অফিস যাত্রীর ডায়েরি… ১৫

ওবায়দুল ফাত্তাহ তানভীর

বায়ুযান

বিভিন্ন যানের বায়ু খেতে খেতে আজ অফিস চলেছি বায়ুযানে। বায়ুযান ঢাকার কোন নতুন যানবাহন নয়, বরং এ হলো আপনার আমার সবার প্রিয় আদি ও অকৃত্রিম বাচ্চা ট্যাক্সির উত্তরসুরী যার খাদ্য বায়ু মানে বায়বিয় পদার্থ- তাই বায়ুযান। এদের আগমনের হেতু রাজন্যদের ষড়যন্ত্র। আমরা, যারা বাধ্য হয়ে ঢাকায় পরে থাকি, যাদের আর কোথাও যাবার সুযোগ নাই, সেই সব স্থায়ী ঢাকাবাসীরা প্রতিনিয়ত রাজন্যদের বিবিধ এক্সপেরিমেন্টের শিকার। তেমনি একটা এক্সপেরিমেন্ট হলো এইসব সবুজ রঙের কম্প্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস চালিত বাহন। আমারতো বেশ ছিলাম আমাদের কর্ণকুহর বিদির্নকরা ঠা ঠা শব্দধারী, ভকভক করে শীসাযুক্ত ধুম্রউদগীরনকারী ট্যাক্সির বাচ্চা মতান্তরে বেবিট্যাক্সিদের নিয়ে। তারা ছিলো আমাদের রাজপথের শোভা, সংগীতের শিক্ষক (তালযুক্ত ঠা ঠা শব্দে), ঢাকার জনসংখ্যা কমানোর (শীসাবিষ সমৃদ্ধ ধোঁয়া খাইয়ে) অন্যতম পন্থা। এসব কিছু রাজন্যদের মনে ধরলো না, তাই তাঁরা রাতারাতি এ শহর থেকে আমাদের সংগীত শিক্ষকদের করলেন বিদায়, আমদানি করলেন এই বায়ু খাওয়া যান। এই সব বায়ুযান বায়বিয় (আমার বোধের অগম্য) কারনেই সব নিয়মের উর্ধে। ভাড়া ঠিক করবার জন্য মিটার একটা আছে বটে। কিন্তু সেটা আসলে সাজিয়ে রাখাবার জন্য। আগেই চালকের সঙ্গে রফা করে বায়ুযানে উঠতে হয়, তাও শর্ত সাপেক্ষে- “মামা, পুলিশ জিগাইলে কইয়েন মিটারে যাই”। গ্যাসের প্রভাবেই কি না জানি না, এরা সব সময় চনমনে। হুট করে বাসের সামনে দিয়ে মোড় নেয়, দুই সারি গাড়ির মাঝ দিয়ে গুলির মত ছুটে যায়। মাঝে এদের দৌরাত্ব চরমে পৌছেছিলো। রাইড শেয়ার চালু হওয়াতে এখন একটু শান্ত, কতদিন থাকে কে জানে (চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী টাইপ)। আজকের অফিস যাত্রায় আমার চালক একজন উদীয়মান পাইলট। অনেকক্ষন ভেবে ভাড়া চাইলেন ৩০০ টাকা, শেষে রফা হলো ২৫০ এ। উঠবার জন্য দরোজা খুলে দিলেন। বায়বীয় বাহন, তাই হয়তো উঠতে হয় যথা বিহিত সম্মান প্রদর্শন করে। দরোজার সঙ্গে একটা দড়ি এমন ভাবে বাঁধা, মাথা না নুইয়ে উঠবার উপায় নেই। সম্মান প্রদর্শনে আপনি বাধ্য। যদিও চলেছি রফা করে, কিন্তু আমি উঠে বসতেই চালক ভাই প্রদর্শনির মিটারটা চালু করলো, পুলিশ প্রটেকশন। উড়ন্ত সুচনা হলো আমাদের যাত্রার। তরুন তুর্কী, এ হতেই পারে, তারপরে বাহনটাও ঝাঁ-চকচকে, বয়স এখনো তার ক্ষমতায় দাঁত বসাতে পারেনি। বিশ্ব রেকর্ড না হলেও সামনে ফাঁকা রাস্তাটা আমার পাড়ি দিলাম প্রায় চোখের নিমেষে। মোড়ে পৌছে বাসের সামনে দিয়ে ছিটকে রাস্তায় উঠে গেলাম, তারপর চল্লো এর ফাঁক দিয়ে, ওকে চাপিয়ে ছুটে চলা। মাঝে মাঝে মন্দ লাগে না এই শহরের আত্মহত্যার মিছিলে শামিল হতে। যানজটের এই শহর থেকে মুক্তির এক মাত্র উপায় উর্ধ্বমুখে যাত্রা- তাই হয়তো সবাই রাস্তায় বের হয়েই সে চেষ্টায় লিপ্ত হয়। খাঁচায় বন্দি চিড়িয়ার মত প্রদর্শিত হতে হতে চলেছি অফিসের পথে। পথে পথসঙ্গী হিসাবে পেলাম এক ঝাঁক হাঁস, তারাও বায়ুযানে আসীন হয়ে। আমি চলেছি কাজের বাজারে বিক্রি হয়ে, তারা চলেছে খাদ্যের বাজারে বিক্রি হতে। এ শহরে আমরা দু’জনেই পন্য, শুধু আকারে তফাত। একদিন রাজপথের সিগন্যালে প্রতিবেশি হিসাবে পেয়েছিলাম জনাব গরুকে- বায়ুযানে করে চলেছেন কসাইয়ের ডেরায়। আমি আবিস্কার করার চেষ্টা করছিলাম গরু সাহেবের বিপুল দেহখানি তার শহুরে রাখাল কি কৌশলে বায়ুযানের এই সীমিত পরিসরে আটালো। ভেবে কোন কুল পাইনি, শুধু এই বিশ্বাসটা আরো দৃঢ় হয়েছিলো- এ শহরে সবই সম্ভব। সময়কে ফাঁকি দিয়ে পৌছে গেলাম অফিস। মিটারে দেখি ভাড়া হয়েছে ১২০ টাকা, কিন্তু চুক্তিমত দিলাম ২৫০। ঢাকায় টাকা ওড়ে (সবার জন্য প্রযোজ্য নহে)…..

ছবি: লেখক