অফিস যাত্রীর ডায়েরি… ৮

ওবায়দুল ফাত্তাহ তানভীর

মাঘের বাঘ

 ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি – মাঘের শীতে বাঘে কাঁপে। তা এই কলিকালে সেই মাঘের শীতও নাই, সেই ভালো বাঘও নাই। এর দায়, কলিকালের নন্দঘোষ ক্লাইমেট চেঞ্জের। এর কারিগরীতে শীত আর বাঘ, দুটোই হাওয়া। অবশ্য এই সুকীর্তির সব ক্রেডিট একক ভাবে শুধু ক্লাইমেট মামাকে দেয়াটা অন্যায়। এতে আমাদেরও একটু হাত আছে। আমরা সোদরবনের পাশেই শীতে বাঘের কাঁপা বন্ধে বানাচ্ছি বিশেষ এক কারখানা। এতে যেমন পাওয়া যাবে বিজলী, তেমনি মিলবে বনের পশুপাখির আরামে গোছলের জন্য গরম পানি। কিছু কুচুটে স্বভাবের পাজি বাঘের আবার এই সব সুখ ভালো লাগেনি। তারা কারখানার খবরেই গায়েব! শুনেছি এরা সংখ্যায় কমবেশি ৩০০। আপনারাই বলেন, এটা কি কোন কথা হলো? মানীলোকদের মুখে চুনকালী দিতে বাঘের সংখ্যা নাকি ৪০০ থেকে উবে এখন মাত্র ১০০ এ ঠেকেছে। বাঘেরা যে স্পিরিটের মত এত উদ্বায়ী তা কে জানতো! দেড়শো বছর ধরে বহাল বাঘের রাখালেরা তা হলে কি বাঘ ছেড়ে এখন ছাগলের ঘাস জোগারে ব্যাস্ত সময় কাটাবে? মানীর মান কি তবে এখন শুধুই ছেলের হাতের মোয়া? একটা কথা কিন্তু মানতেই হবে, যে ১০০ বাঘ (মতান্তরে ৮৬ থেকে ১৩০) এখনো সোদরবনে আছে, তারা কিন্তু খুব বেহায়া। এতো ভাবে তাদের বলা হচ্ছে – বাবারা, তোমরা সোদরবনটা ছেড়ে একটু বিদেশে পাড়ি জমাও।

নিজেরাও বাঁচো, আমাদেরও একটু বাঁচতে দাও। এই ফালতু অনাবাদী জমি-জমাগুলো প্লট আকারে বিলি বন্টন করে আমরা একটু আখের গোছাই, তা বেটারা শুনছেই না। বাঘেদের বেহায়ামির কথা বলে আর কি হবে। এরাতো কেবল পশু। বাংলাদেশে আমাদের মত কিছু মানুষ, বাঘদের চাইতেও বড় বেহায়া। সরকার কতোভাবে আমাদের উন্নয়নের জোয়ারে ভাসিয়ে দিতে চাইছে- আমরা এমনি গাড়ল যে কিছুতেই ভাসবো না বলে পণ করে বসে আছি। উন্নতির শিখরে গলায় দড়ি দিয়ে টানলেও আমরা উঠতে রাজি না। স্বয়ং আর্কি দাদা মানে বিজ্ঞানের দাদা আর্কিমিডিস পানিতে ভেসে উঠে তুলকালাম করে ফেলেছিলেন, সেখানে আমাদের মত চুনোপুটিদের ভাসতে কি ভীষন অনীহা। এই যে মাঘ মাস এসেছে, যে মাসে বাঘই এখন আর কাঁপে না। একদল অর্বাচীন কিনা সে মাসে এতো কাঁপাকাপি করছে! তাও বানিজ্যর মতো এমন একটা মহতি বিষয়ে! বোঝেন নি তো? দাড়ান, বুঝিয়ে বলছি। চন্দ্রিমা উদ্যানের পেছনের যে খালি জায়গাটা আছে, প্রতি মাঘে সেখানে একটা মেলা হয়- নাম বানিজ্য মেলা।

তাতে কার যে কি বানিজ্য হয়, সেটা এক বিরাট রহস্য। শুধু এটুকু বলতে পারি, আমার গাড়ির জন্য তেল বেচে যে পাম্প, আর কারো কোন বানিজ্য হোক না হোক না হোক, তার এ সময় ব্যাপক বানিজ্য হয়। মেলার কারনে সকালে আমার অফিস যাত্রার সময় বেড়ে হয় তিন ঘন্টা, ফিরতে আরো তিন ঘন্টা। এই ছয় ঘন্টায় গাড়িতে যা তেল পোড়ে তার হিসাব করলে আমায় ফিটের ব্যামো ধরবে। তাই সে ভুলই আমি করি না। কানে কানে একটা কথা বলি, ‘আমরা অফিস যাত্রী’ এই দলটা কিন্তু ভীষন বেহায়া। সমগ্র জাতি যেখানে মেলার নামে উদ্বাহু নৃত্য করে, বিশাল বিশাল বানিজ্যের স্বপ্নে বিভোর হয়ে নির্ঘুম রাত কাটায়, সেখানে এই বেহায়া দলটা তুচ্ছ ক-লিটার তেলের জন্য কি মায়া কান্নাটাই না কাঁদে!! দিনে ৫ ঘন্টা সময় বাড়তি রাস্তায় কাটাতে হবে বলে দেশান্তরী হবার চেষ্টা করে!!! এইসব অকম্মাদের কারনেই এদেশটার কোন উন্নতি হলো না। এরা কোনটা কাজটা ভালো সেটাই বোঝে না। হায়রে পোড়া কপাল….

ছবি: লেখক