অফিস যাত্রীর ডায়েরি… ১০

ওবায়দুল ফাত্তাহ তানভীর

মরণ হরন

 আধ ঘন্টা ধরে সিগন্যালে দাড়ানো, সব গাড়ি চুপচাপ। শুধু আমার পেছনের গাড়িটা থেকে থেকেই পিপ পিপ করে হর্ণ বাজাচ্ছে। কি উদ্দেশ্যে, কার জন্য, অনবরত পিপ পিপ করছে, বোঝার চেষ্টা করলাম। কোন কারন খুঁজে পেলাম না। প্রায় মনস্থির করেই ফেলেছি আরেক বার পিপ করলেই নেমে জিজ্ঞেস করবো এই অকারন হর্ণের রহস্য, তখনি সিগন্যালটা ছেড়ে দিলো। পেছনের গাড়িটাও একটু ফাঁক পেয়ে পিপ পিপ করতে করতে পাশ কাটিয়ে সামনে চলে গেল। একটু এগুতেই আবার জ্যাম, এবারে ওই গাড়িটা আমার সামনে দাঁড়ানো, মনে হলো এবার আমি ওর মত করে হর্ণ বাজাতে থাকি। ব্যাটা বুঝুক অকারনে হর্ণ বাজলে কেমন লাগে। ভাবনার সঙ্গে সঙ্গেই ছোটবেলায় পড়া শিশু পাঠ নাচতে নাচতে চোখের সামনে হাজির- কুকুরের কাজ কুকুর করেছে, কামড়ে দিয়েছে পা-য়, তা বলে কি সে কাজ করা মানুষের শোভা পায়? মধ্যবর্তী মানুষ হবার এই এক সমস্যা, যাত্রার বিবেক সব সময় আশপাশেই ঘুর ঘুর করে। উল্টাপাল্টা কিছু করবার কথা ভাবলেই সামনে এসে গেয়ে ওঠে- ওরে ভোলা মন….. একটা রিয়েলিটি শো করলে কেমন হয়- ‘বয়রা রাজা’ বা ‘রাজা কালা’ এমন নামে? মহাখালি মোড়ে যে সব থেকে বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে তাকে এই খেতাব দেয়া হবে। মহাখালি মোড়ে দিনের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়ে অংশগ্রহনকারীকে পাঁচ মিনিট দাড়িয়ে থাকতে হবে। তারপর তাকে কানে কানে শোনানো হবে রাগাশ্রয়ী কোন গান। সে যদি রাগান্বিত না হয়ে ঠিকঠাক মত সেই রাগ গেয়ে শোনাতে পারে, তবেই তাকে বিজয়ী ঘোষনা করা হবে।আমি নিশ্চিত এ এক অসাধ্য কাজ, এ প্রতিযোগীতায় কোন বিজয়ী পাওয়া যাবে না। পাঁচ মিনিট কেন, মহাখালিতে দু’মিনিট দাড়ালেই হর্ণের বিকট শব্দে কান ভোঁ ভোঁ করে, বুক ধুকধুক করে, মাথা চক্কর দেয়। এখানে আসা মাত্রই চালক ভাইরা যেন ফুর্তির আতিশয্যে প্রতিযোগীতায় নামেন মরণ হরনের কিংবা হরনে মরণ নিশ্চিত করনের। হঠাৎই চারপাশে বিবিধ শব্দের হর্ণ শুনে আমি রিয়েলিটি শো- র জগত থেকে ঢাকার রাস্তায় আছড়ে পরলাম, আমার দিবাস্বপ্ন হলো ছিন্ন। আবার আমার হাটি হাটি পা পা করে গাড়িতে চড়ে এগিয়ে চলা শুরু হলো। স্কুলে আমি অনেক কিছুই শিখতে পারিনি, কিন্তু যে জিনিষ বেশ ভালো রপ্ত করেছি- সেটা হলো শ্রেণীকরন। এই যেমন এখন ঢাকার গাড়ি চালকদের হর্ণ বাদনের ভিত্তিতে তাদের শ্রেণীকরন করে ফেলতে পারি। আমার মতে এরা চার প্রকারের- প্রথম প্রকার, সুর-রসিক চালক। এদের চেনা যায় তালে তালে হর্ণ বাজানো দেখে। এদের জীবনে আশা ছিলো বাদক হবে, জীবনের টানে হতে হয়েছে চালক। সময়ের অভাবে কোন বাদ্য যন্ত্রের সঙ্গে দাম্পত্য হয়নি, শেষ সম্বল তাই হর্ণই ভরসা। যখনি মনের কোনে সুরের প্রকোপ হানা দেয় তখনি তারা হর্নকে আশ্রয় করে। সবার তাছে তা বিরক্তিকর হলেও এরা ভাব প্রকাশে নির্ভীক, কোন আইন বা হুমকিতেই ভাব প্রকাশে পিছপা হয় না। এদের গাড়ি পেছনে তাই সবাইকে সাদর আমন্ত্রন জানিয়ে লেখা থাকে- ‘ভেপু বাজান’।দ্বিতীয় প্রকার হলো, নবজাতক। ঢাকা রাস্তায় ওস্তাদের হাত ধরে অর্বিভাব। নবীন চালক বলে সব সময় আশংকায় থাকে পাছে কেউ নতুন বলে অবহেলা করছে। তাই সবাইকে জানান দিতে, সতর্ক করতে, হর্নের উপর বসে থাকে। তৃতীয় দল ক্ষমতাবান। গুরু গম্ভীর হর্ণ বাজিয়ে সবাইকে সতর্ক করে- হুশিয়ার, হুশিয়ার.. এখন পথে নেমেছে খানে-খানা-জাহাপনা, ওরফে সরকারবাড়ির ছানা। পথ ছাড়ো সবে, সরে দাড়াও, আমার কিন্তু অনেক ক্ষেমতা…। চতুর্থ দলে আছে সব পোস্টার বয়-রা। এরা হর্ণ হুদাই, বাজায় ভোদাই টাইপ। এরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। কেন হর্ণ বাজায় নিজেও জানে না। বাকিরা সব দুধ-ভাত। আমিও এই দুধ-ভাতের কাতারে থেকে হালকা কয়েকবার পিপ পিপ করে পৌছে গেলাম অফিসে। তাই আজকের মত আমার কথাটি ফুরোলো, নটে গাছটি মুড়োলো…