অফিস যাত্রীর ডায়েরি… ১৯

ওবায়দুল ফাত্তাহ তানভীর

ইশ-কুল

‘আজ ইস্কুল ছুটি, ভোদরতো হেসেই কুটি কুটি’। আজকের সকালটা একটু অন্য রকম, কেমন যেন। ঘুম থেকে উঠেই ব্যাপারটা অনুভব করলাম, কিন্তু ঠিক বুঝতে পারছিলাম না এর কারনটা। বেশ খানিক সময় লাগলো আবিস্কার করতে – সকালটা বড় বেশি নীরব। জানালা দিয়ে রোজকার পরিচিত শব্দগুচ্ছ আজ পাওয়া যাচ্ছে না। কারনটা একটু খোলাসা করে বলা দরকার- আমার বাসাটা স্কুল পরিবেষ্ঠিত। বাসার সামনে, পেছনে দুটো ভীষন রকম বিখ্যাত হাইস্কুল, আশপাশে কয়েক বাসা দুরত্বে আরো তিন স্কুল। মোটমাট পাঁচ স্কুলের ছাত্র, অভিভাবকদের কোলাহলে সুবহে সাদিক থেকেই এলাকা গরম। আজকে সে শব্দ অনুপস্থিত। আজকে স্কুল ছুটি!!

 এখানে সকাল শুরুই হয় গাড়ির বিকট হর্ণ, রিক্সার ক্রিং ক্রিং, সঙ্গে তাল মিলিয়ে কোরাস ঝগড়ায়। বিভিন্ন দিক থেকে বিভিন্ন বাহনে সবার বিভিন্ন স্কুলে যাবার চেষ্টায় সকাল থেকেই জ্যাম লাগে রাস্তায়। আমার যারা এলাকার বাসিন্দা, তাদের বাড়ির গেট থেকে বের হতেই নষ্ট হয় সকালের অনেকটা সময়। এর ব্যতিক্রম ঘটে যেদিন স্কুলগুলো ছুটি থাকে। সে সব দিনে, ছুটির কারনে স্কুলের ছাত্ররা যত না খুশি, তার চেয়ে বেশি খুশি আমরা- এলাকাবাসী। আর আমার জন্য এর মানে- প্রতিদিনকার ঘাটে ঘাটে জ্যামের লিস্ট থেকে একটা নাম আজকের জন্য বাদ।

 ঢাকা জীবনের অন্য অনেক কিছুর মতোই আমি এই স্কুল জ্যামটার কোন যৌক্তিক কারন খুঁজে পাইনা। আমার গবেষণালব্ধ জ্ঞান- এখানে আগত সিংহভাগ অভিভাবক তাদের বাচ্চাদের, আদরের আতিশয্যে, পারলে গাড়িতে চড়িয়ে ক্লাশের বেঞ্চে পৌছে দেন। একই ভাবে বাচ্চাদের নামিয়ে দিয়ে স্কুলের গেট থেকে নিজেরা গাড়িতে চড়ে বসতে চান। তাদের এহেন আবদারে গাড়ির চালকরাও চেষ্টা করে গাড়ি স্কুলের যত কাছে সম্ভব পার্ক করতে। তাদের তেমন মনিবপ্রীতি, ফলাফল রাস্তা বন্ধ করে গাড়ি পার্কিং। একই ঘটনা ঘটে যেসব অভিভাবক রিক্সা ব্যবহার করেন। তারা রিক্সা করে একেবারে স্কুলগেটে নামতে চান আর এদের সন্মিলিত প্রচেষ্টায় সকলের সকালটা হয়ে যায় বিবর্ণ।

 আমার মতে এর কারন- বঙ্গবাসীর স্বাধীন স্বত্ত্বার সঙ্গে যোগ হয়েছে নাগরিক আচারে অজ্ঞতা। দুয়ে মিলে আমরা ঢাকার জন্য বয়ে এনেছি বাস অযোগ্য শহরের সেরা হিসাবে রাজমুকুট। সেই সাফল্যে নিত্যদিন ঢাকাবাসী মত্ত উদ্বাহু নৃত্যে। ঢাকায় যাঁরা আসেন এবং থাকেন, তাঁরা সবাই জমিদারবংশীয়। তাঁদের পায়ে ধুলো লাগাতে প্রবল আপত্তি। হাটলে তাঁদের সোনার অঙ্গ কালি হয়ে যাবে এই যুক্তিতে তাঁরা মুখে কালি মাখতেও প্রস্তুত। তাঁরা বিছানা থেকে রিক্সায় বা গাড়িতে উঠে গন্তব্যের চেয়ারে নামতে সমস্ত মনপ্রান ঢেলে দেন। এর জন্য যদি লোকে গালিও দেয় তাও মুখো (শিরো) ধার্য। পায়ে হাটা সম্ভবত তাঁদের গ্রাম্য অতিতের স্মৃতিকে উস্কে দেয়, তাই হন্টন তাঁদের কাছে এতোটাই পরিত্যাজ্য। আবার এই স্বজ্জনরাই ভোরবেলা ‘ওজন বেড়ে যাচ্ছে’ বলে সদলবলে হাটার মকশ করেন, কারন সেটা যে ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’।

 সারা পৃথিবী যখন তাদের শহরগুলোকে বদলে দিচ্ছে যাতে তার বাসিন্দারা হেটে বা সাইকেলের মত অযান্ত্রিক বাহনে চড়ে গন্তব্যে পৌছুতে পারে, সেখানে আমরা, ঢাকার জমিদার নন্দনেরা প্রতিনিয়ত আরো যান্ত্রিক বাহনের দারস্থ হচ্ছি। আমরা, বঙ্গবাসী স্বভাবগত ভাবেই গড্ডালিকা প্রবাহের বিরোধী। সবাই যা করবে আমরা করবো তার উল্টো। তাই আমরা আমাদের নগর কর্তাদের বিপুল অংকের টাকা ব্যয় করে শিক্ষা সফরে বিদেশ পাঠাই যাতে তাঁরা সেখান থেকে শিক্ষা নেন বিদেশে কি হচ্ছে। আর দেশে ফিরে আমাদের শহরে বিদেশিরা তাদের ওখানে ভালো যা কিছু করছে, তার উল্টোটা চালু করতে পারেন। কর্তাদের কাজকে সার্থক করবার মানসে আমরাও তাই তাদের তালে তাল মিলিয়ে হাটার রাস্তায় মোটর সাইকেল চালাই। কর্তারা যখন বাস স্টপেজ দোকানের জন্য লিজ দেন তখন আমরাও যত্রতত্র বাস থামিয়ে উঠানামা করে তাদের কাজকে যৌক্তিক প্রমান করি। রাস্তায় বাস চাপায় বন্ধু হারিয়ে ফুটওভার ব্রিজের জন্য আন্দোলন করি, তারপর ফুট ওভারব্রিজ তৈরি হলে তার নিচ দিয়ে রাস্তা পার হয়ে নিজেদের স্বাধীন বলে আত্মপ্রাসাদের ঢেকুর তুলি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে বাহাদুরি ফলাই। এমন একটা অসাধারন জাতিতে পরিনত হবার কারনে সময় হয়েছে পৃথিবীবাসীর আমাদের নোবেলে পুরস্কৃত করার। নোবেল কমিটির কর্ণকুহরে এই জনদাবী পৌছে দেবার লক্ষ্যে চলুন আজ থেকেই আমরা দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলি। সকলে বজ্রকন্ঠে আওয়াজ তুলি- এক দফা এক দাবী, নোবেল তোরা কবে দিবি…….

ছবি: লেখক