আজও আড্ডা আছে, নেই শুধু আমি…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নিজামুল হক বিপুল

মৌলভীবাজার। হ্যাঁ, মৌলভীবাজারের কথাই বলছি। এটি আমার শহর। আমার প্রাণের শহর। ছোট্ট জেলা শহর। ছিমছাম, পরিপাটি করে সাজানো শহর। এই শহরের মতই এখানকার মানুষগুলো সামাজিক আর পারিবারিক বন্ধনে একে অন্যের খুব কাছে। বলা যেতে পারে প্রত্যেকেই আত্মার আত্মীয়। দারুণ এক মেলবন্ধন সবার মধ্যে। এই মেলবন্ধনের মধ্যেই এই শহরের আলো-বাতাস খেয়ে বড় হয়ে উঠেছি আমি। এই শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বন্ধু-বান্ধব, স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী। এই শহর ঘিরে কত শত স্মৃতি জমাট হয়ে আছে আমার মাঝে। জম্পেশ আড্ডা, ছাত্রজীবনে লুকিয়ে রূপালী পর্দায় সিনেমা দেখা, ম্যানেজার স্টলের রসগোল¬া খাওয়া, শাহ মোস্তফার মেলা, রাজপথ কাঁপানো মিছিল, সেই ছাত্র জীবন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কর্মী, অতঃপর সংবাদকর্মী হয়ে উঠা পর্যন্ত। এসব কারণে প্রাণের এই শহর জায়গা করে আছে আমার হৃদয়ে। আজীবন এই শহরই আমার মাঝে বিরাজ করবে। মনে করিয়ে দেবে আমার সোনালী অতীত…। থেমে থেমে আহ্বান জানাবে তার বুকে ফিরে যাবার।
খরস্রোতা মনু নদীর তীর ঘেষে গড়ে উঠেছে মৌলভীবাজার। শহরের প্রাণ ভোমরা হচ্ছে চৌমুহনা আর সেন্ট্রাল রোড (বর্তমানে যেটি এম সাইফুর রহমান সড়ক)। আরেক প্রাণ পশ্চিমবাজার-কুসুমবাগ। শহর জুড়েই সবুজের ছাড়াছড়ি। আছে বেরী লেক নামে পরিচিত একটি লেক। এই লেক অবশ্য সেই বৃটিশ আমলেই সৃষ্টি। এক সময় শহরের ভিতর দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছিল শহরবাসীর দুঃখ আঁকাবাঁকা মনু নদী। সেই নদীর গতিপথ সোজা করতে বৃটিশ আমলে শহরের বাহির দিক দিয়ে নদীর গতিপথ বদলে দেয়া হয়। সেই সুবাদে সৃষ্টি হয় বেরি লেক এর।

শহরের বুকে বয়ে যাওয়া মনু নদী

জেলা শহরের একেবারেই লাগোয়া উপজেলা রাজনগর। জেলা শহর থেকে মাত্র মিনিট পনেরো’র দূরত্ব। বাপ-দাদার পৈত্রিক ভিটেমাটি ওখানেই। সঙ্গত কারণেই আমার জš§ও ওখানে। কিন্তু বুঝে উঠার পর থেকেই শহর মৌলভীবাজারের সঙ্গে নাড়ির বন্ধন গড়ে উঠে। সেই বন্ধনই এই জেলা শহরকে ভীষণ ভালোবাসতে শিখিয়েছে। আশির দশকে যখন স্কুলে পড়ি তখন থেকেই সম্পর্ক গড়ে উঠে প্রিয় শহরের সঙ্গ। শহরে কখনও ঘুরতে যেতাম চাচাদের বাসায়। কখনও বা স্কুল কামাই দিয়ে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে লুকিয়ে চলে যেতাম রূপালী পর্দায় বাংলা সিনেমা দেখতে। আমাদের শহরে তখন সিনেমা হল বলতে পশ্চিম বাজার এলাকায় কুসুমবাগ, চৌমুহনা সংলগ্ন কাশিনাথ রোডের কল্পনা আর ঝরনা সিনেমা হল। এই তিনটির মধ্যে কুসুমবাগ ছিল খুবই আধূনিক আর রুচি সম্পন্ন। শহরের অভিজাত পরিবারের লোকজন বেশিরভাগই এই হলে নতুন ছবি আসলে ছুটে যেতেন পরিবার পরিজন নিয়ে। সন্ধ্যা আর রাতের শো’তে হল ভর্তি দর্শক থাকতেন। তবে নতুন এবং ভালো ছবি প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে কোনভাবেই পিছিয়ে ছিল না কল্পনা সিনেমা হলও। ভালো ছবি প্রদর্শনী নিয়ে কুসুমাগ ও কল্পনা’র মধ্যে রীতিমত প্রতিযোগিতা চলতো।

কল্পনা সিনেমাহল

যাক কুসুমবাগ হলের নামেই ওই এলাকার নাম হয়ে যায় ‘কুসুমবাগ’। কিন্তু সেই নানা স্মৃতিবিজড়িত কুসুমবাগ সিনেমা হল এখন আর নেই। বাংলা সিনেমার বাজারে দৈন্যতা আসার শুরুর দিকেই কুসুমবাগ সিনেমা হল ভেঙ্গে এখানে গড়ে তোলা হয়েছে কুসুমবাগ শপিং মল। ‘ঝরনা’ তো বন্ধ হয়ে গেছে সেই কবে। আর ‘কল্পনা’ সিনেমা হল এখনও ধুঁকে ধুঁকে চলছে…।
স্কুল জীবনের শেষ পর্যায়। ১৯৮৯-৯০ সালের দিকে দেশে তখন স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন চলছে। আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে শহরেই থাকি চাচার বাসায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শহরের চৌমুহনায় চাচাতো ভাইয়ের দেয়া হেয়ার কাটের দোকানে বসে সময় কাটাই। এটি শহরে গড়ে উঠা একেবারেই আধূনিক ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত একটি সেলুন। শহরের বেশিরভাগ বিত্তশালী এবং রুচি সম্পন্ন লোকজন ও তাদের সন্তনরা নিজেদের সৌর্ন্দয্য বর্ধণের জন্য ছুটে যেতেন তিলোত্তমা হেয়ার কাটের নরসুন্দরদের কাছে।এখানে বসার ফাঁকে ফাঁকে শহরের সেন্ট্রাল রোডের ম্যানেজার স্টল আর রতন দা’র পেপার হাউসে বসে পত্রিকা-ম্যাগাজিন পড়ে আড্ডা দেই রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গ।ে সখ্য গড়ে উঠে তৎকালীন জাসদ নেতা হক ভাই, মশিউর রহমান ভাই, জাসদ ছাত্রলীগ নেতা মুহিবুর রহমান মুহিব ভাই, নাজিম উদ্দিন নজরুল ভাই, মান্না ভাই, সোহেল ভাই, আওয়ামীলীগ ছাত্রলীগ নেতা মসুদ আহমেদ ভাই সহ আরো অনেকের সঙ্গ।

কুসুমবাগ শপিংমল

মাঝে মধ্যেই এসব নেতাদের সঙ্গে ছুটে যেতাম এরশাদ বিরোধী মিছিলে, ছাত্র সংগ্রাম পরিবষদের সভা-সমাবেশে। ’৯০ এর ২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় এরশাদের লেলিয়ে দেয়া সন্ত্রাসীদের গুলিতে যেদিন ডা.শামসুল আলম খান মিলন শহীদ হলেন সেই দিনের ঘটনা এখনও মনে পড়ে। ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় বিবিসি’র সংবাদ শোনার জন্য শহর জুড়ে প্রতিটি দোকানে রেডিও’র সামনে অপেক্ষমান ছাত্র-জনতা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী সবাই। অপরদিকে শহরের চৌমুহনাসহ মূল পয়েন্টগুলোতে পুলিশের সঙ্গে আধা সামরিক বাহিনীর (বিডিআর) সদস্যরা টহল দিচ্ছে। সংবাদ শিরোনামে যখনই ডা. মিলন হত্যাকান্ডের কথা বলা হল মুহুর্তেই যেন শহর জুড়ে বিস্ফোরণ…। মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত হয়ে উঠলো পুরো শহর। পুলিশ-বিডিআরও তৎপর হয়ে উঠলো। চড়াও হল মিলিকারীদের উপর। আর ৪ ডিসেম্বর যেদিন এরশাদ ঘোষণা দিলেন ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার তখন সে কি আনন্দ…শহর জুড়ে মিষ্টি বিতরণ…এরশাদের কুশ পুত্তলিকা দাহ করা…। কি মধুর সেই দিনগুলো। এখন মনেই হলেই ভাবি সেই দিনগুলো যদি আবার ফিরে আসতো…।

ম্যানেজার স্টল

কলেজ জীবনের মাঝামাঝি সময়ে আমি নিজেকে জড়িয়ে নিলাম সংবাদপত্রের সঙ্গে। সবে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়েছি। এরই মধ্যে আত্মপ্রকাশ হল মুক্ত চিন্তার দৈনিক ভোরের কাগজ। পত্রিকাটি প্রকাশের মাস চারেকের মধ্যেই এই কাগজের রাজনগর উপজেলা সংবাদদাতা হিসেবে কাজ শুরু করলাম। জেলা প্রতিনিধি ছোট গল্পকার ও কবি আকমল হোসেন নিপু মামার সহযোগিতায় ভোরের কাগজের সঙ্গে যুক্ত হলাম। এ কারণে জেলা শহরেই কাটতে থাকে দিন, সপ্তাহ, মাসের প্রতিটি মুহুর্ত। রাত-বিরাতে বাড়ি ফিরে ঘুম। আবার ভোরের সূর্য উঁকি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গইে বেরিয়ে পড়া। সংবাদকর্মী হিসেবে যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার প্রাণের শহরের সঙ্গওে যেন সম্পর্কটা ক্রমেই নিবিড় হয়ে উঠলো। চৌমুহনা সংলগ্ন শহরের সেন্ট্রাল রোডে অবস্থিত দৈনিক সংবাদের জেলা বার্তা পরিবেশক আবদুস সালাম ভাইয়ের ঔষধ বিতান হয়ে উঠলো সংবাদকর্মীদের আড্ডাখানা।

ঔষধ বিতান

যেখানে ছিল অসংখ্য গাছ-গাছালি, ছিল পাখির কলরব। বৃষ্টির দিনে এই আড্ডাখানার টিনের চালে ঝুম ঝুমিয়ে বৃষ্টি পড়ার শব্দ…। এই আড্ডাখানায় নবীন-প্রবীণ সাংবাদিকরা একত্রিত হতেন। মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের তৎকালীন সভাপতি প্রয়াত শ্রদ্ধেয় শফকতুল ওয়াহেদ ভাই, সালাম ভাই, নিপু মামা, আবদুল হামিদ মাহবুব ভাই, রতনকান্তি চাকলাদার দা’, রাধাপদ দেব সজল দা’, শাহ অলিদুর রহমান, সারওয়ার ভাই, সংস্কৃতি কর্মী প্রয়াত নাজমুল ভাই, মসুদ আহমেদ ভাই, আবদুল আজিজ, আনোয়ারুল ইসলাম জাবেদসহ আরো অনেকে জড়ো হতেন। এখান থেকেই সংবাদ পাঠাতেন সবাই। আমিও প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যা হলেই এক অজানা ভালোবাসায় ছুটে যেতাম ঔষধ বিতানে। গরম পিঁয়াজো আর পুরি সঙ্গে গরম চা, মাঝে মধ্যে মোগলাই, ম্যানেজার স্টলের মিষ্টি ঘিরে আড্ডা হয়ে উঠতো আরো জম্পেশ। এই সব আপ্যায়নই করাতেন শ্রদ্ধেয় সালাম ভাই। সেন্ট্রাল রোডের সেই ঔষধ বিতান এখন আর নেই। সেখানে হয়েছে বহুল ভবন। আর ঔষধ বিতান চলে গেছে কোর্ট রোডে। কিন্তু সেই আড্ডা আজও চলছে। শুধু সেই আড্ডায় নেই আমি। বছর চৌদ্দ-পনেরো হল আমি প্রাণের শহরের এই আড্ডা ছেড়ে জীবীকার সন্ধানে এখন ইট-পাথরের বন্দী শহর এই ঢাকাতে।

রাধিকা স্টল

শুধু ঔষধ বিতানই নয়, মৌলভীবাজার শহরে ‘মনুবার্তা’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের হয়েছিল। কমিউনিস্ট পার্টির বর্তমান কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর ভাই ছিলেন সেই কাগজের মালিক। কিন্তু সব দায়িত্ব পালন করতেন নিপু মামা। চৌমুহনায় গড় উঠা সেই পত্রিকা অফিসটিও হয়ে উঠেছিল আমাদের সবার আড্ডাখানা। কিন্তু এখন আর সেই কাগজও নেই, আড্ডাও নেই। তবে সময় সুযোগ পেলেই ছুটে যাই প্রাণের শহরে। যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আমার অনেক স্মৃতি। কিন্তু সেই শহর এখন আর পুরোপরি আগের মত নেই। সময়ের ব্যবধানে কিছুটা হলেও বদলেছে। কিছু অট্রালিকা হয়েছে। শহর জুড়ে বেড়েছে টমটমের মত যানবাহন। তারপরও ভাল আছে আমার প্রাণের শহর। এখনও সবুজের সমারোহ আছে শহর জুড়ে। আগের তুলনায় কিছুটা যানজট সৃষ্টি হলেও শহর মৌলভীবাজারের মানুষ এখনও আগের মতই আছেন। সহজেই কাছে টেনে নেন, আপন করে নেন…সহজেই ভালোবাসতে পারেন…। তাইতো আমার শহর যেখানটায় পা রাখলে নিঃশ্বাস ভরে নির্মল বাতাস নিতে পারি। প্রাণ খুলে কথা বলতে পারি। এমন ভালোবাসার কারণে যত দূরেই থাকি না কেন- শহর মৌলভীবাজার তোমাকে কখনই ভুলবো না, ভুলতে পারবো না। তুমি ভালো থেকো সব সময়।

ছবি : লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]