অসমাপ্ত প্রেমপত্র

ভালোবাসার দিনে অসমাপ্ত প্রেমপত্র? হতেই পারে। তরুণ-তরুণীরা কী আজকাল চিঠিতে প্রেম নিবেদন করে? একেবারেই না। সাধু ভ্যালেন্টাইনের ভালোবাসার দিনে তো প্রশ্নই ওঠে না। এদিন চকলেট, গোলাপ, ক্ষুদে বার্তা আর শুভেচ্ছা কার্ডের হৈ হুল্লোড়ে ভালোবাসার আসল মুখটাই চাপা পড়ে যায়। সেখানে সময় কোথায় প্রেমপত্র লেখার?কিন্তু প্রেমপত্র বলে তো একটা বিষয় একটা সময়ে ছিল। বলা যায় নিজস্ব নির্জন সেই চিঠি, ভালোবাসার চিঠি। প্রাণের বাংলার জন্য লেখকদের চিঠি লেখাতে গিয়েও হলো নানা ঝক্কি। শিশু সাহিত্যিক, সঙ্গীত শিল্পীদের দিয়ে এই চিঠি লেখানোর একটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সেখানেও সফলতা পাওয়া গেলো না। সেখানেও অসমাপ্ত রয়ে গেলো চিঠি পর্ব। সেই শেষ না-হওয়া প্রেমের চিঠি নিতে পোস্টম্যান কখন আসবে এখন তারই অপেক্ষা।

সঙ্গীত শিল্পী

ইমন চক্রবর্তী
কতগুলো  কথার কথাই থেকে গেছে, কতগুলো কথা সাহস করে বলে ফেলা যায় নি। কতগুলো কথা ভীষণ আলসে, জোর করে ঠেললেও বেরুতে চায় না। কতগুলো কথা সুর পেয়েছে। বেসুরে ঠেকলে মুচকি হেসেছে। কতগুলো কথা আস্তানা পায়নি, হাওয়ায় ভেসেছে, নোঙর পায়নি পাড়ে পড়েছে।কতগুলো কথা জটিল ভীষণ।সহজ অঙ্কের ধার ধারে না। কিছু কথা মেলাতে গেলে হিসেব মেলেনা।কথা বাধঁতে গেলে ফসকে যায়। কথারা শীতঘুম দেয় বারোমাস। উষ্ণতা পেলে প্রাধান্য চায়, আদর পেলে গভীরতা চায়, যন্ত্রণা পেলে আরও যন্ত্রণা চায়।কথারা লেখা হয়ে ঝরে পড়ে পাতার পর পাতা। আমার তোমার কথাগুলো বড্ড সহজ। শুধু ‘কথার কথারা’ বড্ড একা।

আন্জুমান রোজী

                  অনাকাঙ্ক্ষিত,

লেখক

কেমন আছো তুমি? লিখতে বসে অনেক কিছু মনে পড়ছে।
কোন এক বসন্তের সকাল। সূর্যআলো ফোটার আগে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। বুকভরা অস্থিরতা নিয়ে বিছানা থেকে নেমে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালাম। ঝিরিঝিরি নরম বাতাস বইছে। বেলিফুলের ঘ্রাণে মৌ মৌ করছে চারদিক। মনটাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিমাত্র।
ভোরের সূর্যের মতো এক ঝাঁক সোনালী রোদ্দুর নিয়ে মনোকাশে উদয় হলে তুমি। সেই আলোর মিছিলে ভরে গেলো আমার উঠোন । অবচেতনেই বুকের মধ্যে জেগে উঠে এক নতুন নির্জন দ্বীপ। আমার একলা থাকার দ্বীপ। নিরবে পা ফেলে তুমি এলে সেখানে। চোখ বন্ধ করে তোমাকে ছুতে  গিয়ে দেখি  ভাবনাগুলো স্বপ্নের ঘর থেকে বের হয়ে এসেছে। কথা হলো ফোনেফোনে। তুমি মেঘলাদিনের কথা বলো, বলো পলাশফুলের কথা, দোয়েল কোয়েল কত পাখির ওড়াওড়ি সেখানে! আবার কখনও নদীকে নিয়ে আসো আমার কাছে। স্মৃতির ভারে নদীতে তুমি আমি দুজনেই ডুবে যাই। আচ্ছা তোমার মনে পড়ে, সেই বৃষ্টিভেজা এক সকালের কথা! তুমি বলেছিলে, ‘এসো, এসো এই বৃষ্টিতে’। আমার ভীষণ মনে পড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া সেই পাতা বাহারের গাছটা আর দোলনাটা! ছবি পাঠিয়েছিলে। মনেমনে দুজন খুব করে ভিজেছিলাম। তুমি বলতে, ‘এই দোলনাটা তোমার।’ পাহাড় টিলায় সবুজঘেরা ছোট্ট বাংলোটি কেমন করে যেন ডাকছে! সে কী শুধু তুমি নাকি সবুজের হাতছানি! তুমি আরো বলতে, ‘ আমি তোমারই আছি।’ তখনই চোখে ভেসে উঠতো দিগন্তজোড়া সবুজ, এঁকেবেঁকে যাওয়া নদী কিম্বা দূর আকাশে হেলান দেওয়া কোনো এক পাহাড়। তুমি যে তারই প্রতিচ্ছবি। কীভাবে যে দাগ কেটে আছো মননে মগজে আর চোখের ছায়াতে! তোমাকে খুব মনে পড়ে, যখন বৃষ্টি নামে।

কথা হলো তোমার সাথে দেখা হবে । মানসিকভাবে তার প্রস্তুতি নিচ্ছি। প্রস্তুতি যেন আর শেষ হয়না। কখনও ভয় এসে ভর করে, কখনও বা ভালোলাগার আবেশ ভর করে। সাদা শাড়ি লাল টিপ পরবো ঠিক করে রেখেছিলাম। লাল চুড়ি পরতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরবো না। কাঁকনের রিনিঝনিতে অনেক কিছুর ব্যাঘাত ঘটতে পারে। নিজেকে মনের মতো সাজিয়েগুছিয়ে ঠিকই অপেক্ষা করেছিলাম।
আমার কাছে তুমি ছিলে ক্ষণজন্মা
নিঃসঙ্গতার অস্তরাগে
করুণার ভিখারিনী আমি
এক কাঙ্গাল হয়ে আরেক কাঙ্গালের দেখা পাবো!
দেখা আর হয়নি। জানি আর কখনও হবেনা। তবুও
নতজানু হয়ে ছিলাম তখন এখনো যেমন আছি…
অনেকদিন পর তোমার কথা খুব মনে পড়তেই চিঠি লিখতে বসেছি। লিখতে গিয়ে স্মৃতির মাতমে পাগলপ্রায়। হয়তো তুমিও কিছুটা এলোমেলো। তুমি বলতে, দুঃখ লালনেও শান্তি আছে। আমি জানিনা এ কেমন দুঃখবিলাস! দুজন দুদিকে ছিটকে গেলাম। এখন শুধু দৃশ্যগুলো চোখে ভাসে, মনটা পড়ে থাকে ওখানে
দুরের সীমায় নিঃশ্বাস ছেড়ে
হৃৎপিণ্ডটা ধরে রাখি বুকে…
লিখতে বসে এলোমেলো হয়ে গেলাম। ভাবনার রাজ্যে তুমুল ঝড়ো হাওয়া। বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে এখানেই শেষ করছি। ভালো থেকো সবুজ বনের মতো।

শিশু সাহিত্যিক

রুদ্রাক্ষ রহমান
ধর, তোকে বা তোমাকে যে কথাটি আমি বলতে পারিনি কখনো, বলতে পারবো আর বাকি আয়ুটুকুতে। সেই কথাটা আমি একটু দূর থেকে বলে দিতে পারি চিঠির মাধ্যমে। চিঠির না একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে।ঘ্রাণ আছে। চিঠির প্রতিটি অক্ষরে এক একটা আলাদা মায়া জড়িয়ে থাকে। খামের ভেতর বন্দি হয়ে, ডাক বাক্সের একাকিত্ব ছুঁইয়ে ডাক হরকরার হাত হয়ে সেই মায়াটা পৌঁছে যায় তোর বা তোমার কাছে। এটাতো সত্য যে আমাদের একটা ‘চিঠিযুগ’ ছিলো। ধর, শীত গিয়ে বসন্ত এলো। কেমন এলোমেলো হাওয়া দেয় ফাগুন মাস। কেমন উদাস করে দেয় সব কিছু। উড়োখুড়ো মন পরর্য্টনে যেতে চায় কোন সুদূরে। তেমন এক আউলা-বাউলা বিকেলে, যখন পাতাদের নাচনও বুকে শেল হয়ে বিধে, ঠিক তখন তোকে, তোমাকে পেয়ে যাই একলা আঙিনায়। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, সুনীল, আবুল হাসানে ভর করে রাত জেগে চিঠি লিখি। সেই চিঠি তোর, তোমার হাতে দিতে পেরে পালকনির্ভার লাগে নিজেকে।আর ত্বরিত ঝলকে সেই চিঠি জায়গা করে নেয় তোর, তোমার বুকের আড়ালে, সাক্ষী থাকে আকাশনীল ব্লাউজ আর কালো অন্তরবাস। ভাবি, আজো নবীন প্রেমিক, কাঁপা কাঁপা হাতে, রাত জেগে, কবিতার লাইন চুরি করে চিঠি লেখে? আর প্রেমিকারা সেই চিঠি পেয়ে আলগোছে লুকিয়ে রাখে বইয়ের পাতার ভাঁজে অথবা ব্লাউজের গভীর ভেতর? অথবা জিন্সের হিপ পকেটে? ধরো, তোকে অথবা তোমকে আমি যে চিঠিটা লিখতে শুরু করেছিলাম সেই কবে কোন প্রথম চেতনাকালে। সেই চিঠিটা আজও লেখাই হলো না। আজ সন্ধ্যানামা বিষণ্নবেলায় দেখলাম দুজন মানুষ, নাকি অন্য কিছু, হেঁটে যাচ্ছেন মাথা নিচু করে, নৈঃশব্দ্যে ভর করে! তাদের একজন জীবনানন্দ দাশ, অন্যজন আবুল হাসান; দুজন বিষন্নমানুষ, হেঁটে যাচ্ছেন। এই কথাটা, বিষয়টা তোকে বা তোমাকে আমি বলে বোঝাতে পারবো না কোনোদিনও। তাই আবার চিঠি লিখতে ইচ্ছে হলো আমার। আবার শুরু করতে চাই চিঠিটা!

স্বপ্নীল সজীব

               হে প্রিয়…

সঙ্গীত শিল্পী

কোথা থেকে শুরু করবো খুঁজে পাচ্ছি না। এই হোয়াটস আপ আর ফেসবুকের সময়ে মনের কিছু অব্যক্ত কথাগুলো বলাই হয় না।মনের কথাগুলো প্রায়শই ধরা দেয় গান হয়ে। তোমায় ভালোবাসতেই হবে বলে ভালোবাসি না। তুমি এখন আমার অভ্যাস, ভাল্লাগা, খারাপ লাগা সবকিছুতেই পরিণত হয়েছ। তুমি আমার আমি হয়ে ধরা দিয়েছ।
তোমায় ভালোবাসি বলবো না, কারণ তোমায় আমি ধারণ করি। ভালো থাকো ভালোবাসা

মাহবুব রেজা

শিশু সাহিত্যিক

মা সব সময় আমাদের বলতেন , তর বাপরে দেখতে রাগি-রাগি দেহাইলে কি হইবো । তর বাপ আসলে পোলাপাইনেরও পোলাপান ।
মা যে কীসব বলে !
একদিন দুপুর বেলা । আমাদের খাওয়া দাওয়া শেষ । মা বিছানায় শুয়ে শুয়ে বই পড়ছেন । দুপুরের পর খেয়ে দেয়ে শুয়ে শুয়ে মা যখন বই পড়েন তখন মা ইচ্ছে করেই তাঁর দীঘল কালো চুল খাটের একদিকে মেঝের দিকে ছেড়ে রাখেন । মার চুল থেকেও চোখ জ্বলা এক ধরণের গন্ধ থাকে ।
আমি মার আশেপাশে ঘুর ঘুর করছি দেখে মা বললেন , কি কিছু বলবি !
না ।
তাহলে অমন বেড়ালের মত য়ামার আশেপাশে অমন  করে পায়চারি করছেন কেন?
মার মন টন ভালো থাকলে কখনো কখনো তিনি আমাদের ভাইবোনদের আপনি করে বলেন । তার মানে এখন মার মন ভালো !

এতক্ষণে সুযোগ পেলাম । হাতছাড়া করার ইচ্ছে হলো না ।
মাকে বললাম , মা তুমি আমার বাবাকে সব সময় পোলাপাইনেরও পোলাপান বলো কেন ?
আমার কথা শুনে মা বাচ্চা মেয়েদের মতো হি হি করে এক প্রস্থ হাসলেন তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন , এই ছেমড়া , তর বাপ আমার কি হয় রে ?
আমার কথা শুনে মার মেজাজ কি আবার গেল চড়ে ?
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি ।
কি জবাব দিস না কেন?
মার প্রশ্নের কি জবাব দেব আমি !
শোন , তুই তখনো হছ নাই ।উনিশ শ সাতান্ন –আটান্ন সালের কথা । তর বাপে তহন আছিল ফুড ইন্সপেক্টর ।ঘুষ খাইতে হইব দেইখা তিনি করলেন কি একদিন হুট কইরা চাকরি ছাইড়া দিয়া মহা বেকার সাজলেন ।এইদিকে আমি আমার তিন পোলা নিয়া চোখে মুখে অন্ধকার দেখতে থাকলাম । তিনি করলেন কি আমাদের ঢাকা থেকে দেশের বাড়িতে পাঠিয়ে নিজে গিয়ে ওয়ারীর যোগীনগরের এক মেসে । দিনের বেলায় গাধার মত এন্তার টিউশনি , টুকরা ফাঁকরা কাজ করেন রাতেরবেলায় ল কলেজে পড়েন । আর প্রতি সপ্তাহে আমাকে কি মধুর ভাষায় চিঠি পাঠাত তোর মাথা মোটা বাপ বলে মা একটু থামলেন  , চিঠি তো নয় যেন ঢাকা থেকে তিনি খামের ভেতর ভরে মিষ্টির হাড়ি পাঠাচ্ছেন । হলুদ রঙা চারকোনা খামের নীচের বাঁ দিকে ঘন সবুজ রঙের ইষ্ট পাকিস্তানের মনোগ্রাম আঁকা চিঠিতে তোর বাপ যে আমাকে কতো কিছু লিখত !  সপ্তাহে দুইটা তিনটা চিঠিও পেতাম কখনো কখনো । তর বাপ আসলে একটা সত্যিই মাথা মোটা টাইপের মানুষ । তোর বাপ মানুষটা তো ভোজন রসিক কিন্তু মেসে কে কি রাঁধে ,কি খায় , না খায় , কেমনে থাকে – এসব নিয়ে আমার খুব চিন্তা হতো ।
মা বাবাকে ‘ মানুষটা ‘ এমন করে বলত যে মনে হত বাবার জন্য ভেতরে ভেতরে মার বুকটা পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছে ।
কি লিখত মা ?
চিঠির শুরুতেই আমাকে সম্বোধন করত , ‘ আমার মানসী মুকুল ‘ বলে মা হাসতে থাকেন । মা যখন হাসছিলেন আমার তখন মাকে কেমন যে লাগছিল ।
কেমন !
আমার কি তখন আনন্দময়ী বিদ্যানিকেতনে ক্লাস নাইনে পড়া কিশোরী বালিকার কথা মনে পড়ছিল !

মা যে আমাকে বাবার চিঠির কথা  বলেছিলেন সেও তো কতকাল আগের কথা । উনচল্লিশ-চল্লিশ বছর আগে আমার মার বলা সেই কথা কিভাবে এসে আমার ভাগ্যে আছর করল !

সেও পেয়েছে তার বাপের গুণ । বাপও চাকরী ছেড়েছিল , ছেলেও করল তাই । তারপর বউ ছেলেমেয়ে দেশে রেখে  পালিয়ে গেল সুদূর ইতালির মিলানো শহরে , ভাগ্য বদলের জন্য ।
ঐ যে বললাম ছেলেও  পেয়েছে বাপের গুণ । সেও তাঁর বউকেও বাপের মত চিঠি লেখে পাঠায় ‘ মানসী লুনা আমার ‘ সম্বোধন করে ।

আমার মৃত মা কি জানেন তাঁর চার নম্বর ছেলেটির কপালও হয়েছে ঠিক তাঁর বাপের মত !