আজ অভিমানী মায়ের দুরন্ত ছেলেটির জন্মদিন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুৎফুল কবির রনি

‘তোমার মাখানো ভাতের সে স্বাদ, এখনও ভুলিনি মাগো। ভাতের থালা সামনে নিয়ে এখনও কি রাত জাগো। …… পারতেই হবে সইতে মাগো যত দিক যন্ত্রণা। কিছুতেই আমি জানতে দিব না, মক্তির আস্তানা। আংগুল গুলো অবশ ভীষণ, একটিও নেই নখ। হয়তো আজই টর্চার সেলে, তুলেই নেবে চোখ। স্বাধীন হলো বাংলা, তবু মায়ের চোখে জল। কোথায় হারাল আজাদ, তোরা কেও ত এসে

কিশোর আজাদ

বল…।

শহীদ আজাদকে এভাবেই অবসকিওর স্মরণ করেছিল গানে। শহীদ আজাদ। আজাদ ছিলো ভীষণ বড়লোক বাবা–মার একমাত্র সন্তান। আজাদের বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করলে প্রতিবাদে আজাদের মা সেই রাজপ্রাসাদ থেকে বের হয়ে যান ক্লাস সিক্সে পড়া আজাদের হাত ধরে। অনেক কষ্টে আজাদকে লেখাপড়া করান।

আজাদ ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে মাস্টার্স পাস করে। দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। আজাদের বন্ধু রুমী, হাবিবুল আলম বদি, জুয়েল প্রমুখ গেরিলা অপারেশনে অংশ নিচ্ছে আগরতলা থেকে ফিরে এসে। আজাদ তাদের সঙ্গে যোগ দিলো। আজাদদের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা শেল্টার নিলো। অস্ত্র লুকিয়ে রাখলো। ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট/ ৩১ আগস্ট আজাদদের বাড়ি পাকিস্তানি সৈন্যরা ঘিরে ফেলে। গোলাগুলি হয়। আজাদসহ মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি মিলিটারি। আজাদকে রমনা থানায় রাখা হয়।

এরপর রমনা থানায় ছুটে গিয়েছিলেন আজাদের মা ছেলের সঙ্গে দেখা করার জন্য। মাকে দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন আজাদ। মা জানতে চাইলেন ‘কেমন আছো’, আজাদ মাকে বললেন, ‘খুব মারে, ভয় হচ্ছে কখন সব স্বীকার করে ফেলি’। ছেলের সামনে তিনি ভেঙ্গে পড়েন নি। বরং ছেলেকে সাহস দিয়ে বলেছিলেন, ‘শক্ত হয়ে থেকো বাবা। কোন কিছু স্বীকার করবে না’।

আজাদের মাকে জানানো হয়, আজাদ রাজসাক্ষী হলে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। মা দেখা করেন ছেলের সঙ্গে। বলেন, শক্ত হয়ে থেকো বাবা কোনো কিছু স্বীকার করবে না। ছেলে বলে, মা, কতদিন ভাত খাই না। কাল যখন আসবে আমার জন্য ভাত আসবে। পরের দিন মা ভাত নিয়ে যান। গিয়ে দেখেন ছেলে নাই। এই ছেলে আর কোনদিনও ফিরে আসে নি। ধরে নেওয়া হয় সেদিন-ই ঘাতকরা মেরে ফেলেছে মায়ের যাদুধন আদরের আজাদকে।

ছেলে একবেলা ভাত খেতে চেয়েছিলেন। মা পারেননি ছেলের মুখে ভাত তুলে দিতে। সেই কষ্ট-যাতনা থেকে পুরো ১৪টি বছর ভাত মুখে তুলেন নি মা! তিনি অপেক্ষায় ছিলেন ১৪ টা বছর ছেলেকে ভাত খাওয়াবেন বলে। বিশ্বাস ছিলো তাঁর আজাদ ফিরবে। ছেলের অপেক্ষায় শুধু ভাতই নয়, ১৪বছর তিনি কোন বিছানায় শোন নি। শানের মেঝেতে শুয়েছেন শীত গ্রীষ্ম কোন কিছুতেই তিনি পাল্টাননি তার এই পাষাণ শয্যা। আর এর মুল কারণ আজাদ রমনা থানায় আটককালে বিছানা পায়নি।
১৯৮৫ সালের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন আজাদের মা।

আজ অভিমানী মায়ের দুরন্ত ছেলেটির জন্মদিন । বড়লোকের সন্তান হলেই বখে যাবে , বোধ , চেতনা তৈরি হবে না বলে যে মধ্যবিত্ত ধারণা , তা থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন রুমি ,আজাদরা । ওরাই আমার লাল সবুজ , আমার চেতনার বাতিঘর । আমরা কি পারি না নতুন প্রজন্মকে বার বার পরিচয় করিয়ে দিতে শেকড়ের সন্তানদের সঙ্গে । তাহলে অন্তত জংলী হয়ে উঠবে না তারা ।

শুভ জন্মদিন শহীদ আজাদ।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]