আঁধার রাতের জাহাজ

ড: সেলিম জাহান

ড.সেলিম জাহান। আমেরিকার মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যাগত অধ্যাপক হিসেবে পড়িয়েছেন, পড়িয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাজ করেছেন জাতিসংঘেও। লেখাপড়ার বিষয় অর্থনীতি হলেও লেখালেখি, আর তাঁর চিন্তার দিগন্ত একেবারেই ভিন্ন এক পৃথিবীর গল্প। প্রাণের বাংলার জন্য এবার সেই ভিন্ন পৃথিবীর গল্প ধারাবাহিক ভাবে লিখবেন তিনি। শোনাবেন পাঠকদের নিউইয়র্কের একটি দ্বীপে তার বসবাসের স্মৃতি।

রুজভেল্ট দ্বীপের আবাসনের বারান্দায় দুলুনী চেয়ারে বসেছিলাম। সন্ধ্যে হয়ে এসেছে – আঁধার নেমেছে চারদিকে। পূর্বী নদীর কালো জল কেটে একটি জাহাজ যাচ্ছে। তেলের জাহাজ হবে সেটা – তার এখানে ওখানে মিটমিটে আলো। ছবিটা মনকে নাড়িয়ে দিলো।মনে পড়লো অন্ধকার রাতে দূরে একটি জাহাজের ছবি মেঘনার বুকে। ধক্ ধক্ করা জ্বলজ্বল চোখের একটি কালো বেড়ালের মতো থাবা মেরে বসে আছে যেন জাহাজটি। জাহাজের বাতিগুলোর প্রতিচ্ছায়া টলটলে জলের মধ্যে প্রতিফলিত হয়ে কেমন যেন একটা রহস্যের সৃষ্টি করছে।

পূর্বী নদীর জাহাজটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে যেন দেখতে পেলাম জাহাজের চাকাগুলো ঘুরতে শুরু করেছে সেই পরিচিত শব্দ করে এবং জাহাজটি চলতে শুরু করেছে পেছনের দিকে ধীরে ধীরে। জাহাজটি পেছিয়ে যাচ্ছে প্রায় ৫০ বছর আগে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে কত জাহাজের স্মৃতি – ‘গাজী’, ‘অস্ট্রিচ’, ‘কিউই’, গারো’, ‘মাসুদ’, ‘মোমেন’, ‘লেপচা’, ‘ইরানী’, ফ্লোরিকান’, ‘ফ্লেমিঙ্গো’ ‘টার্ন’, ‘টিল’, এবং আরো কত ছোট-বড় নৌ-যান। এগুলোর চলতি নাম ছিল ‘স্টিমার’।এসব স্টিমারের কিছু কিছু চলেছে ‘ঢাকা মেইল’ হিসেবে ঢাকা-বরিশাল পথে, কোন কোনটি সেই বিখ্যাত ‘রকেট’ হিসেবে ঢাকা-খুলনা নৌ-পথে।মনে আছে ‘ঢাকা মেইল’ ধরতো সব ঘাট ঢাকা-বরিশাল যাত্রা পথে, আর ‘রকেট’ খুলনা-ঢাকা যাত্রাপথে থামতো বরিশাল, চাঁদপুর, মুন্সীগঞ্জ আর নারায়নগঞ্জ। বলা বাহুল্য, কৌলীন্যে ‘রকেটের’ কাছে-ধারে ঘেঁসতে পারতো না অন্যকিছু। অভিজাত ‘গাজী’, ‘কিউই’ আর ‘অস্ট্রিচের’ তো একটি ঐতিহাসিক খানদানী প্রতীকি ভাবমূর্তি ছিলো।

চার রকমের স্থান-বিভাজন ছিলো জাহাজগুলোতে।উচ্চবিত্তদের জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেনী, মধ্যবিত্তদের জন্য ‘ইন্টার ক্লাশ’ আর আম-জনতার জন্য তৃতীয় শ্রেনী – যা মূলত: জাহাজের ভূমি। সম্ভ্রান্ত চোখ ধাঁধানো প্রথম শ্রেনী থাকতো জাহাজের ডিম্বাকৃতি সামনের দিকে দু’ধারে সাজানো একাধিক কেবিনে, মাঝে প্রথম শ্রেনীর যাত্রীদের খাবার জায়গা, যাকে বলা হতো ‘সেলুন’। সে সেলুনের মাঝে সাদা কাপড় ঢাকা সুদৃশ্য টেবিল চেয়ার। সেলুনের সামনের দিকে দেয়াল ঘিরে মোড়ানো বেঞ্চি বসার জন্য। তার পাশ দিয়ে বাইরে বেরুনোর দরজা, যা দিয়ে বেরুলে প্রথম শ্রেনীর যাত্রীদের বসার ডেক। সেখানে ছিলো কেদারা আর আরাম কেদারার ছড়াছড়ি ছোট ছোট নীচু টেবিল সহ।

চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি বছর ৪০ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে ছুটিতে সবান্ধবে দলে-বলে ঢাকা-বরিশাল করছি বেশীর ভাগ সময়ে ‘রকেটে’ এবং কখনো কখনো ‘ঢাকা মেইলে’। পাড়ি দিয়েছি দিনে-রাতে।ছাত্র হিসেবে আমাদের টিকেট থাকতো তৃতীয় শ্রেনীর, কখনো সখনো বড়জোর মধ্যম শ্রেনীর। কিন্তু সদলবলে হুড়মুড় করে আমরা ঢুকে পড়তাম সেলুনে।মালপত্র সব সেলুনের মোড়ানো বেঞ্চিতে রেখে আমরা আস্তনা গাড়তাম সেখানেই। পুরো ব্যাপারটি বেআইনী নি:সন্দেহে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় তরুন ছাত্র হিসেবে একধরনের স্বস্নেহ প্রশয় পাওয়া যেতো সবার কাছ থেকে।

তবে সব জাহাজেই সেলুনে আমাদের একজন ত্রানকর্তা থাকতেন – যেমন, গাজীর ‘মুন্সি’। কি তাঁর আসল নাম, তা কেউ জানত বলে মনে হয় না, কিন্তু সবার কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘মুন্সি’ বলে – সেলুনের দন্ডমুন্ডের কর্তা। কেউ কেউ তাঁকে ‘দরবেশ’ও বলতেন, মনে আছে। আমাদের মত অর্বাচীনদের জন্য কতগুলো নিয়ম তিনি বেঁধে দিয়েছিলেন – প্রথম শ্রেনীর যাত্রীরা সেলুনে থাকলে আমাদের বাইরে গিয়ে দাঁড়াতে হবে, তাঁদের খাওয়া-দাওয়া শেষ হলেই তবে আমরা খেতে পাবো, ডেকে আমরা কেদারায় বসতে পারি, যদি না প্রথম শ্রেনীর যাত্রীরা সেখানে না বসেন, সেলুনে গোলমাল করা সম্পূর্ন নিষিদ্ধ ইত্যাদি ইত্যাদি।

দু’টো বিশেষ নিয়মও ছিলো আমাদের জন্য। এক, টিকেট দেখতে আসলে তার আগেই আমাদের জাহাজের সাধারন জায়গায় চলে যেতে হবে। দুই, কোন উচ্চপদস্হ সরকারী বিশিষ্টজন যদি প্রথম শ্রেনীতে ভ্রমন করেন, তা’হলে আমরা বহিষ্কৃত হবো।

বেশীর ভাগ সময়ই আমাদের কাটতো প্রথম শ্রেনীর ডেকে। রেলিং এ ভর দিয়ে সবাই মিলে গল্প করে আর আড্ডা দিয়ে। কাপ কাপ চা উড়ে যেতো, সঙ্গে থাকতো কেক। বেশ রাতে আমাদের খাওয়ার ডাক পড়তো – সাদা জুঁই ফুলের মতো ভাত, ধোঁয়া ওঠা সবজি, শুরুয়া সহ সুগন্ধের ছোট মুরগীর মাংস, ঘন ডাল। সঙ্গে সুন্দর করে কাটা কাগজী লেবু আর কুঁচোনো শশা আর পেঁয়াজ সির্কাসহ। শেষে মধুরেন সমপায়েৎ হতো ‘রকেটের’ সেই বিখ্যাত ‘পুডিং’, যার সোয়াদ এখনও মুখে লেগে আছে।

খাওয়া-দাওয়া শেষে আড্ডা আরও ঘন হয়ে বসতো। রাত বাড়তো – বন্ধুরা একজন দু’জন করে কুঁকড়ে-মুকড়ে শুয়ে পড়তো সেলুনের মোড়ানো বেঞ্চিতে। আমি ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতাম ডেকে। রেলিংএর কৌচ টেনে নিয়ে রেলিংএ পা তুলে দিয়ে দিতাম। সারা শরীর ছাড়িয়ে দিতাম কেদারায়, তারপর দৃষ্টিটা ছড়িয়ে দিতাম দূরে, বহুদূরে।

চারদিক আস্তে আস্তে শব্দ থিতিয়ে আসা শান্ত পরিবেশে প্রথমেই যা চোখে পড়তো, তা হচ্ছে মাথার ওপরের বিশাল তারা-খচিত আকাশ, নীচে প্রমত্তা নদী আর চারদিকের নিকষ কালো অন্ধকার।কালে-ভদ্রে অবশ্য চাঁদনী রাত পাওয়া যেতো। অন্ধকারে দূরে দূরে নৌকোর মিটমিটে আলো দেখা যেতো, কখনো কখনো সরু সরু জেলে নৌকোগুলো সাঁই করে স্টিমারের পাশ দিয়ে চলে যেতো। জেলেদের জলে জাল ফেলার ঝপাং শব্দ শোনা যেতো।নৌকে বা অন্যদিক থেকে আসা ছোট ছোট লঞ্চ দেখলেই আমাদের জাহাজটি ভোঁ বাজাতো -যেন ধমকে উঠতো, ‘এই সর্, সর্। জায়গা দে’।

নীচের দিকে তাকালেই দেখতাম, জাহাজের আলো পড়েছে নদীর জলে। জাহাজের সৃষ্ট ঢেউয়ে সে আলো ঠিকরে তৈরী হয়েছে রুপোলী তরঙ্গ – তাকিয়ে থাকতে থাকতে কেমন যেন ঘোর লেগে যেতো। মাঝে মাঝে জাহাজের বিশাল সার্চ লাইটের নীলচে-সাদা আলো জ্বলে উঠতো। তীব্র আলোর রশ্মি ছড়িয়ে পড়তো সামনের দিকে বহুদূরে।কখনো সখনো সে আলোর থিতু হতো নদীর পাড়ের ভাঙ্গনে। সারেং সাহেব হয়তো জানতে চাইতেন পাড় কতদূরে।

সার্চ লাইটের সে আলো আমাকে এতো আকর্ষন করতো যে আমি নেমে আসতাম স্টিমারের একতলায়। চলে যেতাম একেবার জাহাজের সামনে। বসতাম জাহাজের দড়ি বাঁধার কালো লোহার নীচু স্তম্ভে। জলের ঝাপটা এসে ভিজিয়ে দিতো – ভ্রুক্ষেপ করতাম না। চোখ ধাঁধানো সার্চ লাইটের অজস্র পোকা উড়ে বেড়াতো – ‘মরিবার তরে হয়তো’! সারেং সাহেব মাঝে মাঝে সার্চ লাইটের ঘাড় ঘুরিয়ে এ’দিক ও’দিক ফেলতেন – কেনো তা তিনিই জানেন। নদীর হাওয়ায় শিরশিরে ঠান্ডার আলমত টের পেতাম।.পাশ দিয়ে যেতে যেতে এক বর্ষীয়ান জাহাজ-কর্মী ভেতরে চলে যেতে বলতেন এক মায়াময় মমতায়।

উঠতাম এক সময়ে। আস্তে আস্তে ইঞ্জিন ঘরের দিকে যেতাম। দৈতাকৃতি ইঞ্জিনের চেহারা দেখে আর শব্দ শুনে চমক লাগতো। কয়লা ঘরে দেখতাম খালাসীরা বেলচা ভরে কয়লা ভরছে। কয়লা ঘরের তীব্র গরমে মনে হতো কেমন করে সেখানে ক’জন মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা কাজ করে যাচ্ছে – আমি তো পাঁচ মিনিট দাঁড়াতে পারছিনা। জাহাজের পুরো নীচতলায় মুরগী রান্নার মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যেতো। সে গন্ধে মাঝে মাঝে মনে হতো, পুরে জাহাজটি বোধ হয় একটি রান্না করা মুরগীর পেটের মধ্যে সেঁদিয়ে গেছে।নীচতলায় জাহাজের ঢেউগুলোকে আরো বড়, আরো তীব্র মনে হতো। সেদিকে তাকাতে তাকাতে সিঁড়ি বেয়ে দো’তলায় উঠে যেতাম।

রাতের তৃতীয় প্রহরে দূর থেকে চাঁদপুরের আলো দেখা যেতো। সারা জাহাজে একটা সাড়া পড়ে যেতো। বাঁধা-ছাঁদা শুরু হয়ে যেতো যাঁরা নামবেন তাদের। জাহাজ তার ভোঁ বাজানো শুরু করতো এবং নদীতে জায়গা করে নিতো নৌকো আর লঞ্চের ভিড়ে। অনেকেই ঘুম চোখে এসে দাঁড়াতেন রেলিং এর পাশে – ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে চাইতেন সবকিছু।

এক সময় জাহাজ এসে ভিড়তো চাঁদপুরে। চারদিকে চেঁচামেচি, হৈ চৈ, হাঁকডাক। খালাসীদের চিৎকার শোনা যেতো জাহাজ ভিড়ানোর কালে, গালাগালিও চলতো প্রায়শ:ই। জাহাজ ভোঁ বাজাতো অনবরত, গোঁ গোঁ করতে করতে ভিড়তে চেষ্টা করতো ঘাটে। দুড়দাড় করে কুলিরা উঠে আসতো জাহাজে, ধরতো মালামাল, তারপর সেই বিখ্যাত দর কষাকষি। দো’তলার রেলিং এ ভর দিয়ে দেখতাম ফল, মাছ আর পারাপারের নৌকো এসে লাগছে জাহাজের গায়ে।মাঝে মাঝে ইলিশের নৌকো এসে ভিড়তো – সদ্য ধরা রুপোলী ইলিশের ছটায় উজ্জ্বল হয়ে উঠতো চারদিক।

চারদিক দেখতে দেখতে ভাবতাম, চাঁদপুর ছাড়ালেই দীর্ঘ মেঘনা পাড়ি। ঘড়ির দিকে তাকাতাম। ভোর হতে বেশ বাকী আছে -বরিশাল পৌঁছুতেও। এ সব ভাবতে ভাবতে পা বাড়াতাম দরজা পেরিয়ে সেলুনের ভেতরে।বাকী রাতটা একটু চোখ বন্ধ করা যাক।

লেখক:ভূতপূর্ব পরিচালক

মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং 

দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী

নিউইয়র্কযুক্তরাষ্ট্র

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box