আত্মবিস্মৃত জাতির বিপন্ন স্বাধীনতা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রেজাউর রহমান

দুই.

(অটোয়া থেকে): যুদ্ধ ছাড়াও দেশ দখল করা যায়:  পলাশী যুদ্ধের বেশ আগে থেকেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষে , বিশেষ করে বাংলায় ব্যবসা সম্প্রসারণের  নামে তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করছিলো  I ভারতবর্ষে পর্তুগিজদের একচেটিয়া বাণিজ্য সুবিধা খর্ব করার উদ্দেশ্যে , ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের প্রতিনিধি ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হকিন্সকে ১৬০৮ সালে মুগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে পাঠায়  ক্যাপ্টেন হকিন্স ভারতের পশ্চিম উপকূলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কয়েকটি কারখানা স্থাপনে সম্রাটের অনুমতি লাভ করে I ১৬১৫ সালে ব্রিটেনের সম্রাট ১ম জেমস, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে আরো ব্যাপক বাণিজ্য সুবিধা দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছে তার দক্ষ রাজদূত স্যার টমাস রো  কে পাঠান

বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়ান কোম্পানী

Iসম্রাট জাহাঙ্গীর তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে মুঘল সাম্রাজ্যে একছত্র বাণিজ্যের অধিকার দিয়ে রাজকীয় ফরমান জারি করেন Iপরবর্তীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সমগ্র ভারতবর্ষে  দেশীয় শিল্পের অবনতি ঘটিয়ে তাদের নিজস্ব ব্যাবসা প্রসারের মাধম্যে দেশটিকে কার্যত দখল করে নেয় I তারা বাংলার মসলিন বস্ত্র শিল্পের বিনাশ কি ভাবে ঘটিয়েছে তা সুবিদিত i ব্যাবসার  মুনাফার অর্থ দিয়েই তারা  নিজস্ব সামরিক বাহিনী গড়ে তোলে যা দেশের চূড়ান্ত ক্ষমতা দখলে ব্যবহৃত হয় I

মূলকথা: একটি দেশ দখল করার চূড়ান্ত পদক্ষেপ হচ্ছে যুদ্ধ কিন্তু ভৌগোলিক অর্থে দেশ দখল না করেও একটি  দেশকে আরেকটি শক্তিশালী দেশ তার উপনিবেশে পরিণত করতে পারে  আলোচনার সুবিধার্থে  কিছু কাল্পনিক পরিস্থিতি উদহারণ হিসেবে ব্যবহার করা যাক:

(ক) বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতমুখী রাজনৌতিক আদর্শ ও সংঘাতের সুযোগ নিয়ে যদি কোনো শক্তিশালী দেশ মনে করে যে তারা একটি রাজনৈতিক দল কে ক্ষমতা অর্জনে ও সেই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য সর্বাত্মক সমর্থন দেবে তাহলে তারা অবশ্যই তাদের নিজেদের স্বার্থে সেই রাজনৈতিক দলের সরকারের কাছ থেকে সব সুবিধা আদায় করে নেবে I আর যখনি সেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল  দেশের স্বার্থ বিরোধী কোনো পদক্ষেপ  নিতে অস্বীকৃতি জানাবে অথবা অপারগ হবে  তখনি  তাদের প্রতিপক্ষ দলকে একই শর্ত পূরণের বিনিময়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার জন্য সেই দেশ সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে I

১৭৫৭ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের ব্যাবসা ও রাজনৈতিক প্রভাব সম্প্রসারণের জন্য নবাব সিরাজুদৌলা কে ক্ষমতাচ্যুত করে তার প্রতিপক্ষ , মীরজাফর কে ক্ষমতায় বসায়  পরবর্তীতে , মীরজাফর তার দেয়া প্রতিশ্রুতি পালনে বার্থ হলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে  তার জামাই মীর কাশিম কে ক্ষমতায় বসায় কিন্তু তাকে দিয়ে কার্যোদ্ধার না হওয়ায় পরে তাকেও ক্ষমতাচ্যুত করে I ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একের পর এক তাবেদার সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে বসাতে একশো বছর কেটে যায় , শেষ অবধি ১৮৫৭ সনে বাংলা থেকে শুরু হওয়া সিপাহী  বিদ্রোহে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতার ভিত নড়ে যায় I এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও শেষ অবধি ব্রিটিশ সরকার ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির   শাসনের অবসান ঘটিয়ে নিজেই এর শাসক হয়ে বসে I

(খ) বাংলাদেশে কোনো বিদেশী রাষ্ট্র তার প্ৰভাৱ বিস্তারের জন্য প্রথমেই বাংলাদেশের বিশিষ্ট  ব্যাক্তিবর্গ  যেমন  বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাংবাদিক ,  সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব অথবা কোনো গোষ্ঠী, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্য থেকে সেই দেশের সমর্থক  বা সেই দেশের পক্ষে প্রভাব বিস্তারে সহায়ক হবে এমন ব্যাক্তিবর্গ ও সংগঠনকে অর্থ বা অন্য সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে তার এজেন্ট নিয়োগ করতে পারে  এই এজেন্টদের কাজ হবে সেই বিদেশী রাষ্ট্রকে বাংলাদেশের বন্ধু হিসাবে জনগণের কাছে তুলে ধরা  এদের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে  সেই দেশের বাংলাদেশের স্বার্থ বিরোধী সকল কর্মকান্ডের বিষয়ে যাতে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষিত না হয় সেই জন্য সেই দেশের সাথে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক , ক্রীড়া ও  ও অন্যান্য  অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জনগণকে ব্যাস্ত রাখা আর যদি কেউ সেই রাষ্ট্রের ক্ষতিকর কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করে তাহলে ব্যাপক প্রচারণার মধ্য দিয়ে তার চরিত্র ও বিশ্বাসযোগ্যতার হানি ঘটানো যাতে সে ওই দেশের স্বার্থের প্রতি হুমকি হয়ে না দাঁড়ায় I

পর্তুগিজ

(গ) দেশের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার জন্য সবসময় এক দল মানুষ পাওয়া যাবে I স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মুশতাক আহমেদ পাকিস্তানের সাথে গোপনে আঁতাত করে অখণ্ড পাকিস্তান রাখতে চেয়েছিলো I পরবর্তীতে সামরিক অভ্যুত্থানের  মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ  মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের নৃশংস ভাবে হত্যা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলে এই খুনি প্রধান  ভূমিকা পালন করে I

ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন ও শোষণ  অবসানে ১৮৫৭ সালে সংঘটিত সিপাহী বিদ্রোহ বা প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ আজও বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক I ওই বছরের ২৯ মার্চ  মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের  ব্যারাকপুরে অবস্থানরত ৩৪ বেঙ্গল নেটিভ ইন্ফ্রান্টি  রেজিমেন্টের  ২৯ বছরের তরুণ সিপাহী মঙ্গল পান্ডে   তার উর্ধতন ব্রিটিশ সামরিক অফিসারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন I এডজুটেন্ট লেফটেন্যান্ট  বগ এর প্রতি বর্ষিত তার গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়  I মঙ্গল পান্ডেকে  গ্রেফতারের জন্য জমাদার ঈশ্বরী প্রসাদকে নির্দেশ দিলে সে তা মানতে অস্বীকৃতি জানায় I অন্যান্য সব সিপাহী মঙ্গল পান্ডেকে নিরস্ত করতে অস্বীকৃতি জানালেও শুধু একজন সিপাহী শেখ পল্টু নির্দেশ পালন করে মঙ্গল পান্ডেকে আটকে ফেলে I

আজ মঙ্গল পান্ডে কে আমরা সবাই শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি , আমরা বলি যে তিনিই সিপাহী বিদ্রোহের সূচনা করেছিলেন কিন্তু এ কথা বলিনা যে তার বিদ্রোহে তাৎক্ষণিক ভাবে অন্য সৈন্যরা তো নয়ই , বাংলার বা ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষ কেউ যোগ দেয়নি , কেউ তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেনি I তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ অমান্য করে অন্যান্য সৈন্যরা ইতোমধ্যেই সামরিক আইন ভেঙে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছিল সুতরাং মঙ্গল পান্ডের সাথে বিদ্রোহে যোগ দিলে তাদের শাস্তি হবে ব্যাপারটা তা ছিলোনা ব্রিটিশরা ৩৪ বেঙ্গল নেটিভ ইনফ্রানটি রেজিমেন্ট ভেঙে  দেয়  I   তারা বিদ্রোহে যোগ দিলে হয়তো বিদ্রোহ সফল হতো কিন্তু তারা নিষ্ক্রিয় থাকার ফলে  তা ব্যর্থ হয়  I

বৃটিশ সেনাবাহিনি মঙ্গল পান্ডে আর ঈশ্বরী প্রসাদকে  গ্রেফতার  করে সামরিক আদালতে তাদের  বিচার করে তারপরে ১৮৫৭ সালের ৮ এপ্রিল মঙ্গল পান্ডেকে  আর ২২ এপ্রিল ঈশ্বরী প্রসাদকে ফাঁসি দেয়  I এর ঠিক  এক মাস পরে মিরাটে  অবস্থানরত ভারতীয় সিপাহীরা  এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজে গরু ও শুয়োরের চর্বি আছে এই দাবিতে ওই রাইফেল ব্যাবহারে অস্বীকৃতি জানায় I ব্রিটিশ সেনাবাহিনী এই অবাধ্য সিপাহীদের  দীর্ঘ মেয়াদি কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে  যা অন্যান্য সিপাহীদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করে I ১৮৫৭ সনের ১০ মে মিরাটে ভারতীয় সৈন্যরা ব্রিটিশ সামরিক অফিসারদের গুলি ও হত্যাকরার মধ্যদিয়ে ব্যাপক বিদ্রোহের সূচনা করে ও  কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সকল সিপাহীকে মুক্ত করে  I   তাদের এই বিদ্রোহ যদি মঙ্গল পান্ডের বিদ্রোহের সাথে সাথে শুরু হয়তো হয়তো তাকে ফাঁসিতে প্রাণ দিতে হতো না হয়তো তিনি যুদ্ধে প্রাণ দিতেন  I

১৮৫৭ সনের সিপাহী বিদ্রোহ বা ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে আজকের বাংলাদেশ যে শিক্ষা নিতে পারে তার সারসংক্ষেপ হচ্ছে :

মঙ্গল পান্ডে

* স্বাধীনতা অর্জন ও তা রক্ষার  জন্য সাহসী ও দক্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বর প্রয়োজন :১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ ক্রমান্বয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে রূপান্তরিত হয় কিন্তু এতে সাধারণ জনগণ নয় মূলত সিপাহীরাই অংশ নেয়  I বেঙ্গল আর্মির এক লক্ষ উনচল্লিশ হাজার সিপাহীর মধ্যে পরবর্তীতে মাত্র সাত হাজার সাতশো ছেয়ানব্বুই জন সিপাহী বিদ্রোহে অংশ নেয় I এই বিদ্রোহ বা যুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্বর আহ্বানে বা নেতৃত্বে শুরু হয়নি , বিদ্রোহের পরপরই সিপাহীরা দিল্লিতে যেয়ে কার্যত ক্ষমতাহীন অশীতিপর মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের সমর্থন কামনা করে ও তাকে এই স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রধান নেতা হিসাবে অভিষিক্ত করে   এই যুদ্ধে তিনি প্রতীকী প্রধান কিন্তু প্রধান পরিচালক নন  এই যুদ্ধ পরিচালনার জন্য কার্যকর , দক্ষ ও ঐকমত সম্পন্ন কোনো পরিষদ ছিল না ফলে এই স্বাধীনতা যুদ্ধ ব্যর্থ হয়

১৯৭১ সনের ৭ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সুস্পষ্ট ও দ্বার্থ্যহীন ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান  তার আগে ১৯৭০  সনে পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে বাঙালিরা তাকে তাদের অবিসম্বাদিত নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে এবং বাঙালিদের স্বাধিকার আন্দোলনে তার নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন দেয়  তাকে কেউ হঠাৎ করে নেতা নির্বচন করে নাই  তার নির্দেশ অনুযায়ী জনগণ সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলো আর তাই পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যখন ৭১’র ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু করে ও ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনে ও পিলখানায় ই ,পি আর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ) সদর দপ্তরে হামলা চালায় তখন ঐক্যবদ্ধ ভাবে  পুলিশ ও ই ,পি. আর সদস্যরা যুদ্ধ করে  বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সাধারণ জনগণ ও সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরা অংশ নেয়  বঙ্গবন্ধু যুদ্ধের শুরুতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হলেও তার স্বাধীনতার বাণী জনগণকে স্বাধীনতার জন্য লড়াইতে অনুপ্রাণিত করে , তার যোগ্য ও দক্ষ রাজনৈতিক সহকর্মী ও বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ , ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম , প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল এম, এ, জি ওসমানী , অর্থ মন্ত্রী মনসুর আলী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ, এইচ, এম  কামরুজ্জামান  সেদিনটা যুদ্ধের সময় সফল ভাবে সরকার পরিচালনা করেন

মূলকথা: স্বাধীনতা অর্জন ও তা রক্ষার জন্য বিচক্ষণ, দক্ষ  ও সাহসী রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রয়োজন এই নেতৃত্ব শুধু একব্যক্তি নির্ভর হলে চলবে না  ইতিহাসের সেরা নেতারা সবসময় লক্ষ্য অর্জনের জন্য  যোগ্য , দক্ষ ও বিশ্বস্ত সহকর্মীদের বাছাই করেছেন  যাতে তার অবর্তমানেও নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ না হয়

বিপদ যদি আসে : বাংলাদেশের জন্য খুব দ্রুত বিপদ ধেয়ে আসছে যা আমাদের স্বাধীনতা বিপন্ন ও ক্ষমতা খর্ব করতে পারেI এই  বিষয়ে আমরা অতীতের মতো উদাসীন অথবা অজ্ঞ থাকলে চরম ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবো I দলীয় কোন্দল , ক্ষমতার দ্বন্দ্ব , ব্যাক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চক্রান্ত বাদ দিয়ে দেশ ও জাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সবার সচেতন ও ঐক্যবোধ হওয়ার সময় এসেছে  Iএই সচেতনতা শুধু টেলিভিশনের টক্ শোতে অংশ নেয়া  বুদ্ধিজীবি অথবা সংবাদপত্রে প্রকাশিত জ্ঞানগর্ভ  প্রবন্ধের গবেষকের থাকলে  চলবে না  এই সচেতনতা আসতে  হবে সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে , ঠিক যে ভাবে আমরা সচেতন হয়েছিলাম ১৯৫২,১৯৬৯ ,১৯৭০ আর ১৯৭১এ I

শুধু যোগ্য ব্যাক্তি যেন বিভিন্ন পেশায় যোগ দিতে  পারে সেই জন্য প্রতিটি  পেশায় যোগদানের আগে শিক্ষা অর্জন ,পরীক্ষায় সফল ভাবে পাশ করা ও পেশাগত লাইসেন্স অর্জনের বিধান রাখা হয়েছে   I লাইসেন্স ছাড়া কেউ চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী , বৈমানিক বা অন্য পেশাজীবী হতে পারে না , একটি গাড়ি চালাতে গেলেও ড্রাইভিং লাইসেন্স লাগে কিন্তু রাজনীতিবিদ হতে গেলে কোনো লাইসেন্স লাগেনা I যে কেউ মোহনীয় বক্তিতা আর আশ্বাস দিয়ে জনগণকে প্রভাবিত করে তাদের  ভোটে ক্ষমতায় যেতে পারে আবার নির্লজ্জ ভোট  ডাকাতি করেও যেতে পারে , কিন্তু তার পর ? জ্ঞান, প্রশিক্ষণ আর পেশাগত লাইসেন্স   অর্জন  না করে কেউ যদি বিমান বাংলাদেশের বিমানের ককপিটে আরোহন করে বলে আসেন , আপনাদের আমি নিরাপদে লন্ডন পৌছিয়ে দেব , আপনি কি সেই  বিমানের যাত্রী হবেন ? নিশ্চই হবেন না কারণ আপনি তার মুখের কথা  বিশ্বাস করবেন না , আপনি প্রমান চাইবেন ওই বিমান চালানোর যোগ্যতা সেই ব্যাক্তির আছে কিনা ? তাহলে কোন পরীক্ষার ভিত্তিতে আপনি দেশ চালানোর জন্য একজন রাজনীতিবিদ কে নির্বাচন করেন? বক্তিতা দেয়ার ক্ষমতা ? পারিবারিক পরিচয় ? অর্থ প্রতিপত্তি  না তার দলের পেশী শক্তি ?

ঢাকায় হারিয়ে যাওয়া পুর্তগিজ

একটা দেশ চালনা করা সবচেয়ে কঠিন বিষয় I এটি একজনের কাজ নয়,  এর জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন বিষয়ে অগাধ  জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন দূরদর্শী পরিষদবর্গের যারা কখনো দেশের মন্ত্রী কখনো শুধু পরামর্শদাতা I  যিনি সরকার প্রধান তার পক্ষে সর্ব বিষয়ে জ্ঞানী হওয়া সম্ভব নয় , কেউ তা হয় না  কিন্তু সফল সরকার প্রধান জানেন কে দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে তাকে সঠিক পরামর্শ প্রদানে সক্ষম আর তাকেই তিনি দেশের কাজে নিয়োজিত করেন I

আগামী দিনের কঠিন চ্যালেঞ্জ যদি মোকাবেলা করতে হয় তাহলে বাংলাদেশকে অবশ্যই গতানুগতিক , অকার্যকর ও ক্ষতিকর  রাজনীতির ধারা থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক ও যুগোপযোগী রাজনীতির সূচনা করতে হবে  I আমার মতে বাংলাদেশের ‘নব রাজনৈতিক ধারা ” শুরুর জন্য নিচের পদক্ষেপ গুলো নেয়া প্রয়োজন :

জনগণের মাঝে রাজনৈতিক শিক্ষার প্রসার: রাষ্ট্র পরিচালনা, এর উন্নয়ন ও এর প্রতিরক্ষার   জন্য যত ধরণের তথ্য ও জ্ঞানের প্রয়োজন তা অনলাইন পাঠাগারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া I

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম পরিবর্তন:  বাংলাদেশের মহাবিদ্যালয় ও বিশ্বাবিদ্যালয় গুলোর রাষ্ট্রবিজ্ঞান এর পাঠ্যক্রম সেকেলে ও অনেক ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক I  এই পাঠ্যক্রমের আমূল সংস্কার করে যুগোপযোগী ও আধুনিক করা প্রয়োজন I

রাজনীতিবিদদের প্রশিক্ষণ :যারা সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নিয়ে কোনো রাজনৈতিক  দলের বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত হতে চান বা স্থানীয়  সরকার বা রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নিতে চান যেমন সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী তাদের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনা, এর উন্নয়ন ও এর প্রতিরক্ষার পাশাপাশি বিশ্বের ও বিশেষ করে  আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর  সমকালীন রাজনীতি এবং বাংলাদেশের উপর তার প্রভাবের বিষয়ে জ্ঞান অর্জন ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন I

পরিশেষে: বর্তমানে আমরা  রাজনীতির জ্ঞান  চর্চা বলে   যা করছি তা হচ্ছে রাজনৈতিক পক্ষ প্রতিপক্ষের বাদানুবাদ বা  তর্কাতর্কি ,  কিন্তু আগামীতে আমরা সবাই কি ভাবে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখবো সে বিষয়ে আমাদের কোনো রাষ্ট্রনীতি বা  রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে আমরা আলোচনা ও ঐক্যমতে পৌঁছাতে  ব্যর্থ  I আমরা বিভিন্ন সামাজিক , অর্থনৈতিক  ও ধর্মীয় বিষয় থেকে শুরু করে সড়ক দুর্ঘটনা, হত্যা, ধর্ষণ , দ্রব্যমূল্যের হেরফের এই সব বিষয়ে আমাদের প্রতিক্রিয়া ও মতামত প্রদান কে রাজনীতি হিসেবে ধরে নিয়েছি I এই প্রতিটি বিষয় অবশ্যই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু এর বাইরে রাজনীতির বিশাল জগত আমাদের অজানা আর তার ফলে যখন রাজনৈতিক সংকট ঘটে তখন আমাদের কাছে তা অপ্রত্যাশিত বলে মনে হয় I

যেমন মিয়ানমার থেকে গণহত্যার মাধ্যমে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করে বাংলাদেশে তাড়িয়ে দেয়ার বিষয়টি আকস্মিক বলে মনে হলেও রোহিঙ্গারা দীর্ঘ দিন থেকেই নির্যাতিত হচ্ছিলো I আমরা কখনো ভাবিনি যে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা যদি একদিন রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা শুরু করে তাহলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা কি ভাবে বিঘ্নিত হবে ও আমরা কি ব্যবস্থা গ্রহণ করবো ?

ইস্ট ইন্ডিয়ান কোম্পানী

কোনো রাজনৈতিক সংকট শুরু হওয়ার আগে তা উপলব্ধি  ও সনাক্ত  করা ও এর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ  করার ক্ষমতা রাজনৈতিক জ্ঞান ও সচেতনতার উপর নির্ভরশীল I আমার জানা মতে আমাদের টেলিভিশন চ্যানেল গুলোর  জনপ্রিয় টক্ শো’র কোনোটিতেই  রোহিঙ্গা সংকট শুরু হওয়ার আগে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা, তাদের রাজনীতি , তাদের সামরিক শক্তি এবং তাদেরকে রাজনৈতিক ও সামরিক ভাবে মোকাবেলার সম্ভাবনা ও তার সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি I মিয়ানমারের ব্যাপক সামরিক শক্তি ও এর সাথে ইস্রায়েল ও চীনের বিশেষ সম্পর্কের বিষয়টি আমার প্রথম নজরে আসে ৯০ এর দশকে যখন আমি কানাডায় আইন পেশায় নিয়োজিত I কানাডার ইমিগ্রেশন ও রিফুজি বোর্ডের সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারে একটি শরণার্থী মামলা নিয়ে গবেষণা করার সময়  জেন’স ইন্টেলিজেন্স রিভিউয়ে  মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর উপর তথ্য সমৃদ্ধ প্রতিবেদন গুলো পড়ে আমার জ্ঞান ও চিন্তার দিগন্ত অনেক প্রসারিত হয় I আমার পরিচিত জনদের আমি বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার থেকে কি ধরণের বিপদ আসতে পারে সেই ব্যাপারে অবহিত করেছি কিন্তু অনেকেই বিষয়টি নিয়ে উৎসাহ দেখান নাই কারণ তাদের মনে হয়েছে তার চেয়ে দেশের চলমান ও রাজনৈতিক ঘটনাবলী নিয়ে আলোচনা আরো রোমাঞ্চকর, উত্তেজনাকর ও আনন্দদায়ক I

এবার আশা যাক সাম্প্রতিক একটি বিষয়ে I ভারত আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র , ১৯৭১ সন থেকে ভারতের জনগণ ও সরকার গুলোর সাথে আমাদের সুসম্পর্ক বিদ্যমান  I যে চীন আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিরোধিতা করেছে সেও আজ আমাদের বন্ধু , কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে এরা কেউ আমাদের পাশে শক্ত ভাবে দাঁড়ায় নাই ও সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের উপর চাপ দেয় নাই I ভারত উল্টে ভারতে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের জোর করে মিয়ানমারে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছেI  একথা বাংলাদেশের মানুষের ভুলে গেলে চলবেনা যে প্রতিটি দেশের সরকার তাদের ইচ্ছামতো ও তাদের স্বার্থরক্ষাকারী রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করবে I তাদের অবস্থান কখনো কখনো বাংলাদেশের জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে কিন্তু আমাদের মাথা ঠান্ডা রেখে কৌশলী হয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে  I ভারতের নতুন নাগরিকত্ব বিল আমাদের জন্য ব্যাপক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে I আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে কোনো অবস্থাতেই এই বিলের ক্ষতিকর প্রভাব বা প্রতিক্রিয়া হিসেবে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ঐক্য নষ্ট না হয়  I

বাংলাদেশের স্বার্থে আমরা সকল বাংলাদেশী (বাঙালি ও অন্য জাতিসত্তা) আমাদের, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও  সংস্কৃতি নির্বিশেষে , দেশের যে কোনো সংকট যেন রাজনৈতিক  ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় সফল ভাবে নিরসন করতে পারি I  আসুন আমরা অতন্দ্র প্রহরীর মতো আমাদের স্বাধীনতার অনির্বান শিখা  প্রহরা দেই I(শেষ)

 লেখক: বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান আইন আদালত  (১৯৮৩ -১৯৮৭) এর উপস্থাপক , প্রখ্যাত  ব্যারিস্টার এন্ড সলিসিটার, কানাডা   

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]