আকাশ প্রদীপ…

শিলা চৌধুরী

(ক্যালিম্পং থেকে): আমাদের বড় বাড়িতে সকাল বেলা ঘুম ভাঙ্গে হরে কৃষ্ণ হরে রাম এর সঙ্গে কাসরের ধ্বনিতে। ছোটবেলা সেটা শুনতে শুনতে আমাদের অভ্যাস হয়ে গিয়েছে ।বড় উঠানে প্রথমে আশুতোষ দাদার বাবা,তারপর নির্মল দাদার বাবা। উনাদের মৃত্যু পরবর্তী সময়ে ফনী দাদা ,নির্মল দাদা, বরেন্দ্র জেঠু, রঞ্জ দাদা থেকে শুরু করে কেউ না কেউ পালা করে রোজ সকালে কীর্তন দেন।কোনদিন সেটার বিরতি দেখিনি ।বাংলা বর্ষপঞ্জী মোতাবেক এখন কার্তিক মাস।শরৎ শেষে হেমন্তের জলবিষুব সংক্রান্তির শুরু।কুয়াশা এবং আকাশ প্রদীপের সময়। শহর জীবনে আকাশপ্রদীপ এখনও দেখা যায় কিনা জানি না তবে গ্রাম ও মফস্বল শহরে আশ্বিনের শেষদিন থেকে কার্তিকের শেষতম দিন পর্যন্ত গোটা হেমন্ত জুড়ে বেশ কিছু বাড়ীর ছাদে এখনও আকাশপ্রদীপ জ্বলে। অনেক দেশের মানুষ মনে করে বছরের এই সময়ে জীবিত আর মৃতের মধ্যে দূরত্ব কমে আসে।বিদেহী আত্মারা জীবিত স্বজনের কাছে ফিরে আসে ।আকাশপ্রদীপ ওই বিদেহী আত্মাদের আলোর কাঠি ,তার আলোতেই ওই আত্মারা স্বর্গে ফেরেন। তাই কার্তিক মাস এলেই দেখতাম বরেন্দ্র জেঠু, কেশব দাদা , মাখন দাদা নন্দ পিসিদের বাড়ির বাঁশ ঝাড় থেকে সবচেয়ে লম্বা বাঁশ কেটে খুব ভালো করে পরিস্কার করে সেই বাঁশের উপরের দিকে একটা ঢোলের মতো ফ্রেম কাপড় দিয়ে বানাতো। সন্ধ্যা হবার সঙ্গে সঙ্গেই মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে সেই ঢোলাকৃতির ফ্রেমের ভেতর বসিয়ে সূতো দিয়ে টেনে টেনে সেটাকে বাঁশের উপরে বেঁধে রাখতেন । আমাদের বাড়িতে আলাদা প্রতি বংশের ঘরেই এই আকাশ প্রদীপ পূর্ব পুরুষদের আত্মার উদ্দেশ্যে পুরো কার্তিক মাস জুড়েই জ্বালানো হয় । সেই সঙ্গে আরেকটা জিনিস করে, পুরো কার্তিক মাস জুড়ে সবাই মিলে খুব সকালে নগর কীর্তন করে দল বেঁধে । আকাশপ্রদীপ আসলে দেহের প্রতীক। শাস্ত্র মতে ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম- পঞ্চভূতে যেমন তৈরী হয়েছে নশ্বর শরীর, প্রদীপও তৈরী হয় তেমনি ভাবেই।ক্ষিতি বা মাটি তার কায়া তৈরী করে। অপ বা জলে তা আকার পায়। তেজ বা আগুন আত্মার মতোই স্থিত হয় তার অন্তরে। মরুৎ বা হাওয়া সেই আগুনকে জ্বলতে সাহায্য করে। আর ব্যোম বা অনন্ত শূন্য জেগে থাকে তার গর্ভে। প্রচলিত বিশ্বাস, এক মানুষ সমান লাঠির ডগায় কাপড় বা কাঁচের ঘেরাটোপে রাখা মাটির প্রদীপ অথবা অধুনা বৈদ্যুতিন বাল্বের আলোকসংকেত ধরে স্বর্গত পিতৃপুরুষ নেমে আসেন পৃথিবীতে,উত্তরপুরুষকে আশীষ দিতে। বিশ্বাসের যুক্তিগত মূল্য অবশ্যই শূন্য। মৃত্যুর পরেও কেউ কাউকে মনে রেখে আকাশপ্রদীপ জ্বালালে সেটা মন্দ হয় না ।তবুও তো স্মৃতির স্মরণ কোন প্রিয়জনের। কুয়াশা গভীর হেমন্ত রাতে আকাশ প্রদীপের নীল আলোক বিন্দুটাকে দেখায় ঠিক মানুষের মতন। নিঃসঙ্গ। একা। হেমন্ত পেরিয়ে শীত আসে নীলাভ ওই আলোকসংকেত ধরে..। আজও ফ্রক পরা সেই ছোট্ট মেয়েটার চোখ পেরিয়ে দিগন্তজোড়া আকাশরাত্রি ,শরীরে তার কার্তিকের আদর…সে জানে তারাহীন নিশিদিন হেমন্ত রাতেই তো ফুটবে নীল ফুল…বাইরে তখন শিশির.আদর শরীর বা শুধুই ঝরা পাতা…।শেষ রাতে আজও সেই কার্তিকের ঘ্রাণ মনে করায় তার অকাল জাগরণ ।

সহ লেখক : রাজদীপ বিশ্বাস রুদ্র

ছবি: গুগল