অফিস যাত্রীর ডায়েরি… ৬

ওবায়দুল ফাত্তাহ তানভীর

রাজা দর্শন

 সকাল ৯:৪৫, বাজে। বসে আছি সোনারগাঁও হোটেলের মোড়ে। ৮:৩০ এ রওনা হয়েছি গ্রীনরোড এলাকা থেকে, গন্তব্য গুলশান ২, সেখানে ১০ টায় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে মিটিং। কাগজে কলমে গ্রীনরোড থেকে গুলশান দুই – কম বেশি ৮ কিলোমিটার দুরত্ব। সকালে রওনা হবার সময় দেড় ঘন্টা যথেষ্ট সময় বলে মনে হয়েছিলো। রাস্তার ট্রাফিক, জ্যাম, অফিস টাইম সব হিসাব করেই সময়টা ঠিক করেছি। আমার সে হিসাবে ছোট্ট একটা ভুল ছিলো – আমি রাজদর্শন হিসাব করিনি। ছাপোষা মানুষ, রাজারাজদের কথা সব সময় ঠিক মনে থাকে না, তাদের দর্শন পাবার আশংকাও করি না।

মিটিং এ পৌছাবার আশা অনেক আগেই শেষ। এখন ভাবছি আজকে এর জের কত সময় ধরে চলবে সেটা নিয়ে। ঢাকা এখন দুটো – ঢাকা উত্তর আর ঢাকা দক্ষিন (সিটি করপোরেশনের খাতায়)। বাস্তবে ঢাকা দু-টুকরো একটা পুবে আর একটা পশ্চিমে। এর মাঝে তার বয়ে চলে ভিআইপি রোড (করপোরেশনের খাতায় কি নাম জানি না)। রাজপথ- মানে রাজার পথ, আরো খোলাসা করে বললে যে পথে দেশের রাজা-গজারা চলেন। এ পথে অবশ্য প্রজাদেরও চলাচলের সুযোগ দেয়া হয়, দরকার মত আবার তাদের লাথি মেরে সরিয়েও দেয়া হয়। যখন রাজা যান এ পথে তার আগে আগে। এই পথের সঙ্গে আছে আড়াআড়ি কতোগুলো পথ- যেমন বিজয় সরণী, খামারবাড়ি, পান্থপথ …।

ঢাকার বাসিন্দা তথা বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক সব নাগরিকই জানেন বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্র কোথায়। আর আরেকটা বিষয় সবার জানা- বাংলাদেশে আপনি ক্ষমতার যত কাছে থাকবেন ততো আপনার জীবন হবে মধুময়, যত দুরে যাবেন ততো বিষময়। ক্ষমতা আর মধু, এর আভাস পাবেন ঢাকার পথে। ধরুন আড়াআড়ি রাস্তাগুলোর মাঝে পান্থপথকে যদি মাঝে ধরি তাহলে এর উত্তরে খামারবাড়ি, তার উত্তরে বিজয়সরনী। পান্থপথের দক্ষিনে এলিফেন্ট রোড, তারো দক্ষিনে নীলক্ষেত, তারপর পলাশী, এরপর গেলে তো একেবারে পানিতে পড়তে হবে- আক্ষরিক অর্থে। রাজপথে উঠবার চেষ্টায় আপনি যত উত্তরে যাবেন তত দ্রুত আপনার কাছে রাজপথ ধরা দেবে। তত দ্রুত আপনি মধুর খোঁজে ছুটতে পারবেন। এর যত দক্ষিনে যাবেন (ক্ষমতার থেকে দুরে) ততো আপনার কাছে রাজপথ অধরা হয়ে উঠবে। নিয়মিত যাতায়তকারিরা খেয়াল করলে দেখবেন বিজয়সরণীতে আপনাকে যতসময় অপেক্ষা করতে হয় তার চেয়ে যত দক্ষিনে যাবেন ততো অপেক্ষার সময় বাড়ে। ক্ষমতার গরম বলে কথা। বাড়ি থেকে রওনা হয়ে ৫০০ মিটার দূরেই এসে উঠেছি পান্থপথে। রাজপথে মানে ভিআইপি রোডে উঠতে চাই।

এক ঘন্টা ধরে বসে আছি, নড়বার নাম নেই। কারন জানা গেলো রাজা যাবেন তাই এ পথে, তাই সাধারনেরা আজ অছ্ছুত। বসে থাকতে হবে রাস্তায়। তাতে তাদের কাজের ক্ষতি হোক, চাকরী চলে যাক মায় জীবন পর্যন্ত যদি যায় তাতেও ক্ষতি নেই। রাজার পথ হতে হবে নির্বিঘ্ন, সেখানে কোন বাধা বরদাস্ত করা হবে না। রাজা পৌছবেন কেরানিগঞ্জ থেকে উত্তরায়- ৮ মিনিটে (স্বয়ং ঘোড়ার মুখ থেকে তথ্যটা পাওয়া)। আজকে কে জানতো আমার রাজদর্শন ভাগ্য। তাই আজ পথে বসলাম। চাকরী নিয়ে টান। ওই সাইরেন শোনা যায়, অচিরেই রাজ দর্শন হবে বলে আশংকা করছি। হুজুর আমাদের পেরিয়ে গেলেই মুক্তি। তারাতারি কোমরে কাছা মেরে তৈরি হই। পেয়াদারা রাস্তা খুলে দিলে আমাদের শুরু হবে পথযুদ্ধ। বিজয়ের মাসে, আমি এখন আর জনযুদ্ধ দেখি নাই বলে হাহাকার করি না। প্রতিদিন এখন আমি পথযুদ্ধে লিপ্ত। সেখানে আমার মুল মন্ত্র – বিনা যুদ্ধে নাহি দিবো সূচাগ্র রাস্তা….

ছবি: লেখক