অসুখী মানুষ

গল্পের অসুখী রাজার জন্য সুখী মানুষের গায়ের জামা আনতে বলেছিলো তার চিকিৎসক। বলেছিলো-রাজা যদি সুখী মানুষের জামা পরিধান করতে পারে তবেই তার দুঃখ কেটে যাবে। রাজাকে সুখী করতে দেশে দেশে সুখী মানুষের সন্ধানে ছুটেছিলো রাজার সৈন্যরা। কিন্তু সুখী মানুষ কোথায় পাওয়া যায়? খুঁজতে খুঁজতে পথে তারা ভীষণ সুদর্শন এক যুবককে দেখে  ভাবলো এই যুবক নিশ্চয়ই সুখী। কিন্তু কথা বলে জানতে পারলো সে মানসিক ভাবে ভারসাম্যহীন। এমনি করে বহু মানুষের দেখা তারা পেলো। কিন্তু কথা বলে জানা গেলো তারা প্রত্যেকেই দুঃখী। শেষে এক নদী তীরে একজন মানুষকে শুয়ে থাকতে দেখে সৈন্যরা গিয়ে তাকে পাকড়াও করলো। সেই লোককে বাড়ি কোথায় জানতে চাইলে সে জানায় এই নদীরে তীর্-ই তার বাড়ি। গাছের ছায়াই তার শয্যা। প্রয়োজন হলে সে গাছের ছায়ায় ঘুমিয়ে থাকে।

এবার রাজার প্রতিনিধিরা বুঝতে পারলো এই লোক-ই হচ্ছে প্রকৃত সুখী মানুষ। তখন তারা লোকটির গায়ের জামাটা কিনতে চাইলে সেই লোক তাদের জানিয়েছিলো তার কোনো জামা নেই। গল্পের সেই সুখী মানুষটির মতো পৃথিবীতে কি সুখী মানুষদের জামা থাকে না? আর অসুখী মানুষ বিষাদের পোশাক পরিধান করে ধীরে ধীরে আরো বেশি একা ও দুঃখী হয়ে যাচ্ছে?

কেনো এতো অসুখী হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর মানুষ? তার মনের মধ্যে অভিমান আর নিরানন্দের বর্ষাকাল কেনো? প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া কঠিন। কারণ সুখ আর অসুখের নিক্তিটা বড় স্পর্শকাতর। কিন্তু পৃথিবীতে মানুষ তো সুখী হতে চায়। নিজের ইচছায় দুঃখের ভার ভার বহন করতে চাইবে এমন মানুষ খুব বিরল।কিন্তু চারপাশে কি প্রচুর সুখী মানুষ আমরা দেখতে পাই? অভিমান, অভিযোগ আর অতৃপ্তি মানুষের দুঃখের পাল্লাকে ভারী করে তুলছে।

এই সংখ্যা প্রাণের বাংলায় প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো অসুখী মানুষ নিয়ে নানা কথা।

তিব্বতের বৌদ্ধ ভিক্ষু ম্যাথিউ রিচার্ডকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে সুখী ব্যক্তি। তিনিই জানিয়েছেন, কেন মানুষ অসুখী হয়।

সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিনের অধীনে ১২ বছরব্যাপী ধ্যান ও মায়া বিষয়ক এক গবেষণায় অংশ নেন ৭০ বছর বয়সী এই ভিক্ষু ম্যাথিউ। ম্যাথিউ রিচার্ড যে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ সে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে স্নায়ুবিজ্ঞানী রিচার্ড ডেভিসন ওই ভিক্ষুর শরীরে ২৫৬টি সেন্সর লাগান। এ সময় ধ্যান করছিলেন ম্যাথিউ। ডেভিসন দেখতে পান যে, ধ্যান চলাকালে ম্যাথিউয়ের মস্তিষ্ক গামা তরঙ্গের একটি স্তর উৎপাদন করে। যার সঙ্গে চেতনা, মনোযোগ, শেখা এবং স্মৃতির সম্পর্ক আছে। যা আগে কখনোই কোনো বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে উঠে আসেনি।

সেই সময় ডেভিনসর বুঝতে পারেন, ম্যাথিউয়ের মস্তিষ্কের বাম দিকের বহিরাবরণ বেশি কার্যকর। যার কারণে নেতিবাচকতার প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে বেশি বেশি সুখী থাকতে পারেন তিনি।

অন্যরাও কীভাবে সুখী হতে পারে জানতে চাইলে সুখী মানুষ ম্যাথিউ বলেন, দয়ালু আর নিঃস্বার্থ হওয়ার মাঝেই রয়েছে মানুষের সুখী হওয়ার চাবিকাঠি। পাশাপাশি তিনি বলেন, প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট মনকে ভালো ভালো কথা ভাবতে শেখানোর চর্চা মানুষের হৃদয়ে সুখের অনুভূতি এনে দিতে পারে। কিন্তু মানুষ কি সত্যি সত্যি সুখী হতে পারে?

মানুষের জীবনে দুঃখের শুরুটা কোথা থেকে?অসুখের আগুনে একটু একটু করে পুড়ে যাওয়ার কালটাই বা মানুষের জীবনে প্রথম কবে এসেছিলো? উত্তরে বলা যায় মানুষ যখন থেকে অসুখী হতে শুরু করেছিলো। মানব মনের এই গভীর বিষাদমাখা মানচিত্র আঁকাটা আসলে যে কারো  পক্ষেই কঠিন। পৃথিবীতে প্রাচীন কালে শিকারি সমাজে মানুষের ভাষায় ‘কাজ’ বলে কোনো শব্দ ছিলো না। যেমন ছিলো না ‘সুখ’ বা ‘অসুখের’ কথা। শিকার তাদের কাছে ছিলো একটা খেলা। জীবন বাঁচানোর খেলা। কাজ করতে হলে দক্ষতার প্রয়োজন হয়। বেশি শ্রমের প্রয়োজন হয় না। শিকার করতে তাদের বেশি শ্রমের প্রয়োজন পড়তো না। সবাই মিলে দক্ষতার সঙ্গে সে খেলায় মেতে উঠতো। ক্ষিধে পেলেই শিকারের প্রয়োজন দেখা দেয়। পেট ভর্তি থাকলে তাদের অফুরন্ত সময়। ফলমূলের এতো প্রাচুর্য থাকায় সেই সমাজে কৃষিকাজকে সময়ের অপচয় বলে মনে করা হতো। কৃষিকাজ আবিষ্কারের পর কৃষি জমির জন্য উদয়াস্ত পরিশ্রমের প্রয়োজন পড়ে।

তাছাড়া ফসল পাহারা দেয়া, পোকামাকড় থেকে রক্ষা করার জন্য মানুষকে সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে মারামারি শুরু হয়। কিন্তু প্রাক-কৃষি যুগের মানুষ জমির জন্য লড়াই করতো না। কারণ জমির তখন কোনো মালিক ছিলো না। তখন তাদের সুখের সীমা ছিলো না। তাহলে কি সম্পদ এবং অধিকার বোধ মানুষকে অসুখী করে তুলেছিলো সেই কৃষি নির্ভর সমাজে?

শিকারি যুগের মানুষ প্রকৃতিগতভাবে জনসংখ্যা আয়ত্বের মধ্যে রাখতে বাধ্য হতো, কিন্তু কৃষি যুগে পা রেখে বিগত ১০ হাজার বছর ধরে মানুষ তার জীবনযাপনের পদ্ধতিই পাল্টে ফেলেছে।   কৃষি তাদের জন্য শ্রম নির্ভর একটি পেশা। তাই সে কাজের জন্য মানুষের প্রয়োজন হয়ে পড়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির। সুতরাং ক্রমে কৃষকের সংখ্যা বৃদ্ধি ও শিকরি মানুষের সংখ্যা হ্রাস পায়।
ড্যানিয়েল কুইনের মতে, শিকার সংগ্রহকারী সেই অর্থনীতি ছিলো অনেক বেশি শক্তিশালী। অন্যান্য পশুর সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রেখে তারা নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছিলো। কিন্তু গত ১০ হাজার বছর সেই কৃষিনির্ভর সভ্যতা বিভিন্ন স্তর পার হয়ে আজ অমানবিক-গণতান্ত্রিক সভ্যতার জন্ম দিয়েছে। এই সভ্যতার চাপে মানববান্ধব পরিবেশ গেছে নষ্ট হয়ে। আর মানুষের অসুখী হৃদয়ের জন্মও বোধ হয় এই সূত্র ধরেই।

মহাভারতের কাহিনিতে আছে, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে প্রশ্ন করেছিলেন, বলো, সুখী কে? যুধিষ্ঠির উত্তর দিয়েছিলেন, যে ব্যক্তি সন্ধ্যাবেলা শাকান্ন রন্ধন করে খায়, যার কোনো ঋণ নেই এবং যে অপ্রবাসী সে-ই সুখী। এতো সামান্যতেই মানুষের সুখের সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়ে যায়! কিন্তু মানুষ কি এতো অল্পেতে তুষ্ট? উত্তর হচ্ছে, না। আর সে তুষ্ট নয় বলেই এতো অসুখের জন্ম। লোভ, হিংসা আর চাহিদার সামনে মানুষের সুখের ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়, কিন্তু মানুষ তা বুঝতে চেষ্টা করে না।

রবীন্দ্রনাথের গানে আছে, ‘‘তারা সুখের লাগি প্রেম চাহে, প্রেম মেলে না’’। প্রেম তো পাওয়ার কথা নয় মানুষের। কারণ তার হৃদয়ে যে অপূর্ণের শোকগাথা লেখা হয়ে চলছে অবিরাম তা মানুষকে সুখী হতে দেয় না। অপূর্ণতার মাত্রা আসলে দার্শনিক চিন্তার মাপ। শিল্পী তার চিত্রকর্মে রঙ লাগিয়ে তৃপ্ত নয়। কবি তার শব্দের ভেতরে জাদু খুঁজে না পেয়ে যাতনায় ভোগেন, ভালোবাসা না পেয়ে অতৃপ্তি তছনছ করে প্রেমিক-প্রেমিকাকে। রোমিও আর জুলিয়েট একে অপরকে পায়নি বলেই তা অমর কাহিনি হয়ে আছে পৃথিবীতে। ঘুরিয়ে বললে প্রেমের অতৃপ্তি এই দুটি চরিত্রকে পৃথিবীতে ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে অমর করে রেখেছে। অসুখী হৃদয় কতভাবে যে অসম্পূর্ণ যাতনাকে অমরতা দেয় তার কোনো সীমা নেই।

আসলে ভীষণ অপেক্ষিক মানুষের সুখ আর অসুখের মাত্রা। পৃথিবী কি ছেয়ে গেছে অসুখী মানুষে? তাহলে সুখী কারা? যারা দিন শেষে চারটা অন্নের ব্যবস্থা করতে পারে, পরিবার পরিজন নিয়ে সংসারের শীতল পাটিতে শয়নের অধিকার পায় তারাও কি সুখী? প্রশ্নের উত্তরটা যেমন আপেক্ষিক তেমনি প্রশ্নটাও। সেই সুখী ভিক্ষু ম্যাথিউ রিচার্ড বলেছেন, মানুষ অন্যের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করে সুখকে হত্যা করে। সেও তো আসলে সেই অতৃপ্তির আয়নায় নিজের মুখ দেখার মতো।

প্রাচীন যুগে দার্শনিকরা মানুষের সুখ এবং অসুখের সীমানা খোঁজার চেষ্টা করেছেন। আধুনিক যুগে মনোবিজ্ঞানীরা মানুষের মনের ময়নাতদন্ত করেছেন এই সূত্র খুঁজে বের করতে। বিজ্ঞানের নানা পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে আলো ফেলে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে মানুষের মস্তিষ্কের ভেতরে সুখ ও অসুখের নানা প্রতিক্রিয়া। কিন্তু তাতেও তো স্থির করে বলা যায়নি কিছুই। মানুষের মন শুধু তার পারিপার্শ্বিক আর একেবারে হৃদয়ের গভীরে অচেনা আলো জ্বেলে গহীন সমুদ্রে হারিয়ে গেছে কোনো জাহাজের মতো।

লেখার শুরুতে সেই গল্পের সুখী মানুষের কোনো জামা ছিলো না। তাই হয়তো রাজারও আর সুখী হওয়া হয়নি। দার্শনিক ও গণিতজ্ঞ বার্ট্রান্ড রাসেল বুঝতে পারতেন না এতো মানুষ সবসময় কেনো অসুখী। কিন্তু মজার ব্যাপার হচেছ ইংল্যান্ডের ধনী পরিবারের সন্তান হয়েও রাসেল একাকীত্বে ভুগতেন এবং তরুণ বয়সে বিষন্ন হয়ে আত্নহত্যা করারও চেষ্টা করেছিলেন। পরে তিনি নিজের লেখায় লিখেছেন, অঙ্ক করার তাড়নাই তাকে আত্নহননের পথ থেকে ফিরিয়ে এনেছিলো। ১৯৩০ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘কনকোয়েস্ট অফ হ্যাপিনেস’ বইতে তিনি লিখেছেন, অর্থহীনতা, প্রতিযোগিতা, একঘেয়েমী, ক্লান্তি, হিংসা এবং অপরাধবোধ মানুষের মনকে ক্রমাগত অসুখী করে তোলে। মানুষের মনে এই রোগগুলো গেঁথে দিয়েছে আধুনিক সভ্যতা।

তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে শুধুই কি খ্যাতি, অর্থ আর স্বাচ্ছন্দ্য মনুষকে সুখী করে? রাসেল উত্তর দিয়েছেন, যারা এই তিনটি মা্যেমকে সুখের মূল কারণ বলে মনে করেন তারা অনেকটা ডাইনোসরের মতো। সামাজিক ক্ষমতা পেতেই মানুষ এই তিনটি বস্তুকে অর্জন করতে চায়। কিন্তু মানুষ ভুলে যায়, ডাইনোসরেরা পৃথিবী থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে। টিকে আছে মানুষের জ্ঞান।

মান্না দে গান গেয়েছেন, ‘‘সবাই তো সুখী হতে চায়, কেউ হয় কেউ হয় না’’।পৃথিবীতে মানুষ সুখী হতেই চায়। এটাই তো স্বাভাবিক মনের প্রক্রিয়া। কিন্তু তারপরেও অসুখী এক পৃথিবীর কাছে আত্নাকে বন্ধক রাখে মানুষ। জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন তাঁর কবিতায়, ‘‘জানি-তবু জানি/ নারীর হৃদয়-প্রেম-শিশু-গৃহ-নয় সবখানি/ অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয়/ আরো এক বিপন্ন বিষ্ময়/ আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে/ আমাদের ক্লান্ত করে’’।

এই বোধ-ই কি সুখের বিপরীত ধারণা? সবকিছুর ভেতরে থেকেও বিপন্ন এক বিষ্ময়ে একা হয়ে যাওয়া, অসুখী হয়ে পড়া?

পৃথিবীজুড়ে মানুষের উপর অসুখী চেতনা ছায়া বিস্তার করছে। ক্লান্তি, একঘেয়েমী আর প্রতিযোগিতার দৌড় মানুষকে বিপন্ন করে ঠেলে দিচ্ছে অসুখী জীবনের ভিতর?

ইরাজ আহমেদ

ছবিঃ প্রাণের বাংলা