অফিস যাত্রীর ডায়েরি… ১৩

ওবায়দুল ফাত্তাহ তানভীর

 নবাব সারথি

এমন ভাগ্য প্রতিদিন হয় না, যেদিন আপনি বাংলার শেষ নবাবকে আপনার সারথি হিসাবে পান। আমার আজকের অফিস যাত্রায়, বাংলার একজন শেষ নবাব আমার সারথি। আপনাদের ভাবনার জগতে প্রশ্নটা উঁকিঝুঁকি মারতে পারে- কে এই বাংলার নবাব? কেনই বা তাকে আমরা শেষ নবাব বলছি? সেটা বদহজম আকার ধারন করার আগেই চলুন সিনেমার ফ্ল্যাশ ব্যাক এর মতো একটু পেছন ফিরে তাকাই। অজ্ঞাত একদল স্বপ্নবাজ ঢাকায় নিকট অতীতে একটা নিঃস্ফল উদ্দোগ গ্রহন করেছিলো। তারা ঢাকার অভব্য বাসিন্দাদের একটু আলোকিত করার আশায় ‘পাবলিক শেইমিং’ বা জনসমক্ষে লজ্জা দেবার পদ্ধতিটা অস্ত্র হিসাবে বেছে নিয়েছিলো। তাদের মনে ক্ষীন আশা ছিলো, বাঙ্গালীর প্রিয়, জীবনের শেষ চিকিৎ‌সার মত এটাতে যদি কোন কাজ হয়। তাদের প্রচেষ্টা নিবেদিত ছিলো মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনাকে কাঁচকলা দেখিয়ে যারা ফুটপাতে মোটরবাইক চালায়, তাদের উদ্দেশ্যে। তারা এইসব অশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গকে বাংলার শেষ নবাব উপাধিতে ভুষিত করেছিলো আর ঘোষনাটা ফলাও করে অভিজাত এলাকা গুলশানের ফুটপাথগুলোতে ছড়িয়ে দিয়েছিলো। কয়েকটা ঘোষনার এখনো হয়তো আমাদের জাতীয় লজ্জাহীনতার নির্দশন হিসাবে সেখানে অবশিষ্ট রয়ে গেছে। আজ নির্দ্বিধায় বলা চলে, স্বপ্নবাজদের সে প্রচেষ্টা মাঠে মারা গেছে। বর্গীদের মতোই এখন ঢাকার ফুটপাথে বাংলার নবাবরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন অর্হনিশি। আজকে লাচার হয়ে আমিও তেমনি একজন নবাবের পশ্চাদগামী হয়ে চলেছি অফিস। আজকে আমার অফিস যাত্রা, রাইড শেয়ারের মোটরবাইকে। অ্যাপের ডাকে পাঁচ মিনিটে মান্যবর হাজির, হাতে ধরিয়ে দিলেন ব্র্যান্ডেড হেলমেট। সেটা পরে আমি আজকে উবার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। আমরা যাত্রা শুরুই করলাম ফুটপাথে। সামনের রাস্তাজুড়ে স্কুলগামীদের পদচারনা (আসলে রিক্সা-গাড়ি চারনা), সুতরাং বিনাবাক্য ব্যায়ে আমার সারথি তার বাইক তুলে দিলেন ফুটপাথে। পি-পি করতে করতে পথচারীদের গা ঘেঁষে চলে গেলেন পথের শুরুতে। লালবাতিতে সবাই দাড়ানো- আমার সারথিতো আর সাধারনের কাতারে পড়েন না। লালবাতি প্রযোজ্য নভিসদের জন্য, তিনি নভিস নন। সেটার প্রমান- আড়াআড়ি ট্রাফিকে একটু ফাঁক দেখেই ছুটে পৌছে গেলেন সড়কের মাঝ বরাবর। পরের সুযোগে রাস্তাপার। তারপর প্রকৃত নবাবের মেজাজে তীর বেগে ঘোড়া (মোটরবাইক) ছোটালেন আমার গন্তব্যের দিকে। আমিও জীবনের মায়ায় বাইকের পেছনের হাতল ধরে ঝুলে রইলাম তার বাহনে। ঢাকার জ্যাম এমনি কাঁঠালের আঠা, কিছুতেই পিছু ছাড়ে না। পরের মোড়ে পৌছে দেখা গেলো, যতদুর দেখা যায় গাড়ি আর গাড়ি, বাস আর বাস। কোথাও একচুল ফাঁকা নেই। আবারো বাংলার নবাবরে রক্ত তার ঘোড়ার মতই টগবগিয়ে উঠলো। চোখের পলকে তিনি পৌছে গেলেন উল্টা পাশের রাস্তায়। ডানপাশের রাস্তা ধরে আগের মতই ছুটে চল্লেন কোন দ্বিধাদ্বন্দ ছাড়াই। মাঝে একটা গাড়ি মুখোমুখি হবার ফলে গাড়ির জানালা দিয়ে একটা মুখ বের হয়েছিলো- কিছু উপদেশ বিতরনের আশায়। তাই দেখে আমার সারথির সে কি হুংকার। নির্ঘাত গাড়ির চালক মনে করেছে অন্যায়টা তারই, সেই বোধহয় উল্টা পথে যাচ্ছে। এই না হলে বাংলার নবাব… রেকর্ড সময়ে গন্তব্যে পৌছে, টাকা পরিশোধ করে, মাথা থেকে ব্র্যান্ডের বোঝা নামালাম। হেলমেট মুক্ত হয়েই মাথাটা চুলকাতে লাগলো। উকুন নাকি? বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাইলাম এই শিরোস্ত্রান আমার আগে কার মাথায় উঠেছিলো। নির্লিপ্ত ভাবে বল্লেন- ‘এক আপা। কেন মাথা চুলকায়? উকুন হবে হয়তো। আরে এগুলা কিছু না। ধুলেই চলে যাবে।’ বলেই পরের ডাকে সাড়া দিয়ে ছুট লাগালেন। স্তম্ভিত আমি, মাথা চুলকাতেও ভুলে গেলাম।চুলায় যাক আজ অফিসের কাজ, আজকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য, উকুন উৎখাত…

ছবি: লেখক