অমিত রঞ্জন বিশ্বাসের ৩ টি কবিতা

আমরা

অমিত রঞ্জন বিশ্বাস
(লন্ডন থেকে)

 

হয়তো কোন সুলগ্ন সর্ম্পক আছে,

সেতুহীন কোন সঙ্গীতরমণ।

যে আকাশী চোখ ঝুঁকে পড়ে

আমার কার্নিশে এসে আকাঙ্খায় আণবিত হলো,

যে লাবণি কোলাহল করে এলো

জমানো গণিতে, প্রথাহীন উন্মাদনায় –

সেই চোখ, সুস্নাত কেশ, সেই অনাঘ্রাত গ্রীবা

যাবতীয় পোশাক মেলে ধরে বললে,

আর পাঁচজনের মতই আমরা কি নই?

 

 

নৌকো 

 

ডুবে গেছে সমস্ত জাহাজ, তবু –

বহুদিকে নৌকো জেগে ওঠে।

স্রোতের মধ্যে, জলকাদার মধ্যে প্রবল উঠোনে

গেঁথে আছে সিন্ধুবীজ।

ভাঙাচোরা পাতলাকুয়াশায় গুটিগুটি এগিয়ে আসে

চেনা, না চেনা অনেকদিনের বর্ণমালা;

শঙ্খনাভির মাঝে বিন্দু বিন্দু ঘাম খসে পড়ে,

ময়ুরপালখের মতো অনাবিল।

এনামেল হয়ে থাকা সেইসব রাত,

সজারুর কাঁটার মতো ধারালো সেইসব

পিছল সোনাটা, মানচিত্রের কিনারায়

কেঁপে কেঁপে ওঠা ময়না আঙুল –

মেঘের মই বেয়ে, এই সব লবনাক্ত রাতে,

ঝুরি বটতলে নেমে আসে প্রাচীন সুবর্ণরেখা;

সমস্ত জাহাজ ডুবে গেছে, তবু –

বহুদিকে নৌকো জেগে ওঠে।

 

শহর ও নদী

 

কলকাতার বুকের মাঝে একটা লম্বী নদী আছে

নদীর পাড়ে মেঘ, মেঘের পারে কর্মকারের ধুলো, ধুলোয় ওড়ে

অভিমানী শরীর, শরীরের জমে ঘুম, ঘুমের মধ্যে ভিনদেশী

স্বপ্ন আর স্বপ্নের গভীরে শিয়ালদার ধোঁয়া ওঠা ট্রেন।

 

সকালবেলার রিক্সাওয়ালা ঘন্টি বাজালে, ধেনুর লাল-নীল

শরবত ঠান্ডা হয়; বড়বাজারে শাড়ির দোকানের ঝাঁপে লেগে

থাকা সকালের ধূপের গন্ধ টালিগঞ্জের মেট্রোর সিঁড়িতে

খলবল করে ছড়ায়।

 

নাকতলার নদী ফুলেফেঁপে উঠলে তরঙ্গেরঘাতে পথ ফোটে

আর্মহার্স্টস্ট্রিটে; পাঁচমাথার মোড়ে নেতাজী ঘোড়া থেকে

নেমে ঝুঁকে দাঁড়ান; বেন্টিঙ্কস্ট্রিটের হারানো জুতোয় গল্ফগ্রীনের

তরুণ টাওয়ার পাগলিয়ে খাড়া হয়।

 

প্রতিদিন কলকাতার নদী ইচ্ছেমতো চওড়া হয়ে,

সোতাপন্ন হয়ে –

দেওয়াল ফাঁটিয়ে, ছাদফুঁড়ে, পাতালভেদ করে,

মহানদী হতে থাকে।

 

ছবিঃ প্রাণের বাংলা