আজ দু:সাহসের জন্মদিন

লুৎফুল কবির রনি

বব মার্লেকে যে দিন হত্যা চেষ্টার জন্য গুলি করা হয় তার ঠিক দুই দিন পরেই একটা কনসার্টে গান গাওয়ার কথা ছিলো। বুকে গুলি খেয়ে বব মার্লের জীবন নিয়েই যখন টানাটানি, তখন আয়োজকরা সার্বিক দিক বিবেচনা করে কনসার্টটি বাতিল করার ঘোষণা দেয়, কিন্তু বাধ সাধে একরোখা বব মার্লে নিজেই। তিনি কনসার্ট বাতিল করতে নারাজ এবং কোনভাবেই তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে আটকানো গেলো না। দুই দিন পর নির্ধারিত সময়েই তিনি মঞ্চে উঠলেন এবং অসম্ভব দুর্বল শরীরে স্রেফ মনে জোরে গেয়ে গেলেন তার প্রতিবাদী গান। বিস্মিত আয়োজক এবং মিডিয়ার লোকজন তাকে শুধু একটা প্রশ্নই করলেন,

– “Why ?”

উত্তরে বব মার্লে বলেছিলেন,

– ” The people, who were trying to make this world worse… are not taking a day off. How can I …. ! ! ! “

অবহেলিত মানুষের অধিকার নিয়ে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনে বিদ্রোহী মানুষের বুকের সাহস হয়ে গেয়ে উঠেছিলেন।বব মার্লে দেখিয়ে গেছেন শুধু গান কিভাবে অধিকার রক্ষার্থে বুকের রক্ত রাজপথে দিতে শেখায়।

রেগে শিল্পীদের লড়াকু ইতিহাস, নয়া উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রামের ইতিহাস জড়িত রাস্তাফারাই আন্দোলনের কিংবদন্তীতুল্য ‘রাস্তা’-দের একজন বব মার্লে।

‘রাস্তাফারি’ শব্দ শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে বিনি বাঁধা লম্বা জটা চুলের, স্বতঃস্ফূর্ত হাসির বব মার্লের (Bob Marley) ছবি। । ৭০ দশক পৃথিবী ছিল মার্লেময়। সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদী বিশ্বের বিপক্ষে জ্যামাইকান বাফেলোর যুদ্ধ। যখন গিটার নিজেই এক বিপ্লব আর মার্লে হতশ্রী, দুর্বল, নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে গাইতেছেন—

‘Get up, stand up: stand up for your rights!

Get up, stand up: stand up for your rights!

Get up, stand up: stand up for your rights!

Get up, stand up: don’t give up the fight!’

বব মার্লে বিশ্বাস করতেন রাস্তাফারি কালচারে। বব মার্লে বিশ্বাস করতেন ‘রাস্তাফারি’ ধর্মে। মার্লেকে এই ধর্ম নিয়ে সাক্ষাৎকারগুলোতে প্রচুর বলতে হয়েছে। বলতে হয়েছে কেন তিনি রাস্তাফারি, কেন রাস্তাফারি হয়ে ওঠে সাদা-কালো, শোষক-শোষিত বৈষম্যের বিরুদ্ধে অধিকার আদায়ের হাতিয়ার। রাস্তাফারি কেবল ধর্ম নয়; তা মানব ও একটি জাতির ইতিহাস ও ক্ষমতার ‍বিরুদ্ধ লড়াইও বটে। কালো বলে আফ্রিকা শোষিত আজ। মহান দেশ ইথিওপিয়া যেখানে শোষিত সেখানেই রাস্তাফারিয়ানদের যুদ্ধ। শোষিত রাস্তাফারিয়ান ও মার্লে বিশ্বাস করতেন, একদিন রাস্তাফারিয়ানদের গড ইথিওপিয়ান সম্রাট হেইলে সালাসসিয়ে কালো মানুষের পক্ষে পুনর্বার জেগে উঠবেন। বব মার্লে জানতেন, কিভাবে দস্যু আমেরিকানরা দখল ও চুরি করে নিয়ে গেছে আফ্রিকানদের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য।–

“Buffalo Soldier, Dreadlock Rasta:

There was a Buffalo Soldier in the heart of America,

Stolen from Africa, brought to America,

Fighting on arrival, fighting for survival.”

জ্যামাইকান পপ,রেগে গুরু ‘বব মার্লে’ একটি কথা বিশ্বাস করতেন – মানুষের প্রতি মানুষের ঘৃণা, বর্ণপ্রথা মানুষের মন থেকে একেবারে নির্মূল করা সম্ভব। আর এজন্য মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটাতে হবে, গানের মাধ্যমে ভালোবাসার বীজ বোপন করতে হবে।

Love the life you live,
Live the life you love

আমরা বড় হতে হতে ভুলে যাই জীবন বলে কিছু আছে। জীবনকে ভালবেসে বেঁচে থাকা বলতে কিছু আছে। জীবনকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়ে বাঁচা বলতে কিছু আছে। আমরা বেঁচে থাকি অন্যের নির্ধারিত নিয়মে, আমাদের সঙ্গে হয়ে যাওয়া হাজারটা অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করে।বেঁচে থাকি লোকলজ্জার ভয়ে, বেঁচে থাকি ‘মানুষ কি বলবে’ এই ভেবে ভেবে। এভাবেই একদিন মৃত্যু এসে কেড়ে নিয়ে যায় জীবনটাকে। জীবনটাকে ভালবেসে আর বেঁচে থাকা হয়ে ওঠে না আমাদের,বব মার্লে আমাদের সেই ভালোবাসার কথা বলেন।

মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সেই তাকে পৃথিবী ছেড়ে, কোটি কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে চলে যেতে হয়। মার্লের সাবেক ব্যবসা পরিচালক কলিন লেস বলেন, ‘প্রায় চার হাজারেরও বেশি মানুষকে মার্লে দেখাশোনা করতেন। তাদের অভুক্ত না থাকা, প্রতিপালন করার ব্যবস্থা করেছিলেন মার্লে।’

মার্লের গল্পটা এক অতিবাস্তবতার গল্প। বিপ্লব, রেগে, গাঁজা, ফুটবলপ্রেমী, মানবতাবাদী ও কিংবদন্তী এক রকস্টারের গল্প। যার গান সাদা-কালো মানুষকে এক সঙ্গে বেঁচে থাকার প্রেরণা দেয়। মার্লে নিজে প্রায় পাঁচ’শ গান লিখেছেন ও সুর করেছেন। তার গাওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে অন্যতম হল ‘গেট আপ স্ট্যান্ড আপ’, ‘বাফেলো সোলজার’, ‘ওয়ান লাভ’ ও ‘নো ওম্যান নো ক্রাই’। বিবিসি তার ‘ওয়ান লাভ’ গানটিকে শতাব্দীর সেরা গান নির্বাচিত করেছে। ১৯৯৯ সালে টাইম ম্যাগাজিন ‘বব মার্লে অ্যান্ড দ্য ওয়েইলার্স’ অ্যালবামকে ‘বিশ শতকের সেরা অ্যালবাম’ নির্বাচিত করে ।

আজ ৬ ফেব্রুয়ারি বব মার্লের জন্মদিন। দুনিয়ার ইতিহাসের খুব কম শিল্পীকেই মারা যাওয়ার এত বছর পরও এত ভালোবাসায় সিক্ত করা হয়েছে। তার গাওয়া ‘নো ওম্যান নো ক্রাই’ বা ‘ইজ দিস লাভ’-এর মতো গানগুলো আজও শ্রোতাকে মোহাবিষ্ট করে রাখছে দিন থেকে বছর। তার না থাকার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় টিএসসি-র দেয়ালে বা যুবকদের টি-শার্টে বব মার্লের ছবি দেখেলেই। মৃত্যুর চার দশক হতে চললেও আজও যেন মনে হয় গিটার হাতে মঞ্চে মার্লে চিৎকার দিয়ে শ্রোতার বুকে কাঁপন ধরিয়ে গাইছেন-

‘জাগো, দাঁড়াও: দাঁড়াও তোমার অধিকারের জন্য
জাগো, দাঁড়াও: ছেড়ে দিও না বন্ধু বাঁচার যুদ্ধ’

মার্লে দেহকে তুলে ধরেন মাত্র ছত্রিশে। কিন্তু তাঁর গান ছত্রিশ কোটি মানুষকে দিয়ে গেছে লড়াই ও বেঁচে থাকার প্রেরণা।এই দিনে জন্মেছিলেন গিটার হাতে পৃথিবী বদলে দেয়ার এই স্বাপ্নিক।

আজ দু:সাহসের জন্মদিন