অশ্লীল গল্প

গল্প কী করে অশ্লীল হয়? গল্প তো গল্পই। ভাবনা আর উপলব্ধির রকমফের মাত্র। গল্পকারের মনের আয়নায় অশ্লীলতার কতরকম প্লট ঘুরে যায়। সে সবই তো মানুষের চেতনা আর অদ্ভুত আচরণকে নানা কৌণিকে আলো ফেলে দেখার চেষ্টা। যা স্বাভাবিক নয় তা-ই হয়তো অশ্লীল। মোটা দাগে আঁকা মানুষের মনের বঙ্কিম গতিপথ। সে পথের খোঁজ সবসময় আলোতে উদ্ভাসিত নয়। সে পথ মনের গহীনে সন্তর্পনে হেঁটে চলা সাপের মতো নিঃশব্দ, গোপন।

এইসব ধারণাকে শব্দে গেঁথে ফেলতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনপ্রিয় লেখালেখির খাতা ‘পোস্টবক্স’ কে অশ্লীল গল্প পাঠানোর আহ্বান। আর তাতেই জমা হওয়া অনেক গল্প থেকে বেছে নেয়া পাঁচটি গল্প রইলো প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে, ‘অশ্লীল গল্প’।

নুসরাত নাহিদ

জেরাল্ডিন

“ম্যাম, দ্যাট জেন্টলম্যান ওভার দেয়ার হ্যাজ সেন্ট ইউ দিস বটল অফ দ্যঁ পেরিনিও। ক্যান উই হ্যাভ দ্য প্লেজার টু সার্ভ ইউ নাউ?”

ক্যাবিন ক্রুর কথায় ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে তাকায় জেরাল্ডিন ওকু, আদর করে সবাই যাকে জেরী বলে ডাকে। ছ’ফুট দীর্ঘাঙ্গী শ্যামা জেরীর মাথায় তালু খামচে পড়ে থাকা ঘন অথচ ছোট চুল। জেল্লা ঝরানো ত্বক আগলে রেখেছে মাশিমো দ্যুতির সফেদ রেশম শার্ট আর এল’র স্লিম বুট-কাট ব্লু ডেনিম। ল্যাপটপের ডালা বন্ধ করতেই হাতের অনামিকায় ঝিকঝিক করে ওঠে সরোভস্কি, কব্জিতে কাস্টোমাইজড ফিলিপ প্যাটেক। ট্রে থেকে ভিজিটিং কার্ডটি তুলে নেয় দু’আঙুলের মাঝে।

ইসিয়েন উকোরেবি, সিইও, পার্স্পেক্টর ওয়াটস্। চার্টার্ড এ্যাকাউন্ট্যান্ট, কর্পোরেট ট্যাক্স ল’ইয়ার, অডিটর। ক্যাবিন ক্রুর দৃষ্টিরেখায় জেরীর থেকে দু’সীট আগের কোণার সীটে আসীন। ঘুরে হাসি হাসি মুখ করে জেরীর দিকে তাকিয়ে আছেন। পাল্টা হাসি দিয়ে জেরী ক্যাবিন ক্রু কে বলে, “আই জাস্ট হ্যাড মাই 2005 স্যতার্ন। মাচ এ্যপ্রিশিয়েট হিজ কাইন্ড জেশ্চার, বাট আই রিগ্রেট।”

ক্যাবিন ক্রু ফেরতা হাসি দিয়ে “নো প্রব্লেম ম্যাম” বলে ট্রে হাতে এগিয়ে যায়। ইসিয়েন সাহেবের কাছে গিয়ে ঝুঁকে মুখ নামিয়ে কিছু বলে। এদিকে জেরী আবার ল্যাপটপ খুলে বসে, কিউএনসি’র ঝাঁহাবাজ লিগ্যাল এ্যাডভাইজারের হাতে অনেক কাজ, ল্যাগোসে নেমেই পরদিন ছুটতে হবে ক্লায়েন্ট মিটিং এ। স্লাইড ডেকের রেকমণ্ডেশনে এসে ঠেকেছে এখন ও। এ সময় কোনও উপদ্রব অনাকাঙ্ক্ষিত।

জেরীকে অবাক করে দিয়ে আধা ঘণ্টা পর ইসিয়েন সাহেব নিজেই এসে হাজির। হাতে ট্রে, এবার প্রিমিয়ার গ্রান্ড ক্রু ক্লাস। জেরীর পাশের খালি সীটটায় বসতে বসতে জেরীকে হ্যালো বলে। বোতাম চেপে ট্রে টেবল বের করে জিজ্ঞেস করে, “আই সাপোজ আই হ্যাভ সিন ইউ ইন ওয়ান অফ দ্য কনফারেন্সেস আ ইয়ার অ্যাগো। আই হাইলি অ্যাপ্রিশিয়েট অ্যাফ্রিক্যান উইম্যান হু ডাজন’ট ওয়্যার উইগস।”

সেল্ফ্রিজেসের ইভনিং গাউনে ঘাম ঝরানো এক সকালে ঘুম থেকে জেগে ওঠে জেরী। ইসিয়েনকে নিয়ে এই স্বপ্নটা আজকাল ঘুরে ফিরে দেখছে ও। সেদিন ঘণ্টাখানেকের আলাপচারিতায় জেরী জেনেছিল ইসিয়েনের ঝাঁ চকচকে পেশাদার তকমার পাশাপাশি সাউথ অ্যাফ্রিকায় ভিনিয়ার্ড আছে। যেখান থেকে ওয়াইন রপ্তানি হয় পুরো ইউরোপে। ইসিয়েন সেদিন খুব আফসোস করছিলো কেন জেরীর সঙ্গে তার আগে দেখা হয়নি। গত এক বছর নানা জনের কাছে জেরীর খোঁজ করেছে, কিন্তু ভাগ্যের শিকে ছেঁড়েনি। জেরী খুব আমুদে চোখে সেই চশমা পড়া ছোট খাট মানুষটিকে দেখছিল। জেরীর চেয়ে তিন/চার বছরের বড় ইসিয়েন ক্লিন শেইভড। কান বরাবর চুলে হালকা রূপোলী আভা। খুব যত্ন নিয়ে হাতের নখগুলি কাটা, ঘষা এবং বাফিং করা। মঁ ব্লাঁর ঘড়িটি হাতে মানিয়ে গেছে বেশ।

সেদিন মধ্য আকাশে খুব আশা নিয়ে ইসিয়েন জেরীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলো। আজ ক’দিন হলো জেরীর খুব আফসোস হচ্ছে ইসিয়েনকে হাসতে হাসতে প্রত্যাখ্যান করায়, তার পাণিপ্রার্থীর তো অভাব ছিলো না কখনোই। যতদিন না সাউথ এশিয়ান মেয়েটি কলিগ হিসেবে এসেছে। শহরের একমাত্র লেবানিজ রেস্তোরাঁর সবচেয়ে সুদর্শন তরুণ রেমণ্ড সেদিন থেকে জেরীর খোঁজ খবর করা কমিয়ে দিয়েছে। রেস্তোরাঁয় টীম লাঞ্চ হলেও রেমন্ড হাঁ করে ওকেই দেখতে থাকে। ব্যাপারটায় জেরীর মেজাজ ভীষণ খারাপ।

কিউএনসির ঝকঝকে ক্যারিয়ার ছেড়ে গত দেড় বছর হয় জেরী বিপিআইতে ক্রসরিভার স্টেট ম্যানেজার। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেট অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট প্রকাশিত হলো যে বছর, স্টেট গভর্নর জেরীকে অনুরোধ করে ইনভেস্টমেন্ট প্রোমোশন কমিশনের চীফ হতে। পুরো ছ’টা মাস কমিশন দিন রাত্তির এক করে প্রাদেশিক সরকারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা দাঁড়া করায়…লক্ষ্যমাত্রা থেকে শুরু করে বিনিয়োগ ইচ্ছুক দেশের তালিকা, খাত, খাতভিত্তিক বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, নীতিমালায় জটিলতা–সব মিলিয়ে ছ’টা মাস দু’চোখের পাতা এক করতে পারেনি জেরী। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সূত্র ধরেই বিপিআই এর মোটা অংকের অফার- এই মধ্য পঁয়তাল্লিশ ছুঁই ছুঁই বছরে এসে এ এক পরম নিরাপত্তা।

জেরীর সঙ্গেই স্টেটের ডেপুটি ম্যানেজার হিসেবে সম্প্রতি প্রিয়ানী মালিককে পায় জেরী। প্রায়-ত্রিশ প্রিয়ানী ছিপছিপে হালকা গড়নের, সাউথ এশিয়ান হওয়ায় জেরীর চেয়ে কেশবিন্যাসে দারুণ ভাবে ঈশ্বরের কৃপাভুক্ত। গায়ের রঙ বেশ চাপা হলেও জেরীর চেয়ে বেশি জেল্লা ছড়ানো। এখানে আসার পর থেকেই মেয়েটা স্যুটেড বুটেড হয়ে জেরীর সঙ্গে নানান মিটিং এ যোগ দিচ্ছে। লম্বা কাফতানে অভ্যস্থ জেরীর রীতিমত দম বন্ধ হয়ে আসে স্যুটপরিহিতা প্রিয়ানীকে দেখে। জেরীর অস্বস্তিটা টের পেয়েই হোক বা চড়চড় করে বেড়ে যাওয়া গরমের জন্যেই হোক, প্রিয়ানী হাফ স্লিভ শার্ট আর গ্যাভার্ডিন ট্রাউজার পরতে শুরু করে। মেয়েটির বিজনেস ক্যাজুয়ালের ঈর্ষনীয় সংগ্রহ দেখে জেরীর নিজের ব্যুটিক কালেকশন অপ্রতুল মনে হয়।

পনিটেল বেঁধে ফর্মাল ড্রেসেই প্রিয়ানীকে বেশি ভালো লাগে, না শাওয়ারের পর হালকা ঢেউ খেলানো চুল না আঁচড়েই ছেড়ে দিয়ে টপস আর জিন্সে কলিগদের অফিস-পরবর্তী আড্ডায় চলে আসে যখন, তখন বেশি ভালো লাগে- এই ব্যাপারটায় জেরী এখনো সিদ্ধান্তহীন। কাজের মাঝে প্রিয়ানী বিষয়ক ভাবনা জেরীকে কুরে কুরে খেতে শুরু করে। এটা জেরীর একটুও ভালো লাগছে না। অনেক চেষ্টা করছে মন থেকে এসব ফালতু ভাবনা বাদ দিতে, কিছুতেই পেরে উঠছেনা।

অন্যদিকে জেরীকে যে প্রিয়ানী ভীষণ পছন্দ করে, জেরীকে নিয়ে ফেইসবুকেও খুব প্রশংসা করে পোস্ট দিয়েছে- এটাও জেরী শুনেছে কানে, কাদুনা আর ল্যাগোস স্টেট ম্যানেজারের কাছ থেকে। কিন্তু কোনও এক বিচিত্র কারণে মেয়েটিকে তার অসহ্য লাগতে থাকে। জেরীর মনে হয় প্রিয়ানী জয়েন করার পর থেকে সবাই প্রিয়া প্রিয়া করতে শুরু করেছে। লেবানিজ রেস্তোরাঁর রেমন্ড, স্টেট গভর্নর অফিসের ডেপুটি গভর্নর মাইকেল এমন কী এই প্রজেক্টে কন্সাল্ট্যান্ট হিসেবে আসা সদ্য সোআসে মাস্টার্স শেষ করা ব্রিটিশ তরুণ জোসেফ।

এখনো জেরী প্রজেক্টের অফিস খুঁজে চলেছে বলে অফিসের বেশিরভাগ কাজ ওরা আযারী হোটেলে বসেই করে। কাজ শেষ হলেই জোসেফ, সংক্ষেপে জোঈ ঝাঁপিয়ে পড়ে সুইমিংপুলে আর প্রিয়ানী চলে যায় রুমে। আধা ঘণ্টা পর ওরা সবাই মিলে ডিনারে বের হয়। একেকদিন একেক জায়গায়। জেরী দেখেছে কয়েক পেগ জীন অ্যান্ড টনিক পেটে পড়ার পর থেকে জোঈ প্রিয়াঘেঁষা হতে শুরু করে।

শুরুতে প্রিয়ানী সফটড্রিংক্সের সঙ্গেই ডিনার সারতো বলে জেরীরা ওকে নানান কথা বলতো। একদিন মেয়েটি চাপমান অর্ডার করে বসে। ব্যস সেই শুরু। কোনও কোনও দিন স্মার্নফ আইস কিংবা স্মার্নফের বদলে কাম্পারি মেশানো চাপমান। এরপর মেয়েটি হাসতে থাকে খুব। বরাবরের মতো রেগুলার ডিনারে অর্ডার করা গিনেসের ঘন কালো তরল তখন জেরীর পুরোটা মন যেন অমাবস্যায় ভরে দেয়। খুব চেষ্টা করেও কপালের মাঝে ঝুলে থাকা বিরক্তিটা মুছে ফেলতে পারেনা ও। জেরী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে এই বিরক্তি ঝেড়ে ফেলতে হবেই ওকে।

আবুজায় ডেপুটি প্রজেক্ট ম্যানেজার ওবিনালিকে বিবিএম করে জেরী। বেনকে পাঠাতে বলে। ইন্সিয়াদ-ফেরৎ ইয়োরোবা বেন সাদা চামড়ার মানুষদের প্রচণ্ড ঘৃণা করে, তার পূর্বপুরুষদের দাসত্বের কাহিনি শুনতে শুনতে বড় হয়েছে ও। মিটিং টেবলে সাদা চামড়ার কেউ থাকলেই বুনো দাঁতাল শুয়োরের মতো ঘ্যোঁৎ ঘ্যোঁৎ করতে থাকে বেন। কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই সেদিন মিটিং শেষ হয়। বেন ক্রসরিভারে আসার এক সপ্তাহের মধ্যেই হুট করে জোঈ চলে যায়। কাউকে কিছু না বলেই।

শুধু যাবার আগের দিন ডিনার শেষে ও দ্রুত উঠে প্রিয়ানীর গা ঘেঁষে হাঁটতে থাকে, আলতো করে জানতে চায় ও ঠিক আছে কি না। প্রিয়ানী অবাক হয়ে উত্তর দেয় সবই তো বেশ চলছে। সেদিন জোঈ’র চোখে ঠিকরে আসা কষ্ট পড়তে পারেনি প্রিয়ানী। আজ জেরীর অনুরোধে পোর্ট হারকোর্টে যাবার জন্যে ব্যাগ গুছানোর সময় জোঈ’র কথাগুলি বার বার কানে বাজতে থাকে। সারাক্ষণ এবডাকশনের ঘটনা লেগে থাকায় পোর্ট হারকোর্ট ছিলো আউট অফ বাউন্ড, এক্সপ্যাটদের যেতে মানা, স্থানীয়রাও সন্ধ্যের পর আর্মড প্রটেকশন ছাড়া বেরোয় না। তবু জেরীর কথায় রাজী হয়ে গেছে প্রিয়ানী। কাল ভোরে ওরা হোন্ডা এসইউভি নিয়ে রওনা হবে।

তিনদিন পর বিবিসি’র খবরেঃ 
উয়েরি পোর্ট হারকোর্ট হাইওয়েতে একটি ব্রিটিশ প্রজেক্টের গাড়িতে সশস্ত্র হামলার পর দক্ষিণ এশীয় প্রিয়ানী মালিককে অস্ত্রধারীরা তুলে নিয়ে যায় এ মর্মে জানিয়ে ক্রস রিভার স্টেট ম্যানেজার জেরাল্ডিন ওকুর আহাজারি। জেরাল্ডিন দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা চালাতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং স্টেট গভর্নরের কাছে আকুল আহবান জানিয়েছেন। এ ঘটনায় জেরাল্ডিন নিজেও আহত।

ওইদিন রাতেঃ 
জেরীর বাসায় বেন, ওবিনালি, শোলাসহ স্থানীয়দের নৈশভোজ। বগুবেরে থেকে বিশেষ প্রক্রিয়াকৃত গোট মিট আনা হয়েছে। আজকের ভোজ সেটারই স্টু দিয়ে। ভোজ শেষে স্টু’র হাঁড়ি ধুয়ে রাখবার সময় টং করে এক ধাতব আওয়াজে জেরীর মেইড রোজ চমকে ওঠে। খুঁজেপেতে দেখে একটা পেন্ডেন্ট, যেটায় লেখাপড়া জানা কেউ পড়তে পারবে লতায় মুড়িয়ে ছোট্ট করে ‘পি এম’ খোদাই করা।

মোহাম্মদ সামিউল মুঈদ

কালো সঙ্গ

 দেবযানী, দেবযানী স্বয়ংপূর্ণা। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি । তীক্ষ্ম চোখ, কামুক ঠোঁট ও মেদবিহীন টানটান শরীরকে পুঁজি করে প্রতিদিন সন্ধ্যায় দামী গাড়িতে চড়ে কলকাতা শহরের বিভিন্ন ধনকুবের বাড়ির ব্যক্তিগত পার্টিতে গিয়ে নগ্ন ভোগ বিলাসে মত্ত হন তিনি। কখনো কারো কোল, কখনো বা কারো শরীরের উপরে অথবা কখনো কারো সঙ্গে কেবলই বন্ধুত্বের জোড়েই নিজের মোড়কবন্দী শরীরকে পুরুষের অথবা ভিন্ন নারীর সামনে উন্মুক্ত করেন এই রমণী। মাঝে মাঝে শারীরিক সঙ্গের বদলে শুধু মানসিক সঙ্গও দেয় দেবযানী। তবে নিজের এই বিশেষায়িত কর্মে কোন অর্থের সংযোগ ঘটান না দেবযানী বরং পরিচয়,গল্প ,স্পর্শ ও যৌনতার বিনিময়ে অভিজাত শ্রেণীর কাছাকাছি থেকে যোগাযোগের জাল বিস্তার ঘটানোই মূল লক্ষ্য তার । নিষিদ্ধ এই জালে জড়িয়ে জীবনে বহু কিছু পেয়েছে দেবযানী, বিভিন্ন রাঘব বোয়ালের শহরের অনৈতিক সর্ম্পক, ব্যবসায়িক চুক্তি, অস্ত্রের চালান প্রবেশসহ অনেক কিছুর আগাম তথ্য মস্তিষ্কে প্রবেশ ও প্রতিপক্ষের কাছে সেগুলো বিক্রি করে অর্থ কামাতে ওস্তাদ এই দেবযানী স্বয়ংপূর্ণা। অনর্গল ইংরেজী, হিন্দি ও তুখোড় বাংলায় কথা বলা দেবযানী, প্রায় রাতেই বাড়িতে ফিরে না। শহরের সল্টলেকের এক বিশাল ফ্ল্যাটে এখন বসবাস করছেন তিনি। শহরের মারওয়ারী ব্যবসায়ী শেখর শর্মার উপঢৌকনের তালিকায় দেয়া এই দামী ফ্ল্যাটটিও বর্তমানে কুক্ষিগত রয়েছে তার। চতুর ব্যবসায়ী শেখর পেশাদার জায়গায় দাবী করে যে, কলকাতার সল্ট লেকে এই মুহূর্তে তার রক্ষিতা হলেন দেবযানী। তবে খুব ভালো করেই দেবযানী জানে যে, কামসঙ্গে লিপ্ত না হতে পারা নপংশুক শেখর কেবল দেবযানীকে নগ্ন করে সামনে বসিয়েই নিজের কাম বাসনা প্রতি রাতেই চরিতার্থ করে এবং নিজের অক্ষমতার এই প্রকাশকে লুকিয়ে রেখে নিজেকে জাহির করে ভিন্ন মাধ্যমে সে। শহরে পুরো মাসের মধ্যে সপ্তাহের অন্তত দুই রাত করে পার্টি করে শেখর। ব্যক্তিগত এসব পার্টির বেশ কয়েক টিতে কালোবাজারী ব্যবসায়ী, উচ্চ পদস্থ সরকারী কর্মকর্তা, পুলিশ, রাজনৈতিক নেতা ও মাফিয়া চক্রের ঘাঘু মালদের বিভিন্ন ধরনের সেবা সঙ্গ ও যৌনতা উপহার দেয় দেবযানী স্বয়ংপূর্ণা। পার্টির মধ্যে খোলামেলা পোশাক, উন্মত্ত শরীর, কোঁকড়ানো চুল, নগ্ন পা, ভেজা যৌনী, খোলা বুক ও ঠোঁটে দামী সিগারেট, হাতে একটু আধটু ওয়াইন অথবা কড়া ভদকা নিয়ে যখন পার্টিতে প্রবেশ করে দেবযানী, তখন পুরো পার্টি হুমড়ি খেয়ে পায়ের সামনে লুটিয়ে পড়ে এই আবেদনময়ী রমণীর। দেবী কালীর সকল ঐশ্বরিক শক্তির শতভাগ যদি মানুষের উপর প্রতিলিপি হিসাবে থাকে, সেখানে দেবযানী স্বয়ংপূর্ণা হলেন শয়ে’শ। সাদা সত্য এই যে, পৃথিবীর প্রত্যেক নারীরই মৌলিক কোনো না কোনো এক বিশেষায়িত চিহ্ন থাকে, দেবযানীর স্বাক্ষর করা এ চিহ্ন ছিলো মোহনীর হাসি! এই হাসির শব্দ ও কয়েকশো গজ দূর থেকেই কড়া পারফিউমের  গন্ধ ও রাঙা ঠোঁটের আয়েশী ধোঁয়া ও দুরন্ত নাচের কৌশল দিয়ে গত কয়েক বছর ধরে কলকাতার নিষিদ্ধ দুনিয়ায় রাম রাজত্ব করে বেড়াচ্ছেন এই রুপবতী নারী। গঙ্গা মাতার পৌরাণিক স্রোত থেকে যে সকল উবর্শী কলকাতার মাটিতে উঠে এসেছেন, এই যুগে তাদের প্রতিনিধিত্বকারীর তালিকায় শীর্ষস্থানে রয়েছেন দেবযানী স্বয়ংপূর্ণা। গত বৃহস্পতিবার সকালে কলকাতা পুলিশের বরাত দিয়ে আনন্দ বাজার পত্রিকার শেষের পাতায় একটি শিরোনাম লেখা হয়েছে, “কলকাতার সল্ট লেকের ব্যক্তি মালিকানাধীন এক ফ্ল্যাট থেকে সুন্দরী রমণীর লাশ উদ্ধার, পুলিশের ধারণা আত্মহত্যা”।

রুবাইয়াত নেওয়াজ

একটি অশ্লীল গল্প

মাজহার সাহেবের বয়স আশি ছুঁই ছুঁই। বয়সের তুলনায় শরীর এখনও ততোটা বুড়িয়ে যায় নি। নিজের কাজ গুলো এখনও নিজেই করতে পারেন। অবশ্য শরীরের থেকে তার মনের জোরই বেশী। এই মনের জোরেই এতো দূর আসতে পারা। এই তো, গেলো বছর কলতলায় একদম নিরীহ ভাবে পিছলে পড়ে বাম পায়ের হাড়টা ভেঙে গেলো! সবাই ভেবেছিলো আর হয়তো তিনি উঠতে পারবেন না, সেই শীতেই হয়তো চলে যেতে হবে পরপারে, কিন্তু মাজহার সাহেবের মন বলে কথা – ঠিক ঠিক একভোর থেকে ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটে উঠোনে এসে তার প্রিয় আরাম কেদারায় বসা শুরু করলেন। চলা ফেরায় একটু শ্লথ হয়ে গেছেন ঠিকই কিন্তু বাকি সব আগের মতই। সেই হুঙ্কার, সেই ভরাট গলায় কাক ডাকা ভোরে কুরআন পাঠ, দেশের খবর দশের খবর, প্রিয় ইংরেজি পত্রিকার আদ্যপান্ত পড়ে ফেলা একবেলাতে। সব কিছুই আবার আগের নিয়মে চলতে শুরু করলো। শুধু জীবনের সঙ্গে নতুন যোগ হলো তার ক্রাচ দু’খানা। খারাপ না, বুড়ো বয়সে হাতির লাঠি হিসেবেই মেনে নিলেন এদেরকে।

কর্মজীবনে মাজহার সাহেব ছিলেন একজন কাস্টমস কর্মকর্তা। সৎ এবং ন্যায়পরায়ণ। তার পিয়ন চাপরাসি যেখানে কর্মজীবনেই ঢাকায় বাড়ি গাড়ির মালিক হয়ে হুলুস্থুল,  সেখানে তিনি অবসরের পর চলে আসেন তার নিজ গ্রামের বাড়িতে। মায়ের গন্ধ, মাটির গন্ধ আর শৈশবের টানে। অবসরে পাওয়া একসঙ্গে টাকাগুলি দিয়ে ঘর দোর ঠিকঠাক করেন, তারপর সেখানেই থাকতে শুরু করেন স্থায়ী ভাবে। যৌবন থেকেই বৃদ্ধবয়সের জন্যে এই ভাবনাটাই ছিলো তার।

ছেলে মেয়েরা সবাই যে যার মতো নিজ নিজ ভাবে প্রতিষ্ঠিত। তারা সবাই বাবাকে নিজেদের কাছে টানলেও মাজহার সাহেব তার ভিটেবাড়ি ছেড়ে নড়ার পাত্র নন। মাজহার সাহেবের স্ত্রী হঠাৎ করেই তিন বছর আগে, ঘুমের মধ্যেই চলে গেছেন। একদম সুস্থ স্বাভাবিক একজন মানুষ হঠাৎ করেই একদিন অতীত হয়ে গেলো পৃথিবীর বুক থেকে।  বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও স্ত্রী বিয়োগের এই শোক মাজহার সাহেব কখনও কাটিয়ে উঠতে পারেন নি। সেই তার ছোট্ট বৌ, তাকে কেনো চলে যেতে হলো আগে? মাঝে মাঝে মনে হয় মাজহার সাহেবের। সময়ের তুলনায় অবশ্য একটু বেশী বয়সেই বিয়ে হয়েছিলো তাদের।  যখন বিয়ে হয় উনার বয়স ছিলো সাতাশ আর উনার স্ত্রী ছিলেন ষোলো। প্রচন্ড ভালোবাসাবাসির প্রকাশ তাদের মধ্যে ছিলো না কখনই, কিন্তু সংসার জীবনের একটি রাতও তিনি স্ত্রীকে ছাড়া ঘুমান নি। তাই স্ত্রীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার অস্তিত্বের একটা বড়ো অংশেরও মৃত্যু হয়ে গিয়েছিলো। ভেতরে ভেতরে একাকীত্ব গ্রাস করে নিলেও মাজহার সাহেব কিন্তু একা থাকেন না। তার বাড়ি গৃহস্থ বাড়ি, গোয়াল ঘরে গরু, রাখাল ঘরে রাখাল, জমিতে কাজ করা দুইজন মজুর, মজুর পরিবার, বাসা বাড়ি দেখভাল রান্না করবার জন্যে তিন তিন জন কাজের মানুষ, তার দেখা শোনা করবার জন্যে দুঃসম্পর্কের এক বিধবা চাচাতো বোন সবাই তার বিশাল এই গ্রামের বাড়িতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। সারাদিন বাড়ি মানুষে গমগম করে। শুধু সন্ধ্যা নামলে  শান্ত হয়ে যায়, গ্রামে তো সূর্য্য ডুবে গেলেই রাত। এই রাত মাজহার সাহেবের বড়ো দীর্ঘ লাগে। প্রতি ছুটিতেই ছেলেমেয়েরা নাতি নাতীনসহ শহর থেকে তার কাছে চলে আসে। তখন অবশ্য ভিন্ন কথা। ছুটির দিনগুলোতে মেলা রাত পর্যন্ত নাতি নাতনিদের গল্প শোনান, ভালোই কাটে সে রাত গুলো। কিন্তু বছরের আর বাকী কাজের দিন গুলোতে তাকে একাই থাকতে হয়। সবাই ব্যস্ত যে যার মতো। তারা খুব চায় বাবা তাদের সঙ্গে থাকুক, এ কথা আগেই বলা হয়েছে তিনিই যেতে চান না।

রাত আটটার মধ্যে খাওয়া দাওয়ার পাট চুকে যাবার পর যে যার ঘরে ঘুমিয়ে পড়ে। তার ঘরের পাশে আরেকটা ঘরে ইসমাইল মিয়া নামে একজন থাকে, দিনে মজুরের কাজ করে, রাতে বাড়ি পাহারা দেয়া আর মাজহার সাহেবের দেখভালের জন্যে তাকে আলাদা করে মাইনে দেয়া হয়।

আজকাল মাঝহার সাহেবের ঘুমটাও ঠিক ঠাক হচ্ছে না। তার ঘুমের সমস্যা ছিলো না কখনও, কিন্তু গত কয়েকদিন ধরেই মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে তার। তারপর ফজরের জন্যে প্রতীক্ষা। এই সময়টায় তিনি তার যৌবনের কথা ভাবেন, যৌবনের অনেক স্মৃতি ছাপিয়ে তাকে  তার ছোট্ট বৌটার স্মৃতি তাড়া করে বেড়ায়। তাঁর কথা ভাবতে ভাবতেই মাজহার সাহেব ডুবে যান তাদের অন্তরঙ্গ মুহুর্তগুলোর ভাবনায়। যৌবনে বেশ শক্তি  ছিলো মাঝহার সাহেবের গায়ে। আজকালকার ছেলেগুলোর মতো তিনি ছিলেন না। সুঠাম দেহ নিয়মিতো শরীর ছিলো পেটানো। তিনি খুব ভালো খেলোয়ার ছিলেন,মাঠে, শয্যাও তিনি কামক্রীড়ায় ছিলেন পারদর্শী। এই নিয়ে তার মধ্যে একধরণের আত্মতৃপ্তি কাজ করতো সবসময়। ছেলে মেয়েদের যখন বিয়ে হচ্ছিলো তখনও তাদের দাম্পত্য জীবন থেমে থাকে নি। শুধু কী তিনি! তার স্ত্রী? গ্রামের মেয়ে হলেও চিন্তা ভাবনায় তিনি ছিলেন যথেষ্টই আধুনিক। তার বদলীর চাকরির সুবাদে অনেক জায়গায় তাদের থাকতে হয়েছে, মিশতে হয়েছে অনেকের সঙ্গে, তাই চিন্তা ভাবনারাও ছিলো তখনকার গড়পড়তা মানুষের চাইতে আলাদা। তাদের বয়সি মানুষেরা যখন বুড়িয়ে গেছে অনেকটাই, সে সময়ও তাদের মধ্যে রাত জাগা পাগলা মুহুর্তের স্মৃতির কোন শেষ নেই। বৌয়ের নামটিও ছিলো চমৎকার – জুলি!! কতোবার উত্তেজনার তুঙ্গে এই নাম তিনি ফিস ফিস করে স্ত্রীর কানে উচ্চারণ করেছেন, জুলি!! জুলি!! জুলি!!!তার হিসেব নেই। মাঝহার সাহেব শুয়ে শুয়ে এসব স্মৃতি রমোন্থন করতে করতে  হাত রাখেন বিছানার ডান পাশের খালি জায়গাটাতে। মশাড়ির কাপড়  ভেদ করে শুভ্র জোছনা ঘরের জানালা গলে ঢুকে পড়ে তার সফেদ বিছানার চাদরে। চোখে ভ্রম হয়, হঠাৎ বুঝি তিনি তার ছোট্ট সোনা বৌ জুলির পিঠ দেখতে পান। ভ্রম কাটে। জোছনায় মন কাঁদে, হঠাৎ করে তখন মাঝহার সাহেবের জীবনটাকে খুব দীর্ঘ মনে হয় । নিজের মধ্যে আত্মগ্লানিতে ভোগেন। মৃত স্ত্রীর সঙ্গে কতো হাজার কোটি স্মৃতি তার, তবু শুধু এসব কেনো মনে আসে। হয়তো এসব কারণেই জুলি স্বপ্নে এসে তাকে ধরা দেয় না, রাগ করে থাকে। খুব রাগ ছিলো মেয়েটার।

মাজহার সাহেব রাত জেগে দোয়া করেন মৃত  স্ত্রীর জন্যে। ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ হয়ে এলেই ঝুপ করে জুলির কন্ঠস্বর শুনতে পান। যেসব শুনতেন তাকে ভালোবাসবার সময় গুলোতে। ধড়মড় করে আবার চোখ মেলেন, দোয়া চাইতে থাকেন তার দয়াময়ের কাছে, তার ভালোবাসার মানুষটির জন্যে। রাত গুলো বড়ো দীর্ঘ লাগে তার, তিনি অপেক্ষায় থাকেন এর অবসানের।

ফারহানা নীলা

অতৃপ্ত বাসনা

শ্বেতা চোখ বুজে আছে কিন্তু জেগে আছে। কতরাত এভাবে ঘুমের অভিনয় করে কেটে গেলো! বিয়ে হয়েছে ছয় মাস। মহিমকে আগে চেনা ছিল না। বিয়ের পরেই প্রেম… এমনটি চাওয়া ছিল শ্বেতার। মহিম কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। বিয়ের পর মফস্বল থেকে ঢাকায় চলে আসে তারা।

অফিস থেকে ফিরে কম্পিউটার আর ল্যাপটপে সময় বাঁধে মহিম। শ্বেতা সারাদিন অপেক্ষা করে মহিমের জন্য। রাতের পর রাত চলে যায়, দিনের পর দিন…. মহিমের ব্যস্ততা কমে না। শ্বেতাও মহিমকে বিরক্ত করতে চায় না।

কিছুদিন এভাবেই চলে। মহিম সিগারেট নিয়ে বারান্দায়… শ্বেতা কম্পিউটারের সামনে দাঁড়িয়ে। মাথাটা বনবন ঘুরে যায়… কি অশ্লীল সব ছবি! শ্বেতার কান গরম হয়ে যায়। কি ঘেন্না! মানুষ এসব দেখে কিভাবে!

এরপর প্রতিরাতেই শ্বেতা বুঝতে পারে… মহিমের বিকৃত রুচি!

মহিম…

দাম্পত্য জীবন চালাতে জানে না। কিন্তু চোখের আর মনের সুড়সুড়ি বেশ লাগে। কোনো মেয়েকে দেখলেই রঞ্জনরশ্মির মত ভেদ করে মহিমের বিকৃত দৃষ্টি। মহিম অন্তর্নিহিত মাধুর্য্যে মধু আহরণ করে। আপাত ভদ্র মহিম… কাম বাজিকর!

শ্বেতা ভীষণ ভেঙে পড়ে। এই একাকিত্ব আর অবহেলায় ভঙ্গুর হয় অস্তিত্ব। বাড়ীর কাউকে কিছু বলতে পারে না। মহিমকে মানসিকভাবে অসুস্থ মনে হয়।

আজকাল শ্বেতা ভয় পায় মহিমকে। কেন জানি মহিমকে নিরাপদ মনে হয় না। পালাতে চায় শ্বেতা সংসার নামক বন্ধন থেকে।

নিজের ভেতর একটা শক্তি ভর করে। শ্বেতা কাল সকালেই চলে যাবে এই নিষ্ফল জীবন থেকে। বিবাহিত জীবনের ছোঁয়াহীন কাহিনী অন্তরে গেঁথে! শ্বেতার খুব কান্না পায়… খুব! নারীজন্ম তবুও মিথ্যে মনে হয় না। এক জীবনের অসঙ্গতি মেনে নিয়ে শ্বেতা প্রতিকূল পথ ছেড়ে অনির্ণীত পথে পা বাড়ায়! মহিম ঘুমিয়েছে… রাতের বিকৃত খেলা শেষে!

দরজাটা ভিড়িয়ে নেমে আসে শ্বেতা পথে…

ওখানে অনেক আলোর হাতছানি। ঝরা শিউলীফুলে জমে থাকা শিশিরে লেখা থাক এক অতৃপ্ত রমণীর বিবাহিত নামের পরিণতি!

নুসরাত সুলতানা

বাবা

বিকেল ৫ টা আফজাল সাহেব বেশ খোশ মেজাজে আছেন আজকে।সময়টা শরৎকাল ড্রাইভার  রহমত দৌড়ে অফিসে ঢুকে আফজাল সাহেবের পা জড়িয়ে ধরে,কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে,‘বড়সাব আমারে ছুটি দেন আমার ছেলেডা খুউব আসুস্থ!  আজ তিনদিন ধরে কিছু খায় না।’

আফজাল সাহেব একটু নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলেন, ‘কি হয়েছে তোর ছেলের? আজ আমার একমাত্র মেয়ে টুম্পা দাদুভাই কে নিয়ে দেশে আসবে।মাসদু’য়েক থাকবে। ওদেরকে বিমানবন্দরে আনতে যেতে হবে। এই নে দুহাজার টাকা তুই বাড়িতে পাঠিয়ে দে। দুইদিন পরে যাস বাড়িতে। যা বিকাশ করে আয়।আমি তোকে নিয়ে বের হব।’

রহমত টাকা বিকাশ করতে বেড়িয়ে যায়। রহমতের বাড়ি বেনাপোলে। রহমত বউকে টাকা বিকাশ করে বললো,‘মাসুম কে সদরে নিয়ে ডাক্তার দেখাও আমি দুদিন পরে আসতেছি।

এসে মাসুমকে বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।’

আফজাল সাহেব আল্লাহপাক সুখ শান্তি ধন দৌলত সবই দিয়েছেন।আজ একমাত্র মেয়ে আসবে কানাডা থেকে তার কলিজার টুকরো নাতিকে নিয়ে। আর একমাত্র ছেলে টিপু আমেরিকায় হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.বি. এ পড়ছে।ফিরে এসে তার পাঁচ পাঁচটা ইন্ডাস্ট্রির হাল ধরবে এটাই তার আশা।

রহমতকে নিয়ে আফজাল সাহেব বের হয়ে যান বিমানবন্দরে। ওইতো তার দাদু ভাই স্বপ্নীল। মেয়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে সাতরাজ্যের আদর নিয়ে নেয়! স্বপ্নীল বলে, ‘হেই ওল্ডম্যান হাউ  আর ইউ?’

আফজাল সাহেব সবাইকে নিয়ে গুলশানের বাসায় এলেন। তাঁর বাসায় আজ চাঁদের হাট বসেছে। স্বপ্নীলকে কি খাওয়াবেন, সারাক্ষণ ব্যাস্ত রাহেলা বেগম।আর রহমত ব্যাস্ত বাজার করা নিয়ে। আফজাল সাহেব রহমতের ছুটি আরও দুইদিন পিছিয়ে দিলেন। রহমতের কলিজায় পানি নাই। তার চোখের মনি মাসুমের অবস্থা ক্রমশ অবনতি হচ্ছে। এদিকে বড়সাহেবের অমতে যেতেও পারছে না; চাকরী চলে গেলে বউ,বাচ্চা আর বৃদ্ধ মাকে নিয়ে সে খাবে কী?! এবার রাহেলা বেগমের হাতে পায়ে ধরে ছুটি আদায় করে রহমত।

পাঁচদিন পরে রহমত হাজির হয় অসুস্থ ছেলের সামনে। ছেলে চোখ মেলে তাকাতে পারছে না। চোখ বন্ধ রেখেই বাবাকে বলে, ‘বাবা আমার জন্য গাড়ি এনেছো?’ রহমত বলে,‘বাবা আমি দুনিয়া এনে দেব,তুমি সুস্থ হও’ আংগুরি অন্য দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলে।বকে চলে রহমতের মা,‘তুই কেমন বাপ? চাকরী ছেড়ে কেন চলে আইলিনা?  দিনমজুর দিয়ে খাইতি!’

আর একবিন্দুও সময় নেই। রহমত মাসুমকে যশোর সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়।ডাক্তার মাসুমকে ইমারজেন্সি তে ভর্তি করে দেয়।পরীক্ষা নিরীক্ষা করে মুখ কঠিন করে বলে,কতদিন ধরে জ্বর? এত দেরী কেন করেছেন? আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি,তবে অনেক দেরী করে ফেলেছেন

আপনার ছেলের ডেংগু হয়েছে।প্লেটলেট অনেক কমে গিয়েছে।রহমত বলে স্যার সেইটা কি?! আমার শরীরের সব রক্ত নিয়ে নেন! ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস দিয়ে বেরিয়ে যান।

দুইদিন পরে মৃত্যুদূত পরম আদরে নিয়ে যায় মাসুমের আত্মা। আংগুরি বার বার মূর্ছা যায়।রহমতের অন্ধ মা আর কাঁদতে পারে না। রহমত মাসুমকে দাফন শেষে অনেকক্ষন একা বসে থাকে।

কিছুক্ষন পরে বের হয়ে দেখা করে গফুর ভাইয়ের সঙ্গে।

পরের দিন গ্রাম থেকে ডাব,কলা,দেশী মুরগির ডিম নিয়ে হাজির হয় আফজাল সাহেবের বাসায়। আফজাল সাহেব রহমতের ছেলের খোঁজ খবর নেন। রহমত বলে সে অনেকটা সুস্থ।তবে চিকিৎসা চলছে।

রহমত সোৎসাহে আফজাল সাহেবের বাসায় বাজারহাট করতে থাকে। একদিন স্বপ্নীলের জন্য মিনারেল পানি আনতে পাঠায়।রহমত ১০ লিটারের বোতল নিয়ে আসে। কিন্তু বোতলের মুখ খোলা। রাহেলা বেগম জিজ্ঞেস করলে বলে,স্বপ্নীল ভাইজানকে নিচে পানি দিয়ে আসছে।’

প্রায় দুইমাস শেষ। এবার টুম্পার ফেরার পালা।বাবা মা চোখের জলে বিদায় দিল মেয়েকে।

কানাডা যেয়ে হঠাৎ করেই অসুস্থ  হয় স্বপ্নীল।তাঁর পেটে প্রচন্ড ব্যথা। নিয়ে যাওয়া হয় ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার বলেন,স্বপ্নীলের রক্তে আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

যার পরিণতি নিশ্চিত মৃত্যু। টুম্পা চোখে অন্ধকার দেখে ফোনে বাবাকে সব জানায়।

আফজাল সাহেব কোন কূলকিনারা খুঁজে পাননা। পাননা রাহেলা বেগমও। সবসময় স্বপ্নীলকে মিনারেল ওয়াটার খাওয়ানো হয়েছে।

দু’তিনদিন হয়েছে রহমত মায়ের অসুস্থতার কথা বলে বাড়ি গিয়েছে। তারপর ছয়দিনের মাথায় রহমতের ফোন আসে,‘ স্যার কেমন আছেন?’ ‘ভাল নেই রহমত,আমার দাদু ভাইয়ের খুউব অসুখ! তুই তো সবসময় মিনারেল পানি এনেছিস!’ রহমত নিষ্ঠুর হাসি হাসে আর বলে,‘স্যার আপনার বাসায় বাজার করার জন্য আমার ছেলের কাছে যেতে দেন নাই। মারা গেছে আমার ছেলেটা। আমি আপনার নাতির পানিতে আর্সেনিক মিশাইছি। বোঝেন একটু হারানোর ব্যথা কি?’ আফজাল সাহেব বলেন, ‘তোর গুষ্টিশুদ্ধ আমি ফাঁসিতে চড়াবো। রহমত অট্টহাসি হেসে বলে,‘এই সীমকার্ড টা পানিতে ফেলে দিয়ে আমি দালাল ধরে বউকে আর মাকে নিয়ে ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছি।’

প্রছদ অলঙ্করণঃ প্রাণের বাংলা