অরওয়েল অসুস্থ অবস্থায় লিখেছিলেন ‘১৯৮৪’

অতিমারির সময় পৃথিবীর মানুষ যখন লকডাউন শব্দটিকে নিয়তি জেনে ঘরে বন্দী তখন দার্শনিক ও লেখক আলবেয়ার কামুর ‘দ্য প্লেগ’ উপন্যাসটির বিক্রি হুড়মুড় করে বেড়ে গেলো অনলাইনে। পশ্চিমা দুনিয়ার দু’একটি খবরের কাগজে এ নিয়ে সংবাদও প্রকাশিত হলো। কোভিডের কাল ফুরালে যুদ্ধ শুরু হলো ইউক্রেনে। এখন সাহিত্যের পাঠকদের চাহিদার শীর্ষে উঠে এসেছে জর্জ অরওয়েলের ‘১৯৮৪’ উপন্যাসটি। পৃথিবীতে যুদ্ধ বাধানো একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার আগ্রাসনই কি পাঠকদের আবার টেনে নিয়ে গেছে এই উপন্যাসের কাছে?

অরওয়েল এই উপন্যাসে একজন ভবিষ্যতদ্রষ্টার মতো বহু কথা লিখে গেছেন কাহিনির আড়ালে।বলা যেতে পারে, ‘১৯৮৪’ উপন্যাসটিকে রাজনৈতিক সায়েন্স ফিকশন বলা যেতে পারে। উপন্যাসটি অরওয়েল শেষ করেছিলেন রোগশয্যায় শুয়ে। কালান্তক যক্ষা রোগ তাকে তখন বিছানায় গেঁথে ফেলেছে। ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে শীত আর অসুখ ছাড়া তাঁর আর কোনো সঙ্গি ছিলো না। এই উপন্যাস শেষ করার জন্য অরওয়েল চলে গিয়েছিলেন আয়ারল্যান্ডের বার্নহিল নামে ছোট্ট একটি গ্রামে। সেখানকার মানুষজন তার বাড়ির পাশ দিয়ে গেলে শুনতে পেতো দোতলা কাঠের বাড়ি থেকে ভেসে আসছে অরওয়েলের টাইপরা্বটিারের খট খট শব্দ। ‍এই উপন্যাসের প্রাথমিক নাম দিয়েছিলেন, ‘দ্য লাস্ট ম্যান ইন ইউরোপ’। কিন্তু নাম নিয়ে নিজের মনের মধ্যেই দ্বিধা ছিল। পরে উপন্যাসটি লিখে শেষ করার বেশ কিছুদিন পর নাম বদলে দিয়ে লিখলেন ‘১৯৮৪’।

‘১৯৮৪’ উপন্যাসটি লেখা শুরু করার আগে থেকেই অরওয়েল ভাবনাচিন্তা করছিলেন। নির্জনে বসে উপন্যাস শেষ করার জন্যই তিনি চলে যান সেই অখ্যাত গ্রামে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত সময়ে তিনি ওখানে বসেই এই বিখ্যাত উপন্যাসের কাটাছেঁড়ার কাজ শেষ করেন। তখন অরওয়েল অসুস্থ। ১,২৫,০০০ হাজার শব্দের উপন্যাসটি নিয়ে তিনি নিজেও অতৃপ্তিতে ভুগছিলেন। বারবারিই মনে হচ্ছিল, কোথাও অপূর্ণতা রয়ে গেলো। সাংবাদিক বন্ধুদের চিঠি লিখে তখনই প্রথম যক্ষা আক্রান্ত হওয়ার খবরটা জানিয়েছিলেন অরওয়েল। ‘উপন্যাসের কাহিনিটা ভালো। কিন্তু অসুখে পড়ে এরকম একটি উপন্যাস শেষ করা বেশ কঠিন কাজ;বিশেষ করে অসুখটা যদি যক্ষা হয়।’

অরওয়েল বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েন ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে। প্রকাশকের কাছে পাণ্ডুলিপি পৌঁছে গেলেও সম্পাদনার কাজ অনেকটাই বাকি। চিন্তায় পড়ে যান অরওয়েল। প্রকাশকেরও দাঁত দিয়ে নখ কাটার অবস্থা। কিন্তু ওই দুঃসময়ে বসেও অরওয়েল উপন্যাসের কাজ শেষ করেছিলেন অসুরিক ক্ষমতায়। ১৯৪৯ সালে উপন্যাসটি বই আকারে প্রকাশিত হয়। এটাই ছিলো তাঁর নবম এবং শেষ উপন্যাস। ১৯৫০ সালের ২১ জানুয়ারী তিনি চিরবিদায় জানান পৃথিবীকে।

বিংশ শতাব্দীতে লেখা শক্তিশালী উপন্যাসগুলোর মাঝে ‘১৯৮৪’ অন্যতম। পৃথিবীর ৬৫টি ভাষায় বইটি অনূদিত হয়েছে। বিক্রি হয়েছে লক্ষ লক্ষ কপি। একবিংশ শতাব্দীর  পৃথিবীর রাজনৈতিক বাস্তবতায় বসেও আমরা এই উপন্যাসের সামসাময়িকতাকে অস্বীকার করতে পারি না। একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বিভীষিকা জর্জ অরওয়েলের উপন্যাসের গণ্ডি ছাপিয়ে এখনও সত্য হয়ে আছে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান, উইকিপিডিয়া

ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box