আকাশে হেলান দিয়ে ঘুমায় মন্ট রয়্যাল

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মাসুদুল হাসান রনি

(মন্ট্রিয়েল থেকে): মন্ট্রিয়েল ভ্রমনে যারা আসেন তাদের প্রথম পছন্দ থাকে মন্ট রয়্যাল ঘুরে দেখা। মন্ট রয়্যাল মুলতঃ পাহাড়। যার ওপর থেকে একনজরে দেখা যায় পুরো মন্ট্রিয়েল ডাউন টাউন । ২০১৮ সালের জুলাই মাসের কোন এক বিকেলে সুমনভাইয়ের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে মন্ট রয়্যালের প্রকৃতি ও নৈসর্গিক সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে যাই। আহা কি নয়নাভিরাম সবুজ ঘাসে মোড়ানো চারপাশ! এই সবুজের টানে কতশতবার যে মন্ট রয়্যালে গিয়েছি তার হিসেব মেলানো কঠিন। গ্রীষ্ম ও শীতে মন্ট রয়্যাল দুই রকমের সৌন্দর্য ধারণ করে। গ্রীষ্মে মন্ট রয়্যালের সবুজে থই থই করে রোদ।সেই রোদ গায়ে মেখে শিশু কিশোরদের হুটোপুটি, ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে বসে রৌদ্রস্নানের আনন্দই অন্যরকম। অপূর্ব সেই দৃশ্য ।

গ্রীষ্মের পুরো সময়জুড়ে সকাল থেকে গভীর রাত অবধি নানান বয়েসী মানুষের আনাগোনা ও ছুটির দিনগুলোতে নানান রকম আয়োজনে উৎসবমুখর থাকে মন্ট রয়্যাল ।আবার শীতকালে মন্ট রয়্যালের চিত্র বিপরীত। বরফে ঢেকে যায় মন্ট রয়্যালের সবুজ প্রান্তর। দূর হতে মনে হবে, পত্র পল্লব শুন্য বৃক্ষরাজি যেন শ্বেতশুভ্র পাহাড়কে পাহারা দিচ্ছে!

ডিসেম্বর হতে মার্চ এই ক’মাস বরফ ডিঙিয়ে পাহাড়ের ওপর ওঠা কঠিন। শীতের এই সময় সহজে ওমুখো হই না। কিন্তু ২০২০ সালের মার্চে যেতে হয়েছিল শর্মী আপাকে নিয়ে। তিনি করোনা মহামারীর প্রারম্ভে অফিসিয়াল কাজে ভ্যাংকুয়েভার হতে এসেছিলেন মন্ট্রিয়েল। খুব কঠিন ছিলো গাড়ি পার্কিং থেকে পাহাড়ের উঁচুতে ওঠা। ব্লাক আইসের ওপর হাঁটতে গিয়ে একটু অসর্তক হলেই পড়ে গিয়ে হাত পা ভাঙ্গার সমূহ সম্ভাবনা ছিলো। তাই শর্মী আপা, আমি ও মোশতাকভাই খুব সর্তকতার সঙ্গে পা ফেলে ফেলে উপরে উঠি।প্রচন্ড ঠান্ডা ও ঝিরিঝিরি তুষারপাতের মাঝে ঘন্টাখানেক সময় কাটিয়ে ঢালু বেয়ে নেমে আসার সময় ভয়ে আমাদের সবারই গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। বেশ ক’বারই পা পিছলে পড়ে যাবার উপক্রম হয়েছিলো। পড়তে পড়তে কিভাবে যেন নিজেকে সামলে নিয়েছি, সেই কথা মনে হলে এখনো গা কাঁটা দেয়।উফ সেই কি ভয়াবহ অভিজ্ঞতা!

শীত-গ্রীস্ম সব সময় মন্ট রয়্যাল দর্শনার্থীদের জন্য আকর্ষণীয়। মন্ট্রিয়েল শহরের পশ্চিমে ৭৬৪ ফুট উচ্চতার মন্ট রয়্যাল সগর্বে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।এটি মুলতঃ শিলা পাহাড় বা ছোট পর্বত। মন্ট্রিয়েল নামের উৎপত্তির জন্য সমাধিক পরিচিত। মন্ট রয়্যাল থেকে জ্যাক কার্টিয়ার মন্ট্রিয়েলের নামকরণ করেছিলেন। তিনি প্রথম ইউরোপীয় যিনি পর্বতটি পরিমাপ করেছিলেন।

১৯৭৬ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের সাইক্লিং ইভেন্টটি মন্ট রয়্যালে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো।মন্ট রয়্যাল পাহাড়কে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে পার্ক।এই পার্ক মন্ট্রিয়েলের বৃহত্তম গ্রিনস্পেসগুলির মধ্যে একটি। ১৮৭৬ সালে ফ্রেডরিক ল ওলমস্টেড পার্কটির ডিজাইন করেছিলেন।

পার্কের মধ্যে রয়েছে বেভার লেক। আছে একটি স্নো টিউব এবং টোবোগান রান, ক্রস-কান্ট্রি স্কিইং ট্রেইলস, একটি ভাস্কর্য বাগান। পাহাড়ের পাদদেশে ফেডারেল কানাডার জনক জর্জ-এটিয়েন কারটিয়ারের স্মৃতিস্তম্ভ আছে। গ্রীস্মকালে স্মৃতিস্তম্ভের পাদদেশে প্রতি রবিবার অনুষ্ঠিত হয় ট্যাম-ট্যাম উৎসব। আফ্রিকান – ক্যারিবিয়ানদের ঐতিহ্যবাহি বাদ্য বাজনায় শত শত তরুন তরুণীর উদ্দাম নৃত্য ও সঙ্গীতে মুখরিত থাকে।

এ পাহাড়েই আছে মন্ট্রিয়েলের সবচেয়ে বড় সিমেট্রি।শুধু প্রকৃতি ও নৈসর্গিক সৌন্দর্যের জন্য দর্শনার্থীরা মন্ট রয়্যাল ঘুরতে আসেন তা কিন্ত নয়। যারা স্কী করতে ভালবাসেন মন্ট রয়্যাল হচ্ছে তাদের কাছে খুবই প্রিয়। এমন কি হাইকিং বা ট্রেইলের জন্য মন্ট রয়্যাল আকর্ষণীয় ।প্রায় মধ্যরাতে যখন মন্ট রয়্যালের পাশ দিয়ে বাড়ি ফিরি তখন দেখি সারাদিনের মুখর মন্ট রয়্যাল শান্ত নিরিবিলি, আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছে যেন!

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box