আজ তাজউদ্দিন আহমেদের জন্মদিন

আবদুল্লাহ আল মোহন

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনকারী, অস্থায়ী সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদের জন্মবার্ষিকী আজ। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সুযোগ্য পরিচালক তাজউদ্দীন আহমদ কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন পরিণত সমাজভাবনা ও রাষ্ট্রচিন্তার অধিকারী। বাংলাদেশের মানুষের প্রিয় এই রাজণেতিক নেতা ১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মদিনে স্মৃতির উদ্দেশ্যে রইলো প্রাণের বাংলার পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।  
১৯৭১ সালে বাঙালি জাতির চরম সঙ্কটময় মুহূর্তে তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ৯ মাসের স্বাধীনতাযুদ্ধ খুবই প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন। ১৯৭১ সালে ৪৬ বছর বয়সে তাজউদ্দীন আহমদ যুদ্ধকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর অনন্য সাধারণ নেতৃত্বে ৯ মাসের যুদ্ধে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি বিজয় অর্জন করে। তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের ইতিহাস রচনায় অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি ছিলেন মনে প্রাণে দেশপ্রেমিক এবং সম্পূর্ণ নির্লোভ এক চরিত্রের মানুষ। মানুষের জন্য একেবারেই নিঃস্বার্থ সেবা ও কল্যাণ ছিল তাঁর রাজনীতির লক্ষ্য। মুক্তিযুদ্ধে সফল নেতৃত্বদানকারী তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ত্যাগ, নিষ্ঠা, দক্ষতা ও স্বদেশপ্রেম বাঙালি জাতির ইতিহাসে ভাস্বর হয়ে থাকবে। রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, সংগঠক, প্রশাসক, সর্বোপরি রাষ্ট্রনায়ক – সবকিছুকে ছাপিয়ে উঠেছিলেন মানুষ তাজউদ্দীন আহমেদ। স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠনের সময় নিজেসহ সবাইকে অঙ্গীকার করিয়েছিলেন যে, ‘স্বাধীন না হওয়া পর্জন্ত কেউ সংসার ধর্ম পালন করবেন না’, যা তিনি অক্ষরে অক্ষরে সেই অঙ্গীকার রক্ষা করেছিলেন।
আইনজীবী, রাজনীতিক এবং বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার দরদরিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মৌলবী মুহাম্মদ ইয়াসিন খান এবং মাতা মেহেরুন্নেসা খানম। তাঁরা ছিলেন চার ভাই ও ছয় বোন। তাজউদ্দীন আহমদের শিক্ষাজীবন শুরু হয় গ্রামের মক্তবে, এরপর বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরবর্তী ভুলেশ্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সর্বশেষ স্কুল জীবন ঢাকার সেন্ট গ্রেগরীজ হাইস্কুলে শেষ হয়। তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৪৪ সালে ঢাকার সেন্ট গ্রেগরীজ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৪৮ সালে আই.এ এবং ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি আইনশাস্ত্রে ডিগ্রি লাভ করেন এবং ঢাকায় আইনব্যবসা শুরু করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তাজউদ্দীন আহমদ সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িত হন। ১৯৪৩ সাল থেকে তিনি মুসলিম লীগের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং ১৯৪৪ সালে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। পাকিস্তান আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তাজউদ্দীন আহমদ বাংলা ভাষার অধিকার, বাঙালির অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সকল আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মুসলিম লীগ সরকারের গণবিচ্ছিন্ন রাজনীতির প্রতিবাদে তিনি এ দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। তিনি ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের (১৯৪৯) অন্যতম উদ্যোক্তা। তিনি ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত পূর্ববাংলা ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে তিনি ভাষা আন্দোলনকালে গ্রেফতার হন এবং কারা নির্যাতন ভোগ করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য এবং ১৯৫১ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত এ সংগঠনের নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৭ সালে তিনি ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সংস্কৃতি ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক ছিলেন এবং পরে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চ লাইট-এর মাধ্যমে গণহত্যা শুরু করে। এই সময় শেখ মুজিবর রহমানকে গ্রেফতার করে নিয়ে তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। এই সূত্রে শুরু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। আত্মরক্ষার জন্য ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় তিনি ফরিদপুর কুষ্টিয়া পথে পশ্চিম বাংলার সীমান্তে পৌঁছান।  তিনি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী’র সাথে দেখা করার জন্য দিল্লী যান। দিল্লীতে তাঁর সাথে ভারত সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হয়। এসময় তিনি উপলব্ধি করেন যে, ভারত সরকারের কাছ থেকে সাহায্য পেতে হলে একটি সরকারী বৈধতা বা স্বীকৃতি থাকা প্রয়োজন। তখনই তিনি প্রবাসী সরকার গঠনের চিন্তা করেন। তাজউদ্দীন আহমদ ইন্দিরা গান্ধীর কাছে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের জন্য অনুরোধ করেন। ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, উপযুক্ত সময়ে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়া হবে। এভাবেই অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের ধারণার সূচনা। ৪ঠা এপ্রিল দিল্লীতে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাজউদ্দীনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়। ১০ই এপ্রিল নির্বাচিত সাংসদগণ আগরতলায় একত্রিত হয়ে এক সর্বসস্মত সিদ্ধান্তে সরকার গঠন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই সরকার স্বাধীন সার্বভৌম “গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার”। স্বাধীনতার সনদ (Charter of Independence) বলে এই সরকারের কার্যকারিতা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হয়।

১১ এপ্রিল তাজউদ্দীন বেতারে ভাষণ দেন। ১৭ এপ্রিল নবগঠিত মন্ত্রীসভার প্রকাশ্য শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয় কুষ্টিয়ার মেহেরপুর মহকুমার সীমান্তবর্তী গ্রাম বৈদনাথতলায়, যার নতুন নামকরণ হয় মুজিবনগর । শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে দেয়া ভাষণে তাজউদ্দীন আহমদ দ্বার্থহীন কণ্ঠে বলেছিলেন, “পাকিস্তান আজ মৃত এবং অসংখ্য আদম সন্তানের লাশের তলায় তার কবর রচিত হয়েছে । স্বাধীন বাংলাদেশ আজ বাস্তব সত্য । সাড়ে সাত কোটি বাঙালি অজেয় মনোবল ও সাহসের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে এবং প্রতিদিন হাজার হাজার বাঙালি সন্তান রক্ত দিয়ে এই নতুন রাষ্ট্রকে লালিত পালিত করছেন । দুনিয়ার কোনো জাতি এই নতুন শক্তিকে ধ্বংস করতে পারবে না’’ ।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর অন্য তিন জাতীয় নেতার সঙ্গে কারাগারে খুনী সেনাসদস্যদের হাতে নির্মম ভাবে খুন হন বাংলাদেশের এই অভিবাবক।

তথ্যসূত্র : বাংলাপিডিয়া, ইন্টারনেট

ছবিঃ গুগল