অবনীর গল্প

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

অবনীর বাসার সামনে অনেক লোকের ভীড় দেখে স্বপন রিক্সা দাঁড় করালো। সে বাজারে যাচ্ছিলো তার স্ত্রীর জন্য পান মশলা আনতে। অবনী খুব সহজ সরল মানুষ। একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে। যা বেতন পায় তাতে তাদের মা ছেলের সংসার সুন্দর ভাবেই চলে যায়। অবনী এখনো বিয়ে করেনি। বিয়ের প্রতি তার একটা অনাগ্রহ আছে। বন্ধুরা বলে অবনী বিয়ে করতে ভয় পায়। তাই বিয়ে করতে চায় না। অবনী মানুষের কথায় কান দেয় না। ভাবে মানুষের কথায় কান দিয়ে কি হবে? সে জানে বিয়ে করতে সে ভয় পায় না। কেবল সীমার কথা মনে হলেই মনের মধ্যে বিয়ের প্রতি তার প্রবল বিতৃষ্ণা জেগে ওঠে। সেই বিতৃষ্ণা তাকে বিয়ে নামক বিষয় থেকে অনেক দূরে সরিয়ে রেখেছে।
অবনী সীমাকে ভালোবাসতো। সীমাও তাকে ভালোবাসতো বলে সে বিশ্বাস করতো। অথচ একদিন বিদেশী এক ছেলের সঙ্গে সীমার বিয়ে হয়ে গেলো। অবনী ভেবেছিলো সীমা এই বিয়েতে কিছুতেই রাজি হবে না । তারপরও যখনসীমা অবনীকে ছেড়ে বিদেশী পাত্রের গলায় মালা ঝুলিয়ে তাকে ডাস্টবিনে ফেলে চলে গেল, তখন থেকেই অবনীর ভালোবাসা নামক শব্দটার উপর অবিশ্বাস এসে যায়। মেয়েদের উপর কিছুতেই বিশ্বাস রাখতে পারতো না। তাই সে বিয়ে করার প্রতি অনাগ্রহী হয়ে ওঠে। কোনো মেয়েকে বিশ্বাস করতে না পারে, তাহলে আর বিয়ে করে কি হবে। অযথা একটা মেয়েকে বিয়ে করে এনে অবিশ্বাস করে কষ্ট দেওয়া ঠিক হবে না।
স্বপনের ভাবনার মধ্যে ছেদ পড়ে। লোকাল থানার ওসি তার বাহিনী নিয়ে অবনীর বাসার সামনে গাড়িটা থামালেন। স্বপন একটা পত্রিকায় কাজ করে। তাই থানা পুলিশের লোকজন তাকে একটু খাতির করে চলে। স্বপন ভীড় ঠেলে একটু সামনে গেলো। তাকে দেখে ওসি সাহেব বললেন, আরে আপনি যে! খবর কি পেয়ে গেছেন? স্বপন ওসি সাহেবের কথায় কিছুটা অবাক হয়।
সে ওসি সাহেবের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে জানতে চাইলো,কিসের খবর? এটাতো অবনীদের বাড়ি। অবনী এখানে তার মাকে নিয়ে থাকে। তিন কূলে তার আর কেউ নেই।
ওসি সাহেব বললেন, আরে আপনি দেখছি কিছুই জানেন না। আপনাদের অবনীবাবু আত্মহত্যা করেছেন। আপনি পত্রিকার মানুষ। আপনার কাছ থেকে আমরা খবরা খবর নেই। এখন আপনিই যদি কিছু না জানেন, তাহলে আমরা চলবো কেমন করে?
স্বপন ওসি সাহেবের কথায় মনে মনে রেগে যায়। ভাবে ওসি কি তাকে থানার র্সোস বানিয়ে ফেলেছে? রাগটা প্রকাশ না করে ভিতরেই রেখে দেয়। তারপর ওসিকে বলে অবনী আত্মহত্যা করতে যাবে কেন? তার মতো মানুষতো আত্মহত্যা করতে পারে না।
ওসি তার কথাকে ব্যাঙ্গ করে খুব আস্তে আস্তে কিছু একটা বললেন । যা স্বপন শুনতে পায়নি।
এক সময় ওসি সাহেব জোরে জোরেই বললেন আপনার বন্ধু অবনীবাবুতো এক মেয়েকে নিয়ে ভালোই দিন কাটাচ্ছিলো। আপনি কি কিছুই জানেন না? সারা শহরে এতো কথা ভেসে বেড়াচ্ছে আর আপনি কিছুউ জানেন না!
কথাটা স্বপনও শুনেছিলো। এটা নিয়ে শহরে কম কথা হয়নি। সুবিমল তাকে বলেছিলো দেখ অবনীর কান্ডকারখানা। দেখলে তো মনে হয় াঁজা মাছটি উল্টিয়ে খেতে পারে না। একটা মেয়েকে নিয়ে সে কি না করলো। স্বপন জানে সুবিমল অবনীকে পছন্দ করে না। তাই সুযোগ পেয়ে মুখে যা আসছে তাই বলছে। স্বপন একটু রাগ করেই বলে, এতো কথা বলছিস কেন? অবনী কেমন আমি জানি। তুই অবনীকে পছন্দ করিস না তাই যা তা বলছিস। অবনী কোনো মেয়েকে নিয়ে কোন খারপ কাজ করতে পারে না।
এখন ওসির কথা শুনে স্বপনের মনে হলো নিশ্চয়ই অবনীর বিরুদ্ধে কেউ লেগেছে। অবনী যে কোম্পানীতে কাজ করে তার টাকা পয়সার হিসাবপত্র তাকেই রাখতে হতো। তার অফিসের কেউ হয়তো টাকা পয়সা নিয়ে ছয়-নয় করেছে। আর আমাদের অবনী টাকা পয়সার ছয়-নয়ের হিসাব উর্ধ্বতন কর্মকতাদের কাছে রিপোর্ট করে দিয়েছে।তাই তার বিরুদ্ধে অপরাধী লোকটা মনে হয় উঠে পড়ে লেগেছে। তাছাড়াতো আর কিছু হতে পারে না। অবনী কোথাও যায় না। তার সীমানা হচ্ছে বাসা আর অফিস। তার সঙ্গে কোনো মেয়ে জড়িয়ে গেছে এটা ঠিক বিশ্বাস করা যায় না।
স্বপন দেখলো ওসি এক এসআইকে দিয়ে অবনীর লাশের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে অবনীর লাশটাকে ময়না তদন্ত করার জন্য মর্গে পাঠিয়ে দিলেন। ওসি উপস্থিত লোকজনের টিপ/দস্তখত নিয়ে এক সময় গাড়িতে উঠে হর্ণ বাজিয়ে বাজিয়ে চলে গেলো। গাড়ির হর্ণের শব্দ কানে ঢুকতেই স্বপনের মনে হলো, এটাতো গাড়ির হর্ণ নয়। এটা হলো অবনীর আর্তনাদ। অবনী যেন তাকে কেঁদে কেঁদে বলে যাচ্ছে, স্বপনআমি কোন পাপ করিনি। আমি কোনো মেয়েকে নষ্ট করিনি। যে মেয়েটার কথা ওরা বলেছেওকে আমি চিনতামই না। তুই যদি পারিস ভাই এই অন্যায়ের প্রতিকার করিস।
একসময় ভীড় কমে গেলো। স্বপন একবার ভাবলোঅবনীর মায়ের সঙ্গে দেখা করবে। কিন্তু সে ভয়ে ঘৃণায় আর অবনীর মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারলো না। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো অবনীর ব্যাপারটা খোঁজে দেখবে।অবনী কোনো অন্যায় করতে পারে না। সেরকম মানুষও সে নয়।
তারপর অনেক দিন চলে যায়। অবনীর কথা সবাই ভুলে যায়। অবনীর মাকে তার দূর সম্পর্কের এক মামা নিয়ে যান।অবনীদের বাসাটা একটা বেসরকারি অফিসের কাছে ভাড়া দিয়ে যান অবনীর মা। অবনীকে সবাই ভুলে গেলেও স্বপন কিন্তু ভুলেনি। সে গোপনে গোপনে অবনীর আত্মহত্যার ব্যাপারটা নিয়ে খোঁজ খবর করতে থাকে। আর একদিন খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে যায় সেই মেয়েটিকে।
মেয়েটা প্রথমে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল। তাকেও অবনীর মতো ভয় দেখিয়ে ছিল কিন্তু স্বপনও কম না। সে মেয়েটাকে বলেছে আমি অবনী না। আমি অপবাদ ভয় পাইনা।তুমি আমাকে সব কথা খুলে বলো। নতুবা আমি পুলিশ ডেকে আনবো। স্বপনের কথায় মেয়েটা ভয় পেয়ে যায়। এক সময় মেয়েটা সব কথা খুলে বলে। মেয়েটা বলে, আপনার বন্ধু অবনী খুব ভালোমানুষ। তাকেপ্রথম দেখেই আমি তার প্রেমে পড়ে যাই। কিন্তু আপনার বন্ধু আমাকে এড়িয়ে চলতো।কিছুতেই ধরা দিতো না। তাতে আমার রাগ ওঠে যায়। আমার মনে হয় আপনার বন্ধু যেন আমাকে অবজ্ঞা করে চরম অপমান করেছে। একদিন আপনার বন্ধু অবনীকে ভালোবাসার কথা বললে, আমাকে সে বলে মেয়েদেরকে বিশ্বাস করে না। মেয়েরা হলো চরম স্বার্থপর। অবনীর কথায় আমি অপমানিত হয়ে তার নামে মিথ্যে অপবাদ দিয়ে তাকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দিয়েছি। আমি জানতাম সে খুব ভালো মানুষ। কিন্তু মনটা নরম। অপবাদ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করবেই।
স্বপন মেয়েটার কথা শুনে বললো আপনাকে এর ফল ভোগ করতেই হবে। কাজটি আপনি ভালো করেননি। কথাটা বলেই স্বপন ফিরে আসে। ব্যাপারটা নিয়ে এবার লোকাল থানার ওসি সাহেবের সাবের সাথে কথা বলতে হবে।

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box