অফিস যাত্রীর ডায়েরি… ৯

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ওবায়দুল ফাত্তাহ তানভীর

ঘুঘু সবুজ

“মামা, মিটার থিকা ৩০ টাকা বাড়ায়া দিবেন”- শোনা মাত্রই মাসুদ রানার মত আমারও ঘাড়ের পেছনের চুলগুলো দাঁড়িয়ে গেল। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সাবধান করলো- কোথাও বড় ধরনের কোন ঝামেলা আছে! সিএনজি ড্রাইভার সাহেবের এই বদন্যতা তো ঠিক স্বাভাবিক আচরন না। অনেক দিন পর আজ আবার সিএনজি খুঁজছি, অফিস যাবার জন্য। সকালের এই সময়টায় উবার পাওয়া যায় না, কারন এটা এখন আর রাইড শেয়ার নেই, হয়ে গেছে ট্যাক্সি সার্ভিস। পাঠাও-য়ে যাবো না, আগের যাত্রার কাঁপাকাঁপি এখনো মনের ভেতর বেশ সতেজ। শেষ ভরসা সিএনজি। সিএনজি বলাতে মনে হলো নামের ব্যাপারে বাংলার মানুষ বেশ ব্র্যান্ডভক্ত- এই যেমন মোটরবাইক মানে হোন্ডা, ইঞ্জিন অয়েল মানে মবিল। তেমনি তিন চাকার এই বাহনটা হয়ে গেছে সিএনজি। বাসা থেকে বের হয়ে মোড়ের কাছে এলে মেলে গুটি কয়েক সিএনজি। আজকেও ছিলো কয়েকটা, প্রথমজন গন্তব্য শুনেই উদাস হয়ে গেলেন, আরেক দিকে তাকিয়ে কবিতার প্রথম লাইন খুঁজতে লাগলেন। দ্বিত্বীয়জন শুনলেন, তারপর বিরসমুখে বললেন “ওই দিক যামু না”। আমাকে আর কথা বাড়ানোর সুযোগ না দিয়ে নিজের নাকের লোম উৎ‌পাটনের গবেষনায় লিপ্ত হলেন। তারপরের জনের সঙ্গে কথা বলারই সাহস হলো না। সিটের উপর পা তুলে আয়েস করে চোঁখ বুজে সিগারেট ফুঁকছেন আর মোবাইলে বেজে চলা গানের তালে তালে মাথা নাড়ছেন। পুরাই জমিদার, নেহায়েত শখের বসে ঢাকায় সিএনজি চালান। চার নাম্বারে এসে কপাল ফাটলো, ইনি রাজি হলেন মিটারের উপরে ৩০ টাকা দিতে হবে শর্তে। এখনও বুঝতে পারছি না, এতে আমার কপাল ফাটলো না ফুটলো। যাহোক, যাওয়াতো যাবে এই ভেবে ড্রাইভার সাহেবের মত বদলে যাবার আগেই তাড়াতাড়ি উঠে পড়লাম। মিটারের রহস্য খোলাসা হলো ১ কিলোমিটার এগিয়েই। সামনের পুরো রাস্তা গাড়ি, বাস, সিএনজিতে সয়লাব। যে দিকে তাকাই সেদিকেই সব বসে আছে নিশ্চল। এর মাঝখানে একমাত্র সচল বাহন – মোটর সাইকেল। এর ফাঁক দিয়ে, ওর পেছন দিয়ে, একে গালি দিয়ে, ওকে থাবরে এগিয়ে যাবার কি আকুল চেষ্টা। আর আমার পাশে দাড়ানো গাড়ির ড্রাইভার দেখি জ্যামের সুযোগে নাক ডেকে ঘুম! হঠাৎ দেখি সবাই ব্যস্ত সমস্ত হয়ে যার যার গাড়ি স্টার্ট দিচ্ছে। সহসাই অচল এই সিন্ধু সচল হলো। বাহ কি তামাশা, পাঁচ মিনিটে সব ফাঁকা। আমরাও সামনে এগিয়ে চলেছি তর তর করে। সে চলা যে কি তেলতেলে চলা, একেবারে অফিসে এসে শেষ হলো। আমিতো খুশিতে বাগবাগ। মনে শংকা ছিলো হয়তো আজ আর অফিস হবে না, বাড়ি ফিরে যেতে হবে। সেখানে ২০ মিনিটেই অফিস পৌছেছি। একেবারেই আঁষাড়ে গল্পের মতো। ঢাকার জ্যাম এখন পুরাই নারীর মন – এর মর্ম বোঝা যে কারো অসাধ্য… শুধু আমার সিএনজি ড্রাইভারের সে কি শোক! মিটার বলছে ১৫০। ৩০ যোগ করলে ১৮০। সকালে মুখ ফুটে চাইলে ২০০ টাকার জায়গায় আমি ২৫০ টাকা দিতেও রাজি ছিলাম। এখন ভাড়া মাত্র ১৮০। শোকে মুহ্যমান সিএনজি চালক কি যে বিরসমুখে আমার ২০ টাকা ফেরত দিলো। আহা- এ দৃশ্য দেখেও সুখ! শুধু মনে পরে যাচ্ছে সেই দিনগুলোর কথা- অফিস ছুটির পর এক একটা সিএনজি আসছে আর ১৫-২০ জন যাত্রী তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। সিএনজি ড্রাইভার ২০০ টাকার ভাড়া ৩০০-৪০০ টাকা হেঁকে গ্যাট হয়ে থাকছে। যার তাড়া বেশী সে বাড়তি ভাড়াই কবুল করছে। পুরাই জিম্মি দশা। আর আজ… বারে বারে ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান, এইবার??

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]