমের বাবা জসিম মিয়াও প্রস্তাব দেন ছেলের জন্য। কিন্তু এখনই বিয়ে করতে চায় না সে। নানা অজুহাত দেখিয়ে সময় নেয় রহিমা।

দিন কয়েক গত হতে না হতেই এক রাতে কাজ থেকে ফিরে রহিমা দেখতে পায় বাড়ির উঠোনে কূপি বাতি জ¦লছে। অনেক মানুষ। উঠোনে বসে চাচা তাদের নিয়ে নানান গল্পগুজব করছেন। পিছন দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে রহিমা। সে কি কান্ড, ঘরের ভিতরেও বেশ কযেকজন বিভিন্ন বয়সী মহিলা। বুঝতে আর বাকি থাকে না, বিয়ের কথা পাকা করতেই তাদের আগমন। মতামত না নিয়েই বিয়ের দিন-তারিখ পাকা হয়ে যায়। সামনের অগ্রাহায়নেই কনে তুলে দেয়ার দিনক্ষণ ঠিক হয়।

নিজের মত না থাকলেও প্রতিবাদ করার শক্তি নেই রহিমার। তাই কলিমকে স্বামী মেনে নিয়েই তার সঙ্গে সংসার শুরু হলো। এবার নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করে রহিমা। স্বামীর হাত ধরে তার সংসারে সুখ আসবে। সুদিন আসবে…।

বিয়ের ছয় মাস যেতে না যেতেই শুরু হয় সংসারে নানান টানাপোড়েন। স্বামী অলস মানুষের মত দিন রাত ঘরেই বসে থাকে। কোন কাজে যায় না। সারাক্ষণ শুধু ঘুম আর ঘুম। সংসার চালাতে হয় রহিমাকেই। এ নিয়ে ঝগড়া লেগে থাকে নিত্য। এরই মধ্যে রহিমার পেটে প্রথম সন্তাানের আগমন। সে ছয় মাসের অন্তঃসত্তা। এবার তাকে ঘরে রেখে স্বামী কাজে যেতে শুরু করেছে। রহিমা ভাবলো যাক, সন্তান আসছে দেখে স্বামী তার কাজে যাচ্ছে এটিও মন্দ নয়।

কিন্তু চার মাস পর সব উল্টে গেলো। রহিমা ফুটফুটে এক কন্যা সন্তানের জন্ম দিলো। স্বামী আর শ^শুর বাড়ির লোকজন মোটেই খুশী নয়। তারা একটা ছেলে প্রত্যাশা করেছিলো। সন্তান জন্মের কিছুদিন পরই আবারও কলিম মিয়া কাজ বাদ দিয়ে পূর্বের অবস্থায় ফিরে গেছে। রহিমাকেই আবার হাল ধরতে হয় সংসারের।

সারাদিন মনিবের বাড়িতে কাজ শেষে রাতে বাড়ি ফিরে রান্না করা, ঘর গোছানোর কাজ শেষ করতে না করতেই শরীর ভেঙ্গে পড়ে রহিমার। ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দেয় বিছানায়। সেখানেও শান্তি নেই…। ঘরে থাকা অলস স্বামী ঝাঁপিয়ে পড়ে তার উপর। শরীর নিয়ে খেলে…। তার চাই একটা ছেলে সন্তান। রহিমা বাধা দিতে চাইলেও শক্তিতে পেরে উঠে না।

বছর না যেতেই আবারও রহিমা মা হতে যাচ্ছে। কিন্তু এবারও তার ঘরে আরেকটা ফুটফুটে কন্যা সন্তান। স্বামীর মুখ কালো হয়ে গেছে। নানান গালমন্দ করতে থাকে। এদেরকে তুই খাওয়াবি। আমি কোন রোজগার করতে পারবো না- বলে চিৎকার চোঁচামেচি করতে থাকে কলিম মিয়া। রহিমাও কম যায় না, এতো চেঁচোমেচি করো কেন? খাওয়াই তো আমি-ই। বেটা মানুষ হয়ে… শরম করে না…। গাঁয়ের লোকজন শুনলেও এসব নিয়ে কারো কোন মাথা ব্যথা নেই।

দুই সন্তানকে নিয়ে রহিমা কাজ করে, সংসার চালায়। অলস স্বামীর মুখে খাবারও তুলে দেয়। রাত হলে আবার তাঁর ক্লান্ত দেহকে স্বামীর চাহিদা মেটাতে হয়। কাজে না গেলেও স্বামী তার একটা ছেলে সন্তানের জন্য মরিয়া। বছর না ফিরতে আবারও মা হয় রহিমা। এবারও কন্যা সন্তান। শুরু হয় গালমন্দ, অপয়া…মাগী… ছেলে মানুষ জন্ম দেয়ার মুরদ নাই…। স্বামীর এসব কথা সহ্য হয় না। তবুও হজম করে।

একে একে চার কন্যা সন্তানের পর একটি ছেলে সন্তানের দেখা মিললো রহিমার ঘরে। কিন্তু তাতে তার স্বামীর চরিত্রে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসেনি। সে আগের মতই বাড়িতে বসে অলস সময় পার করে। মাঝে মধ্যে গ্রামের ছেলেদের সঙ্গে জুয়ার দানে বসে। সর্বস্ব হারিয়ে কলিম মিয়া রাতে যখন বাড়ি ফিরে রহিমার দেহে তখন কোন শক্তি নেই…
ফি বছর সন্তান জন্ম দিতে দিতে ক্লান্ত রহিমা এখন আট সন্তানের জননী। যে কিশোরী ছিলো গায়ে গতরে বেশ সুশ্রী তার শরীর ভেঙ্গে চৌচির। বয়স তার ত্রিশ এর ঘরে আসার আগেই যেন বৃদ্ধা। একদিকে লালনপালন করে সন্তানদের বড় করা, অন্যদিকে সংসারের খাবার জুটানো, তাকে সবই সামাল দিতে হচ্ছে একহাতে। ঘুম কাতর স্বামী তার বাড়িতে বসে দিন পার করে দিলেও সন্ধ্যা হলেই জুয়ার নেশায় ছুটে যায় …।

রহিমা যে সুখের স্বপ্ন দেখেছিল সেটি যখন প্রায় মরতে যাচ্ছে তখনই এক দুর সম্পর্কের খালা আমেনা বেগম নিয়ে আসেন বিদেশ যাওয়ার প্রস্তাব। রহিমাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখান, বিদেশ গেলে অনেক টাকা আয় করা যাবে, সংসারে অভাব থাকবে না। বড়গ্রাম ও আশপাশের গ্রামের আরও অনেক মহিলা বিদেশ গেছে, তিনি নিজেও গেছেন। অনেক টাকা কামাই করে এই তো সেদিন দেশে এসেছেন। সপ্তাহ তিনেক পর আবারও চলে যাবেন। বলেন, তুই চল, দেখবি অনেক টাকা কামাই করতে পারবি। সংসারেও অভাব থাকবে না। জায়গা জমি কিনতে পারবি, পাকা ঘর করতে পারবি আরও কত কি…।

লোভে পড়ে যায় রহিমা। নতুন করে স্বপ্ন বুনতে থাকে। বুঝতে পারে না, নিজের অজান্তেই আমেনার টোপে পড়ে যায়। বড়শিতে যেমন টোপ ফেলে মাছ শিকারি ঠিক সে রকম। সব শুনে কলিম মিয়াও রাজি হয়ে যায়। দালাল ধরে তড়িগড়ি করে পাসপোর্ট তৈরি হয় রহিমার। আমেনা বলে, তুই একা যাবার দরকার নেই। আমার সঙ্গে যাবি। তোর জন্য আমি ছুটি দুই সপ্তাহ বাড়িয়েছি। আদতে আমেনা হচ্ছে দালাল দলের সদস্য। গ্রামে গ্রামে ঘুরে দরিদ্র পরিবারের মহিলা-যুবতীদের নানান লোভ দেখিয়ে বিদেশ যাওয়ার জন্য রাজি করানোই তার কাজ।

দেনা করে দালালের হাতে টাকা তুলে দেয়। কোলের সন্তানসহ আট সন্তানকে রেখেই আমেনার হাত ধরে বাড়ি ছাড়ে রহিমা, স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়ে একদিন পাড়ি জমায় আরব দেশে। বিমান থেকে নেমেই সবকিছু তার কাছে রঙিন লাগতে শুরু করে। আরও অনেক মহিলা, সবার চোখে-মুখে স্বপ্ন। আমেনাকে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে রহিমা। কিন্তু আগেই ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে কেটে পড়েছে আমেনা। অগত্যা চোখের জল ফেলতে ফেলতে বিদেশী দালালের সঙ্গে অন্য সবার মত গাড়িতে উঠে রহিমা। কোথায় নিয়ে যায়- কিছুই বুঝে উঠতে পারে না।

দিন যায়, মাস যায়, দেশে স্বামী-সন্তানদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে না। একবার এক দালালের সহযোগিতায় স্বামীকে ফোন করেই অঝোরে কান্না…। কোন কথাই বলতে পারেনি, শুধু একটা কথাই স্বামী শুনতে পেয়েছিল আমাকে নিয়ে যাও…। কথার মধ্যেই লাইনটা কেটে গেলো।

বহুদিন রহিমার খোঁজ নেই। এরই মধ্যে ঘরে সেয়ান মেয়ে ছেলে রেখেই কলিম মিয়া আমোদ-ফুর্তিতে মেতে উঠে আরেক তরুণীর সঙ্গে। সুরমা বেগমের সঙ্গে দারুণ সখ্য গড়ে উঠে তার। একদিন সুরমা ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া একটা ভিডিও দেখায় কলিমকে। রহিমা অঝোর ধারায় কাঁদছে। রহিমার কান্নায় আকাশ ভাঙ্গছে, বাতাস ভাঙ্গছে। আর ইথারে ইথারে একটা কথাই ভেসে বেড়াচ্ছে… তুমি আমাকে বাঁচাও… তুমি আমাকে এইখান থেকে নিয়ে যাও…।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]