আজকেরই কথা…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

রাজা ভট্টাচার্য্য

খাঁ খাঁ রোদ্দুরের দুপুর। ভোটের কাজ সেরে বেরিয়ে বাস ধরলাম নেতাজি ইন্ডোরের সামনে থেকে। ফাঁকা বাস। স্বাভাবিক। বাধ্য না-হলে এই গরমে কে-ই বা বেরুবে? আমরা নির্বাচনের জন্য বলিপ্রদত্ত— আমাদের কথা আলাদা৷ ভোটকর্মীর মরণের ভয় থাকলে রাষ্ট্রের কী হবে?

উঠে যে-সিটটা সামনে পেলাম, সেখানেই ধপ করে নিজেকে ছুঁড়ে দিলাম প্রত্যেকদিনের মতো। পরক্ষণেই চোখে পড়লো, সামনের আড়াআড়ি সিটে যিনি গম্ভীর হয়ে বসে আছেন, তাঁর মুখে মাস্ক নেই।

বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,“মাস্ক পরেননি কেন?”

মধুর হেসে তিনি জবাব দিলেন,“ভুলে গেছি।”

“ভুলে গেছেন মানে? আপনি জানেন না কী অবস্থা চলছে?”

মধুরতর উত্তর এলো,“আমার হোবে না।”

সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি, শৌখিন দাড়ি। পরিপাটি আত্মবিশ্বাসী জবাব।

গাঁ গাঁ করে বললাম,“আপনি নাহয় সটান উপরওলার গ্যারান্টি পেয়েছেন। আমি তো পাইনি! আপনার থেকে যদি আমার হয়?”

বাইরের দিকে তাকিয়ে অম্লানবদনে তিনি বললেন,“আমার ইলাকায় একজনেরও হয়নি।”

এইবার গোটা বাসের লোক চিল্লিয়ে উঠলো হরেক ভাষায়। বাসের গর্জন ছাপিয়ে উঠলো বকাবকি। ভদ্রলোক মিঠে হাসি বজায় রেখে কনফিডেন্টলি বসে রইলেন।

বাস ধর্মতলায় ঢোকার ঠিক আগে কন্ডাকটর সহসা বলে উঠলেন,“এএই! বাঁয়ে রাখ রে!” বলে, এক লাফে নেমে গেলেন বাস থেকে।

বাস দাঁড়িয়ে রইল।

ক্রমে গুঞ্জন শুরু হলো। কী ব্যাপার? দাঁড়িয়ে কেন? কন্ডাকটর নির্ঘাত গুটখা কিনতে গেছে! এই লোকগুলো…

এমন সময় ছুটতে ছুটতে ফিরে এলেন কন্ডাকটর। এক লম্ফে বাসের পাদানিতে উঠে অভ্যস্ত হাঁক ছাড়লেন,“চালা!”

তারপর ভিতরে এসে হাত বাড়িয়ে দিলেন সেই ভদ্রলোকের দিকে। সেই হাতে একটা নতুন মাস্ক। বিনাবাক্যব্যয়ে সেটা হাত বাড়িয়ে নিলেন তিনি; পরে ফেললেন চটপট, এবং সঙ্গে সঙ্গে অভ্যস্ত হাতে নামিয়ে আনলেন থুতনিতেও।

আমি এইবার প্যাঁচার মতো গলায় বললাম,“জীবানু থুতনি দিয়ে ঢোকে না। নাক-মুখ দিয়ে ঢোকে।” আমার দিকে একটি অগ্নিদৃষ্টি হেনে তিনি ঠিকঠাক পরলেন এবার।

আর রোগাপাতলা সেই কন্ডাকটর বললেন,“আরে দাদা, আড়াই তিন লাখ করে লোক প্রতিদিন… আপনারা বোঝেন না, দুদিন পর বাস বন্ধ হলে তো আমারই…কী দরকার! আপনারও তো রোগভোগ…”— তারপর মাথা নেড়ে টিকিট কাটতে আরম্ভ করলেন। ভদ্রলোক গম্ভীর হয়ে চেয়ে রইলেন জানলা দিয়ে৷

শিয়ালদায় নামার সময় গেটের পাশে দাঁড়িয়ে-থাকা কনডাক্টরকে জিজ্ঞেস করলাম,“নাম কী আপনার?”

অন্যদিকে তাকিয়ে জবাব দিলেন,“রাজু। রাজু দাস।” এখনও তাঁর ভুরু কুঁচকে আছে বিরক্তিতে৷

বহু…বহুদিন পর আজ মনে পড়লো, এককালে এইসব মানুষের কথা আমি লিখে রাখতাম এই হতচ্ছেদ্ধা ফেসবুকের পাতায়, যাকে নিয়ে ‘প্রকৃত লেখক’ আর ‘প্রকৃত পাঠক’-দের ছিছিক্কারের সীমা ছিলো না।

ভারতবর্ষ!

আমি নাহয় বদলে গিয়েছি।

আমার ভারতবর্ষ তো আর বদলে যায়নি মশাই! সে এখনও খালিপেটে তপ্ত দুপুরে বাসের পাদানিতে দাঁড়িয়ে চিল্লিয়ে চলে,“ধরমোওওতলা শিয়ালদা মানিকতলা…,” আর ভয় পায়…

ভয় পায়— আমাদের মতো ‘ভদ্রলোকেদের’ জন্য একদিন দেশের চাকা ফের স্তব্ধ হয়ে যাবে, আর সে বউ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে উপোস দেবে আবার!

আর আমরা কোনোক্রমেই মাস্কটুকু পরবো না, শুধু মৃদুহাস্যে বলবো,“আমার হোবে না…”

ছবি: গুগল আর লেখকের ফেইসবুক থেকে

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box