আগুনমুখার মেয়ে নূরজাহান বোস

পূরবী বসু

আজ ৮-ই মার্চ। বিশ্ব নারী দিবস। আর এক সপ্তাহ পরে বাংলাদেশের মেয়ে – বাংলাদেশের বউ, আগুনমুখার কন্যা নূরজাহান বোসের আশিতম জন্মদিন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আজ বিশ্ব নারী দিবসে তাঁর সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগতভাবে জানা দু’একটা কথা শোনাবো আপনাদের।

নূরজাহান বোস ও স্বদেশ বোসের অনেক অলীক গল্প রূপকথার কাহিনীর মতো টুকরো টুকরো অংশে আমাদের কানে ভেসে আসতো। আমরা তখন স্কুলে পড়ি। অসামান্য মেধাবী ছাত্র, বাম রাজনীতির ঘোর সমর্থক ও ছাত্রনেতা স্বদেশ বোসের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সুহৃদ এমাদউল্লাহ্‌-র স্ত্রী দেখতে ছোটখাটো পুতুলের মতো সুন্দর নূরজাহান। একটি সময় গেছে যখন একই সঙ্গে কঠিন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনসহ কারারুদ্ধ ছিলেন দুই বন্ধু বাম রাজনীতি করার অপরাধে। অতঃপর অসময়ে বন্ধুর মৃত্যুতে বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের এক বিচ্ছিন্ন ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়ে নূরজাহান ও পারিবারিক সুহৃদ স্বদেশ সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, ধর্মের পার্থক্যকে অগ্রাহ্য করে সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন পাকিস্তান আমলে বিয়ে করে বসেন। আমি তখনো তাঁদের “চোখে দেখিনি, শুধু বাঁশি শুনেছি।“

তাঁদের সঙ্গে স্বচক্ষে প্রথম দেখা হলো মধ্য আশির এক গ্রীষ্মে ওয়াশিংটনে। ঘটা করে উদযাপিত হচ্ছিল সেখানে নজরুল সম্মেলন। নজরুলের ওপর লেখা পড়তে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম জ্যোতি-আমি উভয়েই। অনুষ্ঠান শেষে রূপকথার স্বদেশ-নূরজাহান বোসের সঙ্গে প্রথম সামনাসামনি আলাপ হয়, যাঁদের কথা বহু বছর ধরে শুনে আসছি। পরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁরা আমাদের দাদা-বৌদি হয়ে যান। আর সেই ক্ষণিক যোগাযোগ পরবর্তীকালে আরো অনেক ঘনিষ্ঠ হয়। নিউ ইয়র্ক-এ থাকতাম তখন আমরা। সুযোগ পেলেই পাঁচ ঘন্টা ড্রাইভ করে চলে যেতাম দাদা-বৌদির বেথেসডার বাড়িতে। দু’টো দিন একটানা আড্ডা, খাওয়াদাওয়া, বেড়ানোতে কাটতো। বৌদির বড় কন্যা আইনজীবী মনিকার ততদিনে বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট মেয়ে অনিতা নিউ ইয়র্ক-এ ফাইনান্সিয়াল জগতে কাজ করে। এক কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট সে। আমেরিকান বর নিয়েও মনিকা ঘরসংসার, কাজ সেরেও কন্যা তূলিকে শুদ্ধ বাংলা শেখাতে পুরোপুরি নিষ্ঠাশীল ও নিবেদিত-প্রাণ। মনিকা নিজে ছবি আঁকে অবসর সময়ে। বৌদির জ্যৈষ্ঠ সন্তান জসীম কিছুদিনের মধ্যেই এশিয়াটিক ব্যাঙ্কের কান্ট্রি প্রতিনিধি হয়ে ব্যাঙ্কক না ফিলিপিনসে চলে যায়।

আমরা যে বেড়াতে যেতাম, তা শুধু তাঁদের বেথেসডার বাড়িতে নয়। পরে তাঁরা যখন সেভি চেজে বাড়ি বদলালেন, সেখানেও গেছি কয়েকবার। কখনো কখনো আমাদের সঙ্গে যেতেন বজলু ভাই (সংবাদ সম্পাদক বজলুর রহমান) যখন তিনি মাঝে মাঝে আমাদের আমেরিকার বাড়িতে বেড়াতে আসতেন। বজলু ভাই- মতিয়া আপার সঙ্গে দাদা বৌদির সখ্য বহুদিনের।

দাদা-বৌদি যখন ঢাকা ফিরে গেলেন,আমিও তখন এক দশক ঢাকায় ছিলাম। চাকরী করতাম পূর্ণকালীন। ছিলাম দাদা-বৌদির স্নেহের ছায়ায়। কী জানি কেন শুধু বৌদি নন, দাদাও অত্যন্ত স্নেহ করতেন আমাকে। বাসায় কিছুদিন না গেলেই ডেকে পাঠাতেন।মনে আছে একবার আমার হাঁটুতে প্রচন্ড ব্যথার কথা শুনে তিনি তাঁর নিজের হাঁটুর মোজা আমাকে দিয়ে দিয়েছিলেন। কী অদ্ভুত ও নাটকীয় যোগাযোগ আমাদের! । দাদার ও আমার দুজনের পারিবারিক নাম-ই শুধু এক নয়, আমাদের দুজনের-ই ধরা পড়লো এক-ই কঠিন অসুখ, পারকিন্সন্স ডিজিজ, বছর দুয়েকের ব্যবধানেই। আময়া জানতাম এই অসুখে আরোগ্যলাভ সম্ভব নয়। তবে আমারটি ধরা পরেছিল প্রাথমিক পর্যায়ে – আর দাদার অসুখটা যখন ধরা পড়ে, অনেকটাই পরিণত হয়ে এসেছিল রোগটা, যখন অত্যন্ত সীমিত চিকিৎসার সুযোগ অবশিষ্ট ছিল কেবল। একে একে দাদা তাঁর চলন, বলন, লেখন, সব যখন হারাতে শুরু করলেন, আমরা দেখেছি অসহায় বৌদি কীভাবে শেষ চেষ্টা করে যাচ্ছেন জন্স হপকিন্স সহ বিভিন্ন নামকরা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।।

বৌদি অর্থাৎ নূরজাহান বোসের সংগে দেশের ও দেশের বাইরে বহু উঁচুস্তরের পেশাদার লোক, আমলা, সিনিয়র মন্ত্রী, নোবেল বিজয়ী পন্ডিত থেকে শুরু করে বাসার পারিচারিকা, স্কুল-কলেজের ছাত্রী – সবরকম মানুষের সঙ্গে আত্মিক যোগাযোগ রয়েছে, এবং সমজের বিভিন্ন স্তরের লোকজনের সঙ্গে সমান স্বাচ্ছন্দে মিশতে পারেন তিনি। নিজের কাছে যা সত্য ও সঠিক এবং নিজে যা বিশ্বাস করেন, সেই অনুযায়ী দ্বিধা ও শঙ্কাহীন ভাবে তিনি নিজেকে প্রকাশ করতে বা সেই মত অনুসরণ করে চলতে কখনো দৃঢ়তার অভাব দেখান নি।। ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত সয়ে বড় হওয়া প্রতিবাদী ও তেজস্বিনী নূরজাহান বৌদি পরিণত বয়সে আমেরিকায় এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন এবং সমাজসেবামূলক কাজে, বিশেষ করে নারী কল্যাণ কর্মকান্ডে, যোগদান করেন। তার প্রতিষ্ঠিত সংস্থা “সংহতি” (ওয়াশিংটন) আজো অত্যন্ত সক্রিয়। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শুধু নিজের জন্মস্থান পটুয়াখালির বিচ্ছিন্ন দ্বীপে, সাগরপারের গহীন কাটাখালি গ্রামের উন্নয়নের কাজ-ই করেন না, বাংলদেশের মূল ভূখন্ডের কয়েকটি স্থানে যেমন রংপুরে মেয়েদের জন্য বিভিন্ন কর্মকান্ডের-ও ব্যবস্থা করেছেন। তাঁর সমাজসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ অনন্যা ও নারী, ইউএসএ সহ বহু প্রতিষ্ঠান থেকে পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। নূরজাহান বোস যে কী পরিমাণ সৃজনশীল তার প্রমাণ পাওয়া যায়, স্বামীর মৃত্যুর অব্যবহিত আগে ষাট পেরিয়ে যাওয়া নূরজাহান বোস অকপটে এবং সাহসিকতার সঙ্গে তাঁর আত্মকথা “আগুণমুখার মেয়ে” লিখে ও তা প্রকাশ করে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান। রূপকথার বড় চমক এখানেও। প্রখ্যাত সাহিত্য বিশারদ ডঃ তপন রায়চৌধুরী এই বইয়ের উচ্ছ্বশিত প্রশস্তিসহ এক দীর্ঘ আলোচনা করেন ‘দেশ’ পত্রিকায়। হু হু করে বিক্রি হতে থাকে আগুনমুখার মেয়ে। সংস্করণের পর সংস্করণ চলে। কলকাতার বিখ্যাত প্রকাশনালয় ‘আনন্দ’ প্রকাশ করে এই বইয়ের একটি সংস্করণ কলকাতা থেকে। একখানি বই লিখে নূরজাহান বোস শুধু অনন্যা পুরস্কার নয়, বাংলা একাডেমী পুরস্কার অর্জন করেও এক দুর্লভ রেকর্ড গড়েন।
মনেপ্রাণে আধুনিক, সংস্কারমুক্ত, নারীঅধিকারে মুখর, দানশীল, সমাজসেবী নূরজাহান বৌদিকে গেল বছর কয়েকদিনের জন্য অনেক বলে কয়ে আমাদের ডেনভারের বাসায় এনে রেখেছিলাম । এতো কাছে থেকে তাঁকে দেখে ও ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করে আরো পরিস্কার বুঝতে পারলাম, ছোট ছোট চুল, হাতকাটা ব্লাউজ পরিহিতা আধুনিক ও রুচিশীল সাজে সজ্জিতা নূরজাহান বৌদি এক জীবনে কতো নদী, কতো সমুদ্র পাড়ি দিয়েছেন, কতো রকম পরতের পর পরত অভিজ্ঞতা্‌ জমা করেছেন স্মৃতির ভান্ডারে, বৈচিত্র্যময় জীবনে কতো স্তরে করেছেন যাতায়াত, কতোরকম মানুষের সঙ্গে হয়েছে তাঁর পরিচয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরো পরিবার ছিল কলকাতায়। স্বদেশদা বাংলাদেশ সরকারের হয়ে প্রচুর কাজ করেন শুধু প্রবাসে বসে মুক্তিযুদ্ধের কালে নয়, স্বাধীনতার পর-ও প্ল্যানিং কমিশনের সংগে যুক্ত থেকে – দেশের অর্থনীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে, যার স্বীকৃতি দেওয়া হয় তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ সম্মাণ স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে। ওদিকে নূরজাহান বৌদি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পশ্চিম বাংলার সচেতন নারী নেত্রী ও লেখকদের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড়িয়ে শরনার্থীদের জন্য, বাংলাদেশের প্রতি বাইরের জগতের অভিমত সহানুভূতিশীল করে তোলার লক্ষ্যে সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আশা করবো বাকি দিনগুলোকে সার্থক করে তিনি তাঁর যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা ও অর্জিত পার্থিব জ্ঞানের আলোকে আরো কিছু লিখে আমাদের সাহিত্যকে, আমাদের মননকে আরো তীক্ষ্ণ ও সমৃদ্ধ করবেন।

বৌদির আশিতম জন্মদিনে তাকে শতায়ু হবার শুভকামনা জানাই।

ছবিঃ গুগল