অফিস যাত্রীর ডায়েরি… ৩

ওবায়দুল ফাত্তাহ তানভীর

পেলাস্টিক জীবন
বামে পেলাস্টিক- কানের কাছে হেড়ে গলার চিৎকার শুনে চমকে বামে তাকালাম। আমার বামপাশে একটা নিরীহদর্শন সিএনজি দাড়ানো, আশপাশে কোন প্লাস্টিক জাতীয় কিছু তো দেখি না। টিউব লাইট আমি, একটু পর বুঝলাম, বামে পেলাস্টিকটা আসলে আমি তথা আমার গাড়ি। সোজা যাবো বলে ট্রাফিক সিগন্যালে মাঝের লেনে দাঁড়িয়েছি। ডানদিকটা একটু আগ পর্যন্ত খালি ছিলো, হাকডাকে তাকিয়ে দেখি সেখানে এখন একটা দোতলা বাস। দরজায় দাড়ানো হেলপার অনুকম্পাবসত তার উম্তাদ ড্রাইভারকে আমার গাড়ির অস্তিত্ব এভাবেই জানালো। আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করলাম- যাক আমার গাড়িটা অন্তত চোখে পড়েছে, আশা করা যায়, কোন ঘটনা ছাড়াই এখান থেকে অফিস যেতে পারবো। পারত পক্ষে আমি বাস-ট্রাকের বাম দিকে থাকি না, উনাদের ওই উঁচু সিংহাসনে বসে বাম দিকের আসন ভেদ করে আমাদের মত নাদানদের তেলাপোকার মত গাড়িটাড়ি ঠিক চোখে পড়ে না। ডান দিকে থাকলে তাও উনাদের নেক নজরে থাকার সুযোগ হয়। খিস্তি করতে বা পানের পিকটা ফিক করে ফেলবার সময় জানালায় মুখটা বের করলে না চাইলেও নিচে আমাদের চোখে পড়ে। আমরাও প্রানে বেঁচে যাই। কখনো সখনো বামে থাকতে বাধ্য হলে দাড়াই বেশ খানিকটা তফাতে, সংগত কারনেই। আপনারা খেয়াল করেছেন কিনা জানি না, কিন্তু সকাল বিকাল বিস্তর সময় রাস্তায় কাটাবার ফলে আমার নজরে পড়েছে ব্যাপারটা- ঢাকার বাস-ট্রাকগুলো, বিশেষ করে বাসগুলো বাম দিকে হেলানো… আপনারা জানেন কি এর কারন? উহু যা ভাবছেন তা না। যাত্রীদের ভারে এমনটা হয় না। মানুষের কি আর এমন ওজন। তার চেয়ে ক্ষমতা অনেক ওজনদার জিনিষ। বুঝিয়ে বলছি। বাস-ট্রাক শ্রমিক তথা পরিবহন শ্রমিকরা অনেক বছর আগে ছিলেন বামপন্থী রাজনীতির সফল হাতিয়ার। তারাও বিস্তর সুযোগ সুবিধার কারনে একটু বামে চেপে থাকতেন। এরই প্রভাবে একটু বামে হেলে চলা।রাশিয়ার গর্বাচেভের সঙ্গে সঙ্গে সেদিন হয়েছে গত। তারপর এলো বাম হাতের কারবারের স্বর্ন যুগ। বাম হাতে অর্জিত ধন-সম্পদ স্বাভাবিক ভাবেই রাখা হতো বাম পকেটে। সে কি আর যে সে সম্পদ- ক্ষমতার কাছাকাছি মানুষ বলে কথা। সব আমলেই কয়েকজন ক্ষমতাবান এনাদের বাম পকেটে অবস্থান করেন। তাঁদের ওজনে মানুষতো মানুষ, যন্ত্র পর্যন্ত বামে হেলে থাকে। ঢাকা রাজধানী বলে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি ঢাকাতেই দেখা যায়। আর আমরা যারা আম-জনতা, ছোট-খাটো বাহনে করে ঢাকা রাস্তায় বিচরন করি, তারা এই সব রথি-মহারথি (রথি=বাস, মহারথি=ট্রাক) -র চক্করে নিজেদের জীবন ইলাস্টিকের মত টেনে লম্বা করে পেলাস্টিক হয়ে টিকে আছি… তাই বলি, আহারে জীবন, বাহারে জীবন..

ছবি: লেখক