অফিস যাত্রীর ডায়েরি… ১২

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ওবায়দুল ফাত্তাহ তানভীর

জ্ঞান পাপোশ 

“কোন দেশে বাস করেন? বাংলাদেশ না সিঙ্গাপুর?”- টুপিতে লতাপাতা আঁকা, তারমানে নিশ্চিত একজন কেউকেটা। তাঁর মুখে মুখে কথা বলা বেয়াদবির সামিল, তারপরো তাঁর জ্ঞাতার্থে মিন মিন করে বললাম এখনো বাংলাদেশেই বাস করি বলে বোধ হচ্ছে। সুলুক সন্ধানের কারন, আমার জানতে চাওয়ায়- মাধ্যমিক পরীক্ষা উপলক্ষ্যে পরীক্ষাকেন্দ্রের আশপাশের এলাকায় গাড়ি চলাচল এবং পার্কিং এর জন্য কোন বিশেষ নির্দেশনা আছে কিনা। এবছর ১৭/১৮ লক্ষ ছেলেমেয়ে এই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। এখনো এই পরীক্ষাটিকে ছাত্রছাত্রীদের বৃহত্তর জীবনে প্রবেশের প্রথম ধাপ হিসাবেই ভাবা হয়। স্বাভাবিক ভাবেই এই পরীক্ষাকে ঘিরে পরীক্ষার্থীসহ তাদের মা-বাবা, নিকট আত্বীয়দের মাঝে এক ধরনের উৎকন্ঠা কাজ করে। পরীক্ষাকেন্দ্রে সময় মত নিরাপদে উপস্থিতি নিশ্চিত করবার জন্য তাই একজন পরীক্ষার্থীর সঙ্গে একাধিক অভিভাবক সফরসঙ্গী হন। ফলাফল- পরীক্ষার দিন কেন্দ্রগুলোর চারপাশের রাস্তায় কয়েকগুণ যানবাহনের আনাগোনা, অবস্থান। নিয়মিত অফিসযাত্রীর জন্য একটু হয়তো বাড়তি বিড়ম্বনা, কিন্তু সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে সবাই সেটা মেনে নেন। এই আয়োজনগুলো বাৎ‌সরিক এবং দিন তারিখও অনেক আগে থেকে ঠিক করা। তাই রাজস্ব প্রদানকারী নাগরিক হিসাবে একটু কৌতুহল প্রদর্শনের ফলাফল সিঙ্গাপুর দর্শন। লতায় পাতায় আবৃত রাজন্য ভাবতেই পারেন আমার মত আদার ব্যাপারীর জাহাজের খোঁজ জানার কি দরকার? তাঁদের মনে হতেই পারে, আমরা, ফালতু জঞ্জালেরা, রাস্তায় বসে থাকবো – কোন দিন কম সময়, কোন দিন বেশি সময়, সেটা নিয়ে আবার প্রশ্ন করার কি আছে। আসলে আমাদের রাজন্যদের জ্ঞানভান্ডার স্বসীম। তাই তার ব্যবহারে তাঁরা বেশ যত্নবান। শুধু বিশেষ দিনে বা বিশেষ উপলক্ষ্যে তাঁরা আমাদের মত অর্বাচীনদের কিছু জ্ঞান বিতরন করেন। কিঞ্চিৎ আগাম সতর্কবার্তা জারী করেন, আজ অমুক সড়কে রাজকীয় সভা, তাই প্রবেশ নিষেধ, তমুক সড়কে সে উপলক্ষ্যে রাজপোষ্যরা গাড়ি পার্কিং করবেন, তাই তা পরিত্যাজ্য। রাজন্যদের কাছে আমরা, এই সব সাধারনেরা, যারা বাংলাদেশের পথে প্রান্তরে হাটে মাঠে ঘাটে বিছিয়ে আছি, ছিটিয়ে আছি, তারা অনেকটা পাপোশের মত। যখন তাঁদের মনে হয় তখন তাঁরা তাঁদের জ্ঞানচর্চিত জুতার পরশ দিয়ে আমাদের ধন্য করেন। পাপোশে জুতা মোছার মতো করে খুচরা-খাচরা কিছু জ্ঞান বিতরন করে ‘দিয়েছি যথেষ্ট’ বলে হাতে ঝাড়েন। এ এক তরফ। আরেক তরফে রাজন্য এবং রাজপোষ্য বিশিষ্টদের জ্ঞান বিতরনের অমানুষিক প্রয়াসে বাংলার মানুষ লবেজান। দেয়ালিকা থেকে শুরু করে টিভির টকেটিভ শো মারফত প্রতি মুহুর্তে পাতি-হাতি-ছাতি মার্কা জ্ঞানীদের জ্ঞান বিতরনের মহামারি চলে। আর আমরাও সব সুবোধ জ্ঞান পাপোশ, তাঁদের সেই মহান সব জ্ঞান শুষে নিজেরাই আজ নীলকন্ঠ। আমাদের এই নবলব্ধ জ্ঞান না পারি গিলতে, না পারি উগলাতে, কারন আমাদের চারপাশের যারা বাস করছে তারাও আমাদেরই মত এই জ্ঞান সমুদ্রে ডুবতে ডুবতে ভেসে আছে। এমনি ধারার জ্ঞান-কনিকার দেখা মেলে ট্রাফিক প্রসঙ্গ এলেই। বিশিষ্টজনেরা সাড়ম্বরে দাবি করেন ঢাকার বর্তমান অচলাবস্থার মূল নিহিত এর নগর পরিকল্পনায়, এ শহরে রাস্তার জন্য ২৫ ভাগ এলাকা বরাদ্দ না দেওয়ার কারনেই আজকের এই হাল। ইন্টারনেট নামের গুজবের উৎস থেকে জানা গেলো, ২৫ ভাগ রাস্তা শুধু মাত্র উত্তর আমেরিকায়তেই আছে। বাকি পৃথিবীর সবগুলো দেশ প্রায় ৮-১০ ভাগ রাস্তায় দিব্যি দেশ সচল রেখে শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি করছে। ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট যে একটি বিজ্ঞান, সেই জ্ঞানটা সম্পর্কেই এখনো আমরা অজ্ঞান। তাই প্রতিদিন পথে নামলেই চোখে পরে অভিনব কৌশলে একটি স্বাধীন জাতিকে রাস্তার নিগড়ে বাঁধবার কি দুর্ণিবার চেষ্টা। কখনো দড়িতে পথ আটকে, কখনো ডানে ঘোরার রাস্তায় দেয়াল তুলে সবাইকে সমগ্র শহর পরিদর্শনে বাধ্য করে, কখনো বা শ্রেফ বাড়িতে বসে থাকতে নির্দেশ জারী করে। নগরের পিতা-মাতা এবং তদীয় সোনার সন্তানদের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে তাই এখনো আমরা বাংলাদেশেই বাস করি। শুধু ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তায় যানজটে আটকে থেকে ঝিমাতে ঝিমাতে সিঙ্গাপুরের খোয়াব দেখি…

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]