অ্যান্ড এ স্পাই…

স্তালিনের ব্রোঞ্জের ডেস্কল্যাম্প

বিশাল জায়গাটায় ঢুকলে প্রথমেই চোখে পড়বে কাঠের টেবিলের সামনে চেয়ার পেতে বসা একটি ম্যানিকুইন। সেটার পরনে রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি’র প্রধান কর্মকর্তার ইউনিফর্ম। টেবিলের উপর সাজানো সব জিনিসপত্র হুবহু আসল কর্মকর্তার অফিসঘরের মতোই। সেখানে রাখা আছে ব্রোঞ্জের তৈরী একটি ডেস্কল্যাম্প। এই ল্যাম্পটির আসল মালিক ছিলেন সোভিয়েট রাশিয়ার প্রতাপশালী শাসক জোসেফ ভিসানিয়োনোভিচ স্তালিন।পাশের দেয়াপলে সেঁটে রাখা একদা সোভিয়েত রাশিয়ার প্রচারণা পোস্টার আর ১৯২৮ সালে ব্যবহৃত বৈদ্যূতিক সুইচবোর্ড।

বিষাক্ত কাঁটাওয়ালা ছাতা

 পুরো জায়গাটাই আসলে রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি’র ব্যবহৃত নানান জিনিস দিয়ে সাজানো একটি জাদুঘর। আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরের ম্যানহাটনে এই জাদুঘর খুলে বসেছেন বাপ বেটি মিলে। নাম দিয়েছেন ‘কেজিবি স্পাই মিউজিয়াম’। একেবারেই জেমস বন্ডের সিনেমার আবহ বিরাজ করছে সেখানে।  
বাবা জুলিয়াস উরবেটিস আর তার কন্যা এজিন উরবেটিস।দুজনেরই আছে পুরনো জিনিসের প্রতি গভীর আকর্ষণ। আর সে আকর্ষণেই তারা তৈরী করে ফেলেছেন এমন এক অভিনব জাদুঘর। কী নেই সেখানে? গোয়েন্দাবৃত্তির কাজে ব্যবহৃত গুপ্ত ক্যমেরা, বিষাক্ত কাঁটাওয়ালা ছাতা, লিপস্টিক পিস্তল, কোটের বোতামে লাগানো আড়িপাতার যন্ত্র, নির্যাতনের জন্য বিশেষ চেয়ার।
বহু বছর ধরে এই সংস্থা গোট পৃথিবী জুড়ে গড়ে তুলেছে এক গোপন পৃথিবী। সে-পৃথিবীতে তাদের প্রতিপক্ষ অন্য দেশের গোয়েন্দারা। তাদের মধ্যে চলে অবিরাম ইঁদুর বিড়াল খেলা।চলছে ভিন্নমত আর প্রতিপক্ষকে দমনের চেষ্টা। সেসব কাহিনির বেশিরভাগটাই আমাদের অজানা। রহস্যময় সেই পৃথিবীর গোপন কোণে আলো ফেলেছে এই জাদুঘর।
এই জাদুঘরের ভেতরমহল নিয়ে রইলো প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজন ‘

কেজিবি আমলে এজেন্টদের বিশেষ ধরণের জুতা

জাদুঘরে প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়েছে একটি নীল রঙের বুলগেরিয়ায় তৈরী ছাতা। আপাত নিরীহদর্শন এই ছাতার মাথায় লুকানো আছে একটি সূঁচ। ছাতার বোতামে চাপ দিলেই মারাত্নক রিসিন বিষ মাখানো সূঁচ ছিটকে বেরিয়ে গেঁথে যাবে কারো শরীরে। আর তারপর বিষক্রিয়ায় নির্মম মৃত্যু। জাদুঘরের অন্যতম কিউরেটর এজিন উরবেটিস বলেন, এই ছাতাটি ১৯৭৮ সালে রুশ কথাশিল্পী জর্জি মারকভকে খুন করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিলো। মারকভের অপরাধ ছিলো তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছিলেন বেলজিয়মে। তিনি জানান, এরকম কয়েক হাজার গুপ্ত অস্ত্র, চিঠি আর দলিলপত্র রয়েছে তাদের জাদুঘরে।তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে এই বাবা এবং মেয়ে জাদুঘরটির স্বত্তাধিকারী নন। মূল মালিকদের পরিচয় রয়ে গেছে আড়ালেই।
এজিনের বাবা জুলিয়াস উরবেটিসর প্রাচীন জিনিস সংগ্রহের নেশা বহুকাল ধরেই। পুরনো গাড়ি, মটোরসাইকেল থেকে শুরু করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত গ্যাস মাস্ক সবই আছে তার সংগ্রহশালায়। ৫৫ বছর বয়সী জুলিয়াস প্রায় তিন দশক ধরে পৃথিবীর নানা জায়গা ঘুরে প্রাচীন জিনিস সংগ্রহ করছেন। এজিন উরবেটিস নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, বেশ কয়েক বছর আগে তার বাবার হাতে আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের ব্যবহৃত একটি শোনার যন্ত্র।কিারো ফোনে বা বাড়িতে আড়িপাতা হলে হিটলার এই যন্ত্রটির মাধ্যমে কথা শুনতেন। এই যন্ত্রটি-ই তার বাবাকে ধীরে ধীরে গুপ্তচরদের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে। ২০১৪ সালে জুলিয়ান রাশিয়ার লিথুনিয়ায় জুলিয়াস খুঁজে পান একটি ‘অ্যাটেমিক বাংকার’। পারমাণবিক আক্রমণের সময় আত্নগোপন করতেই এই বাংকার তৈরী করা হয়েছে। সেখানে জুলিয়াস তার সংগ্রহের অর্ধেক জিনিস পেয়ে যান। সেখানেই এসব জিনিস রাখা ছিলো।

আলমারি ভর্তি টাকা

তাদের জাদুঘরে আছে কেজিবি’র দফতরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ব্যবহৃত চেয়ার। আছে মানুষকে ধরে এনে লুকিয়ে রাখার গোপন বাড়ির আসল দরজা। এসব বাড়িতে বিরুদ্ধ মত ও রাজনীতির মানুষদের ধরে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো। নানা ধরণের মানসিক নির্যাতনের পরেও তারা কথা না-শুনলেশেরীরে ঢুকিয়ে দেয়া হতো মারাত্নক ওষুধ। এসব ওষুধ একজন মানুষের মাথা থেকে চিন্তাশক্তি উড়িয়ে দিতে পরে।এ ধরণের ওষুধের শিশি এবং সিরিঞ্জও রাখা অছে জাদুঘরে।
কাঁচের তৈরী ছোট ছোট বাক্সে তারা সাজিয়ে রেখেছেন কেজিবি এজেন্টদের ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরণের আড়িপাতা যন্ত্র। এসব যন্ত্র বসিয়ে দেয়া হতো তাদের হাতের আংটি, কোটের বোতাম, কোমরের বেল্ট আর কলমে। ঠাণ্ডা যুদ্ধের (কোল্ড ওয়ার) সময়ে এসব আড়িপাতার যন্ত্র ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। আর শুধু আড়িপাতার যন্ত্র-ই নয়, এখানে আছে সেই আমলে ব্যবহার করা এনালগ টেলিফোন সেট। জাদুঘরে সোভিয়েত আমলে কেজিবি ব্যবহৃত একটি জেলখানার সেলও কৃত্রিম ভাবে তৈরী করা হয়েছে। সেখানে পুতুল আকারে সাজিয়ে রাখা হয়েছে একজন নারী বন্দীকে।অছে তখনকার আমলে ব্যবহৃত বন্দীদের জ্যাকেট, বিছানা আর নির্যাতনের জন্য লোহার টেবিল। আছে সেই সময়ে রুশ গুপ্তচরদের ব্যবহৃত আসল পিস্তল।এখানে আছেকেজিবি উদ্ভাবিত বিশেষ ধরণের‘লিপস্টিক পিস্তল’।এই লিপস্টিক ঠোঁটেও লাগানো যায় আবার চালানো যায় গুলি।
জাদুঘরে আসা দর্শকদের আসল সময়ের স্বাদ বোঝানোর জন্য রাখা আছে কেজিবি এজেন্টদের ব্যবহৃত খয়েরি চামড়ার ওভারকোট। যে কেউ চাইলে এই কোট গায়ে দিয়েও দেখতে পরেন। এখানে গুপ্তচরদের ব্যবহারের গোপন ক্যামেরাও সাজানো আছে। দর্শক চাইলে সে ক্যামেরায় ছবিও তুলতে পারবেন। জুলিয়াসের সংগ্রহশালায় রয়েছে কেজিবি আমলে এজেন্টদের বিশেষ ধরণের জুতা। এসব জুতায় করে তারা বিষ থেকে শুরু করে ছবির রোল বহন করতো।
জুলিয়াস মনে করেন, এই জাদুঘর আমাদের নিকট ইতিহাসের এক অন্ধকার সময় এবং নির্যাতনকে তুলে ধরবে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্র ও ছবিঃ নিউইয়র্ক টাইমস, ডেইলি টেলিগ্রাফ