আজ সেই কালো রাত

দ্বিতীয় সৈয়দ হক

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

( দ্বিতীয় সৈয়দ হক): ২০১৮। অগাস্ট ১৫। রাত ১১:৩০। বসে আছি একা, স্টুডিওর নিয়মিত মৃদু আলোর ভেতরে সোফায় আমার নিয়মিত স্থানে। নিয়মিত ভাবেই রোজ এই সময় আমি আস্তে, ধীরে লেখার দিকে হাত বাড়াই। ইতস্তত করি, অনিশ্চিত, কিছুটা অপ্রস্তুত, দো’মনা হয়ে ভাবি, আজ রাতেও কি কল্পনার সুরেখা ধরে হাঁটা যাবে আরো খানিকটা পথ, লেখনীর ওই নির্জন সড়ক দিয়ে?

ফোন বেজে ওঠে। কলেজে-পড়া, টুকটুকে একটি লাজুক মেয়ের মত মুখ ফিরিয়ে হাত সরিয়ে নেয়, লেখা। কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। অদ্ভূত এই সম্পর্ক আমাদের দুজনার। কেউ থাকলে চলবে না। যা কিছু হবার, সব‌ই আড়ালে।

বাবা মায়ের সঙ্গে রাসেল

ফোনে দেখি জিনা’র ছবি জ্বলছে, নিভছে।
ধরে দেখি জিনা নয়, এজরা। আমার ছেলে।
“বাবা, একটু উপরে আসবা?”
“অবশ‍্য‌ই, বাবা। দু’মিনিট সময় দাও।”

এটি নতুন কিছু নয়, এটিও নিয়মিত। ছেলেটা ঘুমোবার আগে আমাকে চায়। চায় বাবা, ও সঙ্গে, তার গল্পের ভাণ্ডার নিয়ে শুয়ে চোখ ঢুলুঢুলু না হওয়া পর্যন্ত রোজ রাতে একটু গল্প করতে, তার চাইতেও বেশী, শুনতে।

ঘরে ঢুকতেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাতাস মনে করিয়ে দেয়, যে হিমালয়ে পাহাড়ের চূড়ায় বরফ থাকে, বছরের এমন উষ্ণ দিনেও। যখন হেমন্ত এসে পৌঁছে জুতো-জোড়া পর্যন্ত খুলবার সময় পায় নাই।

ছেলে আমার, খাটের ওপর উবু হয়ে ছবি আঁকছে আপনমনে; মুখ তুলে আমাকে দেখেই হাসি। সারাটা জীবন পড়ে আছে সামনে বাচ্চাটার, আরো কত ছবি আঁকার, কত খেলা, কত আনন্দ, রোজ রাতে বাবার সঙ্গে সময় শেষে মায়ের কাছে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকা…

রাসেল!

মনে না করে পারি না। মন থেকে ছবিটা মুছে ফেলতেও পারি না। এটা যে আমার নিজস্ব রাসেল। আর, আজ, এই মুহুর্তে, দেশ জুড়ে কত লাখো বাবা-মায়ের কাছে শুয়ে থাকা তাঁদেরও নিজস্ব কত লাখো রাসেল।

এই বয়সে কোন মায়ের ছেলে ভাবে, কী বিভৎস দৃষ্টি অপেক্ষায়, আর মাত্র কয়েক ঘন্টা বাদে। কোন ছেলে ভাবে, আর ছবি আঁকা হবে না, শুয়ে থাকা হবে না, মায়ের কোলে মুখ গুঁজে। পঁচাত্তর সালে, এই কালো রাতে, আমরা দেখতে পাই, যে এমন‌ও হয়।

যারা সেই ছেলেটির প্রাণ … তাদের এজরা … কালো বুট-জুতোর গোড়ালি দিয়ে পিষে দিতে পারলো রক্তাক্ত জমিনে, তাদেরও ঘরে ছিলো নিশ্চয়ই এমন ছেলে। আজো তাদের উত্তরপুরুষদের ঘরে রয়েছে, এমনো ছেলে, যে ছবি আঁকে, যার বাবাকে ডাকতেই চলে আসে, যার মায়ের কোলে পাওয়া যায় গর্ভের নিরাপত্তার ঘ্রাণ।

আজ আর লিখবো না, ঠিক করেছি। ডায়রির এই একটি পাতা-ই থাক। লেখনীও মুখ ফিরিয়ে নেয় লজ্জায়। আগে কখনো এই রাত এভাবে আমাকে কাতর করে নাই। বড় হবার সৌভাগ‍্য লেখা থাকে যদি আমার বাচ্চাটার কপালে, তাহলে হয়তবা আর কোনদিন‌ও অনুভব করতে হবে না এই রাতটিকে; এমনভাবে।

রাসেল, তোমাকে দেই একটি পিতার ভালবাসা। ছবি এঁকে যাও নির্ভয়ে, বেহেস্ত।

বঙ্গবন্ধু, তোমাকে দেই এই কলম তুলে লেখকের সালাম। আর কথা দিই, আমার জাতির পিতা, তুমি বেঁচে থাকবে আমার লেখনীতে যতদিন এই কলমে জোর আছে।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

ছবি: গুগল