অফিস যাত্রীর ডায়েরি… ৪

ওবায়দুল ফাত্তাহ তানভীর

চাপাবাজী

চাপাবাজীকে এক সময় বাংলাদেশের রাজকীয় জেলার একক এক্তিয়ারভূক্ত বিষয় বলে বিবেচনা করা হতো। অনাদি কাল থেকে বিভিন্ন গল্প-চুটকি, রঙ্গরসে তাদের এই অসাধারণ গুনকে মহিমান্বিত করা হয়েছে। কিন্তু হায়, কালের বিবর্তনে, ডিজিটাল আগ্রাসনে, প্রগতির অগ্রগতিতে রাজাদের সেই মনোপলি আজ হয়েছে বিপন্ন। চাপাবাজী এখন সমগ্র বাংলাদেশ ৫ টনের মতই বাঙ্গালীর এক সার্বজনীন সম্পদ। তাবৎ জনগনের গর্বের ধন, সাধনার ধ্যান, চেতনার অর্জন। এর ব্যাপ্তি এতই বিপুল যে, ফার্মগেট আজ গুলিস্থানে বিলীন, উত্তরা সদরঘাটে লীন, যাত্রাবাড়ি বেঁড়ীবাঁধে সমাসীন। বাংলার এই অভূতপূর্ব অর্জন- ডিজিটাল বাংলার অবদান। যেদিন বাংলার ঘরে ঘরে (পড়ুন হাতে হাতে) আমরা মোবাইল ফোন নামক অস্ত্র তুলে দিতে পেরেছি, সেদিনই আমরা এই আপাত অসম্ভবকে সম্ভব করেছি। পথে কান পাতলেই আজ শোনা যায় এর অপার কারিশমা। ফার্মগেটে দাঁড়িয়ে লোকে বলছেন- এই আমি গুলিস্থান আছি, আর ২ মিনিটে পৌঁছে যাবো, কিংবা উত্তরার বাসে দাড়িয়ে বাদাম চিবুতে চিবুতে বলছেন- কি জ্যামরে বাবা, বাহাদুর শাহ পার্কের কোনায় ২ ঘন্টা ধরে বসে আছি, নড়বার নামটি নেই। এত পর্যন্ত পড়ে নিশ্চয়ই ভাবছেন আদা’র ব্যাপারী কি কারনে জাহাজের কাহিনী ফেদেঁছে? অফিস যাত্রী কেন আজ চাপা পিটাচ্ছে? আসলে এই ভুমিকাটুকু দরকার চাপাবাজীর গুনটি, আমার জাতি হিসাবে কতটা গভীরে ধারণ করি সেটা মর্মস্থ করবার জন্য। মোবাইল নিবাসী চাপাবাজ ছাড়াও ঢাকার পথে ঘাটে আরেক ধরনের চাপাবাজ আছেন। অফিস যাত্রাপথে এনাদের সঙ্গে আমার মোলাকাত শুরু হয় বাড়ি থেকে বের হওয়া মাত্র। কিন্তু আছরটা জটিল আকার ধারন করে বিজয় সরণিতে। আমি নিরীহ প্রজাতির সড়ক ব্যবহারকারিদের একজন, এক আধটু নিয়মকানুন মেনে সড়কে চলতে চেষ্টা করি। তাই বিজয় সরণিতে শেষ মাথায় যখন বামে যেতে হবে, তখন সে রাস্তায় উঠেই বামের লেন ধরি। যথারীতি কচ্ছপ গতিতে সকলের সঙ্গে এক কাতারে এগুতে থাকি সামনে। এখানেই দেখা পাওয়া যায় দ্বিতীয় প্রজাতির চাপাবাজদের। বামে মোড় নেবার জন্য বাংলার এই বীর ভাইয়েরা সর্বডানের লেন ধরে ছুটে এসে মোড়ে পৌঁছে সবাইকে প্রবল চাপে ফেলেন। তাদের চাপে বাকি সবাই চাচা আপন প্রান বাঁচা বলে জায়গা ছেড়ে দেন বা দিতে বাধ্য হন। এই এক জায়গায় চাপাবাজরা বড়ই গণতান্ত্রিক। এই দলে মোটর সাইকেল, সিএনজি, গাড়ি, মিনিবাস, বাস, ট্রাক- সবাই হাজির। এদের উত্তেজনা বাড়ে নতুন গাড়ি দেখলে, আর নিজেরটা যদি একটু ছাল-বাকলা ছাড়া হয়, তাহলেতো সোনায় সোহাগা। ‘পাইছি তোরে’ ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে ‘খাইছি আজ’ ভাবে চাপা শুরু করেন। আর নতুন গাড়ির মালিক-চালক অগত্যা – ‘এই দুষ্ট, তোর কি মা বোন নেই?’ ভাব করে পথ ছেড়ে দেন। ফলাফল, চাপাবাজরা যুদ্ধজয়ীর মতো শির উচু করে মনের সুখে বগল বাজাতে বাজাতে তীর বেগে সামনে এগিয়ে যান পরের মোড় জয় করবার বাসনায়। আমরা, যারা এই যুদ্ধে নৈতিকতার কাছে পরাজিত, পেছন থেকে শুধুই দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রকাশ্যে বলি আমরা এতো অসভ্য না। মনেমনে ভাবি- দেখিস একদিন আমরাও…

ছবি: লেখক