অফিস যাত্রীর ডায়েরি… ৫

ওবায়দুল ফাত্তাহ তানভীর

বৃষ্টি সাজ

সকাল সকাল উঠে মনে একধরনের হিরো ভাবের উদ্রেক হলো। কাল সারারাত বৃষ্টি জানালার বাইরে গান শুনিয়েছে, রিমঝিম রিমঝিম। সকালেও আকাশের মুখ গোমড়া। একে শীতকাল, তায় অঝোর বৃষ্টি। যেন বিলাত নেমেছে বাংলায়। বারবার মুখে চলে আসছে আহ, ঠিক যেন আমাদের লন্ডন (রক্তে এখনো বৃটিশের গোলামি ডাক দেয়- সময় অসময় উথলে ওঠে)। আজই তো সুযোগ হিরো সাজার। বলিউড হিরোর মতন, ‘সাংবৎসর’ কোট- জ্যাকেট লাগিয়ে ভাব নেবার সুযোগ আমাদের হয় না। তাই অপেক্ষায় থাকি শীতের, অনেকটা চাতক পাখির মতো। আজ এসেছে সে সুযোগ, তাকে হেলায় হারানো ঠিক না। মেয়েরা সারা বছর সাজগোজ করে সবাইকে দেখিয়ে বেড়ানোর সুযোগ পায়, শীত ছাড়া ছেলেদের সাজ দেখাবার সুযোগ কই। ইদানিং সেখানেও ক্লাইমেট চেঞ্জের হামলা। এমনি বাংলাদেশে শীতকাল হাতে গুনে কয়দিন। ক্লাইমেট চেঞ্জের উৎপাতে সেখানটাতেও টান পরেছে, প্রতি বছরই শীত কমছে। শীতের অজুহাতে একটু রংঢং করবো, সেটাও আর সম্ভব হচ্ছে না। শীত শেষে মনে মনে আক্ষেপ থেকে যায়। শীতের সাজ যেন একটা ছোটগল্প – শেষ হইয়াও হইলোনা শেষ। তাই শীত বৃষ্টি মানেই সুখবর, শীতটা বোধহয় এবার লম্বা হবে। মিনতি করে বলছি, বাবা বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ, মনের আনন্দে থাকো আরো ক’টা দিন। প্রয়োজনে আরো গভীর হও, প্রচন্ড ঘুর্নিঝড়ে পরিনত হও, তবুও দীর্ঘায়ূ হও। আমরা একটু সাজগোজ করি, ফেসবুকে পোস্টাই, মনের আনন্দে লাইকাই। যে সব দূর্মুখেরা নির্বাচনকে সামনে রেখে, নেতা হবার বাসনায়, কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে চান এই শীতে যারা রাস্তায় থাকে তাদের কি হবে? তাদের বক্তব্যের সঙ্গে আমি সহমত। কিন্তু দেশ ও জাতির বৃহত্তর (মানে আপামর পুরুষকূলের) স্বার্থে আমার শীতকালীন বৃষ্টি চাই। নির্বাচন সামনে বলেই আমিতো আর আমার আমিত্ব বির্সজন দিতে পারি না। বাংলাদেশি হিসাবে এটা আমার অর্জন। সবার উপরে আমি সত্য, তাহার উপরে নাই, অথবা অন্য ভাবেও বলা যায়- দেশের আগে দল, দলের আগে আমি… সাজগোজ শেষ করে বাড়ি থেকে বের হতে মিনিট বিশেক দেরি হয়েছে আজ। ধরেই নিয়েছি একটু জ্যাম পাবো রাস্তায়। সেটার চেহারা এমন হবে ভাবিনি। রাস্তায় দেখি আমার মতই অফিস যাত্রীরা সব সাজুগুজু করে নীরব গাড়িতে সরবে বসে আছেন। বৃষ্টি থামার পর, সবাই একসঙ্গে রাস্তায় নেমে যার যার আমিত্ব প্রকাশ করেছেন, ফলাফল – গাড়ি নীরব, যাত্রীরা সরব। সবাই আমি আগে যাবো এই ভেবে এগিয়ে গেছেন, দ্বিমুখী রাস্তাকে একমুখী করে পুরো রাস্তা জুড়ে। সেটায় ছোট্ট একটা সমস্যা ছিলো, তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন ওই দিক থেকে যারা আসবেন তাঁরাও বাংলার সন্তান, তাঁদের মাঝেও বইছে – ‘মুঝসে বাড়কার কৌই নেহি হ্যায়’ রক্ত। আজ আর কারো কোথাও যাওয়া হচ্ছে না। এখন আসুন সবাই গাড়ি বন্ধ করে মুখোমুখি বসে ফেসবুকিং করি, সেলফি তুলি, পোস্ট দেই নিজের সাজের। এতো কষ্টের সাজ তো বৃথা যেতে দেয়া যায় না..

ছবি: লেখক