আকাশ তুমি ভরিয়ে দিও গানে গানে

উল্লাস চট্টোপাধ্যায়

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

পাইনের চুল থেকে টুপটুপ করে ঝরে পড়ছে আলোর ফোঁটা।আমি এবার একটি কবিতার ভিতর ঢুকে পড়ছি ধীরে।কবিতার নাম- লামাহাটা।ভিতরে গিয়ে ইষৎ বক্র বা ঘোরানো পথ দিয়ে পৌঁছে গেলাম একেবারে ক্লাইম্যাক্স পয়েন্টে।নীল উদার আকাশের নিচে শুয়ে আছি ।পাইনের ছায়া হয়েছে সামিয়ানা।এখানে কথা বলা যায় না।বলতে নেই।পারবেন না।অনেকক্ষণ শুয়ে আছি নিস্পন্দ না,তবে নীরব হয়ে।এখানে শুধু recollection in tranquility ।

মনে পড়ল হঠাৎ কৃষ্ণা এক যুবতীর কথা।আমার কলেজের সহপাঠিনী।প্রথম যে কবিতা লিখেছিলাম তার নাম মনে আছে ,কবিতাটি হারিয়েছে।এই মেয়েটিকে নিবেদন করে লিখেছিলাম… ইউক্যলিপটাসের গন্ধ।নিবেদিতা কোচবিহারের মেয়ে।মামার বাড়ি বাগবাজারে।10 বি হরলাল মিত্র স্ট্রীট ,বাগবাজার ,কলকাতা 10।এখান থেকে কলেজে আসতো।গ্রামের ছেলে, গাঁইয়া নামে অভিষিক্ত আমি স্কটিশ চার্চ কলেজে ইংরেজিতে ভর্তি হবার পর আমাকে রক্ষা করার দায়িত্ব যে নিজের হাতে স্বেচ্ছায় নিয়েছিলো সে এই নিবেদিতা গুহ ।প্রথার কৃপন মাপে সুন্দরী যে জন কখনো সে তা ছিলো না।তাঁর সৌন্দর্য মানবিকতায় ও প্রেমে।এক একজন মেয়ে আছে যার মধ্যে বাৎসল্যভাব inbuilt হয়ে থাকে।নিবেদিতা তেমনি একজন স্নেহশীলা নারী।রোজ কলেজ থেকে হাঁটতে হাঁটতে হাতিবাগান ধরে বাগবাজারের টু বি বাস স্ট্যান্ডের কাছে তার মামা বাড়ির দরজা পর্যন্ত যেতাম।মনে পড়ে মাঝে মাঝে চলে যাবার আগে ব্যাগ থেকে একটা কাগজের ঠোঙা বার করে হাতে গুঁজে দিয়ে বলতো রাত্রে রুটির সঙ্গে যেন খাই।সে জানতো আমি যে মেস বাড়িতে থাকতাম সেই প্যারামাউন্ট বোর্ডিং হাউসে বেশির ভাগ দিন কুমড়োর ঘ্যাঁট দিতো খেতে রাতে।
কলেজ যখন শেষ হলো দেখা গেল আমরা তিনজন ছেলে আর চার জন মেয়ে কেবল অনার্স পেয়েছি।নিবেদিতা সেই চারজনের মধ্যে ছিলো না।তাই এম এ পড়ার সময় তার সঙ্গে আর দেখা হবে না নিশ্চিত হয়ে গেলো।
তখন মোবাইল ছিলো না।তাই যোগাযোগ প্রায় বন্ধ।মাঝে একদিন ইউনিভারসিটিতে এসে খুঁজে দেখা করলো।নিয়ে গেল রবীন্দ্রসদনের সিঁড়িতে। জানলাম মামার বাড়িতে থাকতে সমস্যা হচ্ছে।সে চাকরি করছে এক্সাইডের কাছে ইউনিপ্যাক মুভার্স নামে একটি বেসরকারী সংস্থায়।আছে হাজরার মোড়ে একটি লেডিস হোষ্টেলে।তারপর মাঝে মধ্যে দেখা হতো হাজরার কাছে ।
একদিন বললো সে বিয়ে করছে।আমি একটু অবাক হলাম ।হঠৎ বিয়ের সিদ্ধান্ত।চুপ চাপ দুজনেই।আমাকে অবাক করে দিয়ে বললো আর অপেক্ষা করবো না।মনে হয়েছিলো তুই প্রোপোজ করবি একদিন।কিন্ত করলি না।আমি তো অবাক।কোনদিন ভাবি নি এমন কথা ।কিছুক্ষণ পরে উঠে চলে গেলো ।আর কোনদিন দেখা হয় নি।এখন এই সুদূরে কেন তার কথা মনে হল? কেন? Recollection in tranquility

কিছু পর্যটক পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে।আমি ঘাসের উপর শুয়ে চুপ করে।মনে পড়ে গেল বাবা যেদিন চিরতরে আকস্মিক ভাবে চলে গেলেন আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি।তখন মৃত্যুর অভিঘাত সম্বন্ধে কোন জ্ঞান ছিলো না।স্পষ্ট মনে আছে পকেট ভর্তি লাট্টু নিয়ে আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম,শুনছিলাম ।তার আগের দিন আমাদের ডেকে বাবা জড়ানো গলায় বলেছিল ” আমরা ও বাংলা থেকে আসা উদ্বাস্তু।আমি কিছু রেখে যেতে পারি নি।লেখাপড়াটা করিস মন দিয়ে ওটাই তোদের ক্যপিটাল।”মামার বাড়িতে শুরু হলো বড় হওয়া।তারপর থেকে কোনদিন ভুলিনি যে লেখাপড়া করতে হবে… বাবার ইচ্ছা।বড় হতে হবে।যখন নিবেদিতা বলেছিলো অভিযোগের মৃদু নম্র কন্ঠ তখন আমি এম এ শেষ বছর।আমি অসহায়। আজ বাবার ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছে।কিন্ত নিবেদিতা হারিয়ে গেল।অনেক চেষ্টা করেছি ।সন্ধান পাই নি তার।এই নির্জন শতশত পাইন গাছে ভরা দুপুরে স্মৃতিতে এলো যখন সেই কৃষ্ণা মমতাময়ী নারী তখন অনুভবে আসছে বেদনার বীণা বেজে চলেছে অন্তরে মম।Recollection in tranquility.।

মাঝে মধ্যে এমন পরিবেশ খুব প্রয়োজন সবার যেখানে নিজেকে খুঁজতে খুঁজতে হারানো দিনের হারানো সুরে নিজেকে purged করে হালকা হতে পারা যায়।
Recollection in tranquility থেমে গেল।এক নেপালী যুবক আমাকে তার বাচ্ছাদের সঙ্গে ছবি তুলে দিতে বললেন।তারা চলে গেল।সুর কেটে গেলে আর চেষ্টা করে সুর তোলা যায় না।এ যে হতাশার অন্ধকার থেকে উৎসারিত আলোর মত বেদনভরা মায়ারঙমাখা স্মৃতি সুধার স্বাদ।

শুরুতে বলেছিলাম লামাহাটা শীর্ষক কবিতার ভিতরে ঢুকে পড়েছি। পাইনের ছিটিয়ে দেওয়া আলো আমার শরীরে মনে।এই কবিতার কবিকে বললাম ফিসফিস করে আকাশ আমায় ভরলো আলোয়।কবি বললেন ততোধিক মৃদুস্বরে আকাশ তুমি ভরিয়ে দিও গানে গানে।

বেরিয়ে আসার আগে আর একবার ফিরে দেখা।
কবির নাম তো বলা হয় নি। লামাহাটানামের কবিতার কবির নাম প্রকৃতি।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে