অফিস যাত্রীর ডায়েরি… ১১

ওবায়দুল ফাত্তাহ তানভীর

রূপকথা

শেরশাহের আমলে টাকায় আট মন চাল পাওয়া যেত- আমার সমসাময়িক সবাইকে সম্ভবত এই উক্তিটি কখনো না কখনো শুনতে হয়েছে। আসলে আমার বড়ই হয়েছি এই উক্তিটা শুনতে শুনতে। ছোটবেলায় এই উক্তিটা শোনা মাত্র আমার প্রতিক্রিয়াটা হতো – ফালতু গল্প, রূপকথা। পান্থপথ সোনারগাঁ সিগন্যালে বসে আছি মাত্র ৪০ মিনিট। সহসাই সিগন্যাল ছাড়বে তেমনটা ভাবার কোন কারন ঘটেনি। চারপাশে সব অচল বাহন আর মানুষ দেখে ভাবনারা আড়াল আবডাল থেকে উঁকিঝুঁকি মারার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই সব ভাবনাসমুহের একজনার বাস এই পান্থপথেই। নব্বইয়ের দশকে পান্থপথ তখনো মিরপুর রোডে মেশেনি। সোনারগাঁ মোড় থেকে শুধু গ্রীনরোড অংশটা তখন চালু হয়েছে। সে সময় আমার একটা খেলা ছিলো, সোনারগাঁ মোড়ে এসে গাড়ির গতি বাড়ানো। বসুন্ধরা সিটির (তখনো চালু হয়নি) কাছাকাছি এসেই গাড়ির গতি উঠে যেত ৮০ কিলোমিটারে। এখন চারপাশে দেখলে মনে হয় সেটা বোধ হয় আমার কল্পনা, শুধুই রূপকথা। ওই সময়ে রামপুরা থেকে মৌচাকের রাস্তায় গাড়ির গতি হতো গড়ে ষাট কিলোমিটার। রাস্তা ফাঁকা থাকায় এটাই ছিলো স্বাভাবিক গতি। বাংলাদেশের কোন হাইওয়েতেও এখন এই গতিতে আর গাড়ি চলে না। বিশ্বব্যাংকের মতে ২০১৭ সালে ঢাকায় গাড়ির গড় গতি ছিলো ঘন্টায় ৭ কিলোমিটার। ২০১৯ এর শুরুতে দাঁড়িয়ে নিঃসন্দেহে বলা যায় সেটা আরো কমেছে। এখন আমি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করি- আসলেই কি এ শহরে কোনদিন দুরন্ত গতিতে গাড়ি চলেছে? না এগুলো সবই রূপকথার মতোই অলীক কল্পনা? পুরো শহরটা ধীরে ধীরে কেমন যেন স্হবির হয়ে যাচ্ছে। আমরাও তার সঙ্গে সুন্দর মানিয়ে নিচ্ছি। অনেকটা খুব কাছের মানুষের কোন পরিবর্তন যেমন চোখে পরে না তেমনি। অনেকদিন পর দেশের বাইরে থেকে ফিরলে কিছুটা বোঝা যায় কতটা বদলেছে এ শহর, এখানকার মানুষ। শহরের এই ধীরগতি, স্থবিরতায় এখন আমরা অভ্যস্থ। আমাদের দৈনন্দিন কাজেকর্মে আমরা এখন এই বাড়তি সময়টাকে হিসাবে ধরেই পরিকল্পনা করি। কেউ সেটাকে এখন দেরির অজুহাতে ব্যবহার করলে বিরক্ত হই। বিদেশি কেউ যখন এটাকে সমস্যা হিসাবে তুলে ধরে তখন আমরা গলা ফুলিয়ে তর্ক করি। প্রমান করার চেষ্টা করি এটা আমাদের স্বাধীনতার প্রকাশ। আমরা সত্যিকারের স্বাধীন বলেই কোন আইন মানতে রাজি নই, আর তার কারনে যদি ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তায় কাটাই সেটাই সই। ‘ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাটিয়া চলিলো, কিছুদুর গিয়া মর্দ রওয়ানা হইল’- লোক কাহিনীর এই কথাগুলো নতুন করে লেখবার সময় এসেছে। ‘ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাটিয়া চলিলো, কিছুদুর গিয়া মর্দ ফিরিয়া চলিলো’। এভাবেই তাহলে আমরা শুরু করি নতুন দিনের নতুন রূপকথার…

ছবি: লেখক