আকাশ বাতাসে ধ্বনিত হলো নেতাজী মন্ত্র

কাকলী পৈত

(দিল্লী থেকে) : ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য যেসব বিপ্লবীরা আত্মাহুতি দিয়েছেন, তারা সকলেই আমাদের প্রনম্য, কিন্তু তিনি বোধ হয় প্রনম্যদেরও প্রনম্য। বিপ্লবীদের কর্মসাধনার ধারক ও বাহক তিনি। বিপ্লবের প্রতীক তিনি।জন্মজন্মান্তরের বিপ্লবী সুভাষচন্দ্র বসু।ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রনী সৈনিক তো তিনি ছিলেনই, স্বাধীনতা পরবর্তী ভারত-পাক রনক্ষেত্রে ও নেতাজী জিন্দাবাদ।তার বিপ্লবের মন্ত্র প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে যুগে যুগে বিপ্লবকামী মানুষের মনকে প্রভাবিত করেছে।১৯৪৭ সালে নেতাজীর স্বপ্নের অখন্ড ভারতের বিভক্তির পর প্রথম ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধ শুরু হয় ১৯৬৫ সালের এপ্রিল মাসে।তার সমাপ্তি ঘটে ২৩শে সেপ্টেম্বরের মধ্যে।সেসময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন লাল বাহাদুর শাস্ত্রীও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন যশোবন্ত রাও চ্যবন,যিনি তার ডায়েরীতে এই যুদ্ধের যথাযথ বর্ননা লিখে রেখে গেছেন।পাকিস্তানের

রাশিয়ার তাসখন্দে

তরফে এই যুদ্ধের নাম দেওয়া হয়েছিলো ‘ অপারেশন জিব্রাল্টার’ । যার উদ্দেশ্য ছিলো জম্মু-কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদী পাঠিয়ে অস্থিতা সৃষ্টি করা যার রেশ আজও চলেছে নানা অজুহাতে নানা রূপে। সে সময় গোয়েন্দাবিভাগের সময়োচিত রিপোর্টিং এর অভাবে পাক-সশস্ত্র সেনা ভারতীয় সীমার মধ্যে ঢুকে পড়েছিলো।সেই যুদ্ধে পাকিস্তানের বিশাল হার হয়েছিলো।তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও রাষ্ট্রসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি সংস্থাপিত হয়।তৎকালীন ভারতের সামরিক অফিসাররা এই যুদ্ধবিরতিতে কখনোই রাজী ছিলেন না।পাকিস্তানকে তারা দৃস্টান্তমূলক শাস্তি দিতে চেয়েছিলেন।কিন্তু আন্তর্জাতিক স্তরে কূটনৈতিক চাপে তা আর হয়ে ওঠেনি।যুদ্ধবিরতি ঘোষনার পর প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর ও হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু ঘটে।
যুদ্ধবিরতি ঘোষনার পর ভারতের পশ্চিম সীমান্তে রেডক্লিফ লাইন বরাবর ভারত পাক উভয় দেশের সেনাদের ফিরে যাবার আদেশ জারি করা হয়।এই আদেশ কার্যকর করার জন্য ভারতের তরফে কর্নেল হরগোবিন্দ সিং ও পাকিস্তানের তরফে ব্রিগেডিয়ার আনোয়ার হোসেন কে নিয়োগ করা হয়।৬৫ সালের ২৩ শে সেপ্টেম্বরের পর দুই সামরিক অফিসার তাদের ‘রিট্রিট’ তথা ফেয়ার ওয়েল মিটিং এর দিন ধার্য করেন।সেই অনুসারে এক এক কোম্পানি ভারতীয় ও পাক সেনা LOC border এ এসে হাজির হয়েছে।মিটিং এর জন্য এক অস্থায়ী তাঁবু লাগানো হয়েছে। একটি ফোল্ডিং টেবিল আর খানকয়েক চেয়ার রাখা আছে। সকলেরই বাক্স প্যাটরা বাঁধা হয়ে গেছে। যার যার দেশে ফিরে যাবার জন্য সকলেই তৈরী।এবার বিদায় নেবার পালা।সময় দ্বিপ্রহর। ভারতীয় বাহিনীর তরফে কর্নেল হরগোবিন্দ সিং সশস্ত্র রক্ষী বাহিনী নিয়ে তাঁবুর ভিতরে প্রবেশ করলেন।তাদের একজনের হাতে একটি ফাইল।
তার ঠিক পরেই পাকিস্তানের তরফে প্রবেশ করলেন সশস্ত্র দেহরক্ষীসহ আনোয়ার হোসেন।দু’জনেই দু’জনের দিকে তাকিয়ে একেবারে হতবাক।দুজনেই ভাবছেন এ কি স্বপ্ন!!!!তারপর দু’জনে দু’জনের বুকের নেমপ্লেটের দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হলেন। আনোয়ারই প্রথম বলে উঠলেন ‘ আরে হরগোবিন্দ দোস্ত তুম ইধার!!!!হরগোবিন্দ ও উত্তরে বলে উঠলেন -—’আরে আনোয়ার ভাই,আমি ও তো তাই ভাবছি, এটা কি করে সম্ভব হলো?’
আসলে আনোয়ার হোসেন আর হরগোবিন্দ সিং উভয়েই নেতাজীর আজাদ হিন্দ বাহিনীর বিশ্বস্ত সৈনিক ছিলেন।দু’জনেই নেতাজির সঙ্গে জার্মানি থেকে দক্ষিন পূর্ব এশিয়ার রেঙ্গুন হয়ে পূর্বভারতের ইম্ফলের মৈবাং পর্যন্ত এসে স্বাধীন ভারতের তেরঙ্গা পতাকা গ্রথিত করেছিলেন।নেতাজীর স্বপ্নিল ছত্রছায়ায় তাদের বিপ্লবের সেই ভয়ংকর দুর্গম পথ চলায় তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলো কেটেছে।তারা দু’জনেই বাকরুদ্ধ হয়ে একটা ঘোরের মধ্যে কাটালেন কিছুটা মুহূর্ত।

স্বাধীনতার পরও ভারতে এসেছিলেন নেতাজি!

উভয়ের চোখে আনন্দাশ্রু, উভয়ে আলিঙ্গনাবদ্ধ হলেন।দুই বন্ধুর পেছনে দুই সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যদল অপলকে এই দৃশ্য দেখছে।পৃথিবীর আর কোন রনক্ষেত্রে এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটেছে কিনা সন্দেহ। এই অঘটন সম্ভব হয়েছে শুধু নেতাজীর জন্য। তিনি তো সাধারন মানুষ নন।অনেকক্ষণ পর তারা সম্বিত ফিরে পেলেন। নেতাজীর সান্নিধ্যে একের পর এক স্মৃতি তাদের মনকে তোলপাড় করতে লাগলো।৪৭ সালের দেশভাগের পর আনোয়ার পাক সেনাবাহিনীতে আর হরগোবিন্দ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। দু’জনের দেশভক্তি সন্দেহাতীত।দুইবন্ধু সারাদিন নেতাজিকে নিয়ে তাদের স্মৃতিচারনায় কাটালেন। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। এবার ঘরে ফেরার পালা। নেতাজির মন্ত্রে দীক্ষিত দুই বন্ধুই জানেন ‘ডিউটি ইস ডিউটি’ সেখানে ভাবালুতার কোন স্থান নেই।ফেয়ার ওয়েল মিটিং শেষ।সই শিলমোহর সব শেষ। দুই সেনাধ্যক্ষ, দুই সেনাদলকে রিট্রিটের আগে অ্যাটেনশন হবার জন্য আদেশ দিলেন। দু’জন দু’জনকে সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানালেন।হঠাৎ হরগোবিন্দের ইশারায় উভয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাড়ালেন। হরগোবিন্দ বললেন, ‘ দোস্ত আমার একটি অনুরোধ আছে রাখবে?’—’আরে দোস্ত এত ইতস্তত করছ কেনো? সহাস্য জবাব আনোয়ারের। ভরসা পেয়ে হরগোবিন্দ বললেন,’তাহলে চলো, আমরা আমাদের সেই স্লোগান দেই যা নেতাজী আমাদের শিখিয়েছিলেন, প্রাণ ভরে দু’জনে একসঙ্গে চেঁচিয়ে বলি’।আনোয়ার  জবাব দিলেন, ‘আজ আর তা হয়না দোস্ত।আজাদ হিন্দ ফৌজে যখন আমরা ছিলাম, লালকেল্লায় তেরঙ্গা ওড়াতে দিল্লি অভিমুখে মার্চ করেছিলাম।সেসময় আমাদের স্লোগান ছিলো জয় হিন্দ। আজ সময় পাল্টেছে।আমি এখন পাকিস্তানি, এই স্লোগান আমি দিতে পারিনা। তাহলে যে আমার দেশের সঙ্গে বেইমানি করা হবে। আর নেতাজি আমাদের এ শিক্ষা দেননি’।
হরগোবিন্দের কপালে চিন্তার ভাঁজ-—তাহলে কি করা যায়!!! একটা কিছু উপায় তো বের করতে হবে। আনোয়ারের মুখে প্রত্যয়ে মধুর হাসি। হঠাৎ তিনি ইউরেকা, ইউরেকা, পেয়েছি, পেয়েছি বলে চীৎকার করে উঠলেন।নেতাজীই মনে করিয়ে দিয়েছেন সে কথা।হরগোহিন্দ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন—’কি সেটা?।—’আরে দোস্ত, শুধু একটি প্ল্যাটফর্ম আছে যেখানে দাড়িয়ে আমরা ভারত পাকিস্তান সমস্বরে স্লোগান দিতে পারি, তা হলো নেতাজী জিন্দাবাদ।আনোয়ারের মুখের কথা শেষ হতে না হতেই হরগোবিন্দ আলিঙ্গনাবদ্ধ করলেন আনোয়ারকে।আনন্দে বলে উঠলেন ‘ আরে, এই না হলে দোস্ত, তোমার পা ছুঁতে ইচ্ছে হচ্ছে দোস্ত, চলো, তবে আর দেরী কিসের ? এরপর দুই সেনাধাক্ষ্য নিজ নিজ সেনাদলকে আদেশ দিলেন তোপধ্বনি করে ‘গার্ড অফ অনার’ দেবার জন্য প্রস্তুত হতে।নিজেরা প্রাণভরে উচ্চস্বরে স্লোগান দিতে থাকলেন নেতাজী জিন্দাবাদ। আর সেই সঙ্গে তোপধ্বনি হতে থাকলো। আকাশ বাতাসে ধ্বনিত হতে থাকলো নেতাজী মন্ত্র আর ভারতের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত হয়ে উঠলো নেতাজীময়।

ছবি: গুগল