অসহযোগ আন্দোলন ও আমরা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ঊর্মি রহমান

দেখতে দেখতে ১৯৭১ এসে গেলো। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থাণের পর থেকেই গোটা দেশ তেতে ছিলো। নানা অনুষ্ঠান আর সভা-সমিাত হতো। মনে পড়ে, একবার আমরা খুলনায় সন্দীপনের নেতৃত্বে গণসঙ্গীতের আসর করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু সরকারী অনুমতি মেলেনি। কারণ আমরা লাল শাড়ি পরে মঞ্চে উঠতে চেয়েছিলাম। পাকিস্তানী শাসকশ্রেণীর তখন রজ্জুতে সর্পভ্রম হচ্ছিলো। তবে আমাদের ঘরোয়া অনুষ্ঠান করা তো কেউ আটকাতে পারেনি। আমরা সে অনুষ্ঠান করছিলাম আমাদের বাড়িতে বা নিউজপ্রিন্ট মিলের কলোনীর আর কারো বাড়িতে। এখন আর সেটা মনে নেই। একবার কি দু’বার ক্লাবঘরের বড় মিলনায়তনেও করেছিলাম। সঙ্গে সবসময় ছিলেন আমাদের শিক্ষাগুরু সাধন সরকার আর আব্বার সহকর্মীর স্ত্রী লিলি নবী। আমাদের লিলি খালাম্মা। তাঁর পুত্র-কন্যা শাহেদ, শিখা, নওশাদ আর কচি। শাহেদ তবলা বাজাতো। অন্যরা সবাই গান গাইতো। হাসান আজিজুল হক অনেকবার আমাদের জন্য ধারা বর্ণনা লিখে দিয়েছেন। তাঁর চমৎকার খুদে অক্ষরের লেখা সবাই পড়তে পারতো না, কিন্তু আমি পারতাম। শহর থেকে আমাদের ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী রীনা আপা আসতেন। তিনি খুব সুন্দর গাইতেন।

আমাদের মিলের পাশে ছিলো সারি দিয়ে জুটমিল। তার কোনো একটিতে ছিলেন আব্বার এক দূর সম্পর্কের ভাই, রতন চাচা (ডঃ এ আর খান)। তিনিও খুব সুন্দর গাইতেন। আমার মেজবোন তন্দ্রা (তনু) আর ওর বয়সী ছেলেমেয়েরা কোরাসে গাইতো। একবার আমি ওদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রহসন ‘পেটে খেলে পিঠে সয়’ মঞ্চত্ব করেছিলাম। ক’দিন আগে বর্তমানে কানাডা প্রবাসী কচি সেকথা মনে করিয়ে দিয়ে জানালো, সেই নাটকের সংলাপ আজ এত বছর পরও তার মনে আছে। একটি কথা এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। প্রতিটি অনুষ্ঠান আমরা শেষ করতাম ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি দিয়ে। এটা ছিলো অলিখিত নিয়ম। কাউকে বলতে হতো না। স্বতঃস্ফূর্তভাবে সবাই গানটি ধরতো বা গলা মেলাতো। সেটা হয়তো ছিলো ভবিষ্যতে আমাদের স্বাধীন দেশের জাতীয় সঙ্গীত হবার আভাস।

এদিকে তখন গোটা দেশে শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। আমরা খানিকটা রেডিওতে খবর পাই। তখন সবার বাড়িতে টেলিভিশন ছিলো না। কিন্তু আমাদের নতুন ক্লাবঘরে দোতলার গোল ঘরে একটি টেলিভিশন ছিলো। সেটি দেখার জন্য আমরা জড়ো হতাম। সেখানেও গণসঙ্গীত হতো আর তা শুনে আমাদের রক্ত গরম হয়ে যেতো। অন্যদিকে আব্বাদের কাছে শুনতাম ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস’এর (ইপিআর) সদস্যরা মানসিকভাবে প্রস্তুত হচ্ছে। তাঁদের জন্য আমাদের মায়েরা রুটি ও খাবার বানিয়ে পাঠাতো। কলোনীতে কিছু ফিসফাস চলতো। আমাদের বয়সী যারা, আমি, শাহেদ, রঞ্জুমামা তাঁর ভাই রমু, দিলওয়ার তার ভাই শেলু, শেলুর বন্ধু শাব্বির, লুসি ওর ভাই ওমর, এরকম আরো অনেকে জটলা করতাম, কি হবে, হতে পারে বা হওয়া উচিত, তাই নিয়ে গবেষণা করতাম, আলোচনা করতাম। এদিকে আমাদের বাড়িতে আমার এক সহপাঠী বন্ধু মঞ্জু ছিলো। ওর আব্বা হঠাৎ বরিশাল বদলী হয়ে যাবার পর ও অকূল পাথারে পড়েছিলো, কারণ বছরের মাঝখানে চলে গেলে পড়ার ক্ষতি হবে। ও ব্রজলাল কলেজে কেমিস্ট্রি নিয়ে অনার্স পড়ছিলো। আব্বা ও মা তখন ওকে আমাদের বাড়িতে রেখে দেয়। আমরা বেশ বড় দল ছিলাম কলোনীতে। আব্বাদের অবাঙালি (মূলতঃ উর্দুভাষী) সহকর্মীদের ব্যাপারে সবাই একটু সতর্ক থাকতো। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁদের সহানুভূতি ও সমর্থন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকশ্রেণীর পক্ষেই ছিলো। বাইরে তাঁরা অবশ্য সেটা প্রকাশ করতেন না। এভাবেই চলছিলো। তারপর এলো ২৫শে মার্চ। কিন্তু খুলনায় আমরা ঐদিনটি মাহাত্ম্য বুঝিনি, ঢাকায় কি ঘটছে, সেটা জানতে সময় লেগেছিলো। শুধু হঠাৎ দেখলাম রেডিও নিশ্চুপ। কারো মুখ হাসি ছিলো না। সবাই উদ্বেগ ও আশঙ্কায় গম্ভীর। তরুণরা ভেতের ভেতরে টগবগ করে ফুটছিলো। সেটা শুধু খুলনা বলে নয়, গোটা দেশেই ছবিটি ছিলো এক। আমাদের জীবনে ২৫শে মার্চ না থাক, ছিলো ২৭শে মার্চ। সেই ভয়াল দিনের কথা আজও ভুলতে পারিনি। তবে সেকথা আজ থাক, আগামীতে বলবো।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]