অরিত্রি অনেককিছু বুঝিয়ে দিলো

আঞ্জুমান রোজী

(টরন্টো থেকে): উন্নত দেশে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু থেকে বয়োবৃদ্ধি পর্যন্ত মানুষগুলোর সঙ্গে প্রতিটি মানুষ যেভাবে নমনীয় ব্যবহার করে তা দেখে বুকের গভীর থেকে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি। একে অপরের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি থাকে সম্মানের সঙ্গে। গুরুত্ব সহকারে একে অপরের কথা শুনে থাকে। কারোর মতামতের সঙ্গে না মিললে পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই নিরবে দূরে সরে যায়। হেয় করা বা অপমান করার মানসিকতা কখনো চোখে পড়েনি।

অরিত্রি

প্রতিটি মানুষ ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা চেতনা, মানসিকতার অধিকারি। এমন কি, যে শিশু মাত্র জন্ম নিয়েছে, তারও নিজস্বতা আছে, আছে তার নিজস্ব অভিব্যক্তি। তাকেও জোর করে কোনোকিছু চাপিয়ে দেয়া হয়না। যতক্ষ

ণ না পর্যন্ত শিশুটি না বুঝছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ধৈর্য সহকারে বুঝানোর চেষ্টা করা হয়, যদি শিশুটি এমন কোনো ক্ষতিকর কাজ করে। শিশু মানেই অবুঝ ধরা হয়। কিন্তু তারও স্বাধীন চিন্তা আছে, আছে স্বাধীন মতামত প্রকাশের অধিকার । এমন কি তারও মান অপমানবোধ আছে, ঠিক একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের বোধের মতো। এই বিষয়টা দক্ষিণ এশিয়ার মানুষগুলোর বোধের মধ্যে নেই। এরা শিশুকে অনেকটা পুতুলের মতো লালন পালন করে থাকে। বয়স্করা তাদের ভাব ধারণা, এমন কি প্রথাগত সবধরণের নিয়মকানুন চাপিয়ে দেয় শিশুদের ওপর। এতে অধিকাংশ শিশু মনো বৈকল্যে ভোগে। যে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা হারায়, সেইসঙ্গে হারায় চিন্তার শক্তি। যারফলে এই শিশুরা বড় হয়ে অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয় বেশি। অনেকটা হুজুগে জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। যা সর্বত্রই পরিলক্ষিত হয়।

উন্নত বিশ্বে মানুষ একে অপরের অভিব্যক্তির প্রকাশ দেখে বুঝে নেয় কে, কিভাবে, কোন এঙ্গেলে কি বলতে চাচ্ছে বা কাজ করতে চাচ্ছে৷ ঠিক সেভাবেই কথা বলা বা তার কাজের মূল্যায়ন করা হয়। প্রত্যেক মানুষের পছন্দের প্রতি সম্মান রেখেই তাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়৷ আমি টরন্টোতে বিশ বছর ধরে মেইনস্ট্রিমে কাজ করে যাচ্ছি। শুরুতে আমার মধ্যে অনেক সীমাবদ্ধতা ছিলো। যেমন অনর্গল ইংরেজি বলতে পারতাম না, সবার সঙ্গে কমিউনিকেটে সমস্যা হতো, তারসঙ্গে বাঙালি অ্যাটিচিউড, বিহেভিয়ার একটা বিরাট সমস্যা ছিলো। এসব থেকে বের হয়ে আসতে একটু বেগ পেতেই হয়েছিলো। কিন্তু কলেজের শিক্ষক থেকে সহপাঠীরা আমাকে সহজভাবে নিয়ে অনেক সাহায্য করেছিলেন। এদের অধিকাংশই কানাডিয়ান। নিজেকে ধীরেধীরে তৈরী করে আজ প্রফেশনালি কাজ করে যাচ্ছি। আমি জোর গলায় বলতে পারি আজ পর্যন্ত কাজের পরিবেশে অপদস্থ হওয়া বা কেউ কাউকে অপদস্থ করছে কিম্বা ছোট করে দেখছে, পরিস্থিতির মুখোমুখি কখনো হইনি। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বিষয়টা ভাবলে শরীরে কাঁটা ধরে যায়, একধরণের আতংক এসে ভর করে। মানুষকে অপদস্থ করা, ছোট করা যেন বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষের একটা মজ্জাগত ব্যাপার। সবাই নিজেকে উপরে রাখতে গিয়ে একে অপরের প্রতি এমন বীতশ্রদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি নিক্ষেপ করে। মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়নের চেয়ে চলতে থাকে ঘৃণ্য এক প্রতিযোগিতা। এসব অসুস্থ মানসিকতা ছাড়া আর কিছুই না। শিক্ষিত, অশিক্ষিত বলে কথা নয়, কমবেশি সবাই এই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি অনেকে হচ্ছে বলে জিঘাংসামূলক এবং আত্মহননের মত অবস্থা তৈরী হচ্ছে।

অরিত্রির আত্মহননের পর থেকে মাথায় এমন অনেককিছু ঘুরে যাচ্ছে। লিখতে বসে এলোমেলো হয়ে যাই, কোথা থেকে শুরু করলে অরিত্রি আত্মহত্যার পেছনের প্রেক্ষাপটটা তুলে আনতে পারবো। এতো এতো সমস্যা সঙ্কুল একটি দেশ ; প্রতিটি সমস্যাই যেন প্রতিটি সমস্যার সঙ্গে জড়িত। পশ্চিমা দেশের উদাহরণ টেনে কি হবে যেখানে দেশের মানুষের মনুষ্যত্বই নষ্ট হয়ে গেছে! মানুষে মানুষে সঙ্গে কোনো মর্যাদার দেখানোর চিহ্ন মাত্র নেই, সেখানে আর শিবের গীত গেয়ে লাভ নেই। তবে অরিত্রি মরে দেশ সমাজের মুখোশ এক ঝটকায় খুলে দিয়ে গেলো।

ছবি: গুগল