আত্মবিস্মৃত জাতির বিপন্ন স্বাধীনতা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রেজাউর রহমান

এক.

(অটোয়া থেকে): পরাধীনতার শৃঙ্খল  ভেঙে স্বাধীনতা  অর্জন যে কত গৌরবময় , কত তীব্র আনন্দের , কত  মোহময় তা আমি জেনেছি  স্বাধীনতা যুদ্ধের নয় মাস মৃত্যুর মুখোমুখি কোন ভাবে বেঁচে থেকে I আমি দেখেছি ৭১’র ১৬ ডিসেম্বর   অপরাজেয় বাঙালি জাতির স্বাধীনতা অর্জন আর স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্ত  I  আমাদের মুক্তি এসেছিলো  লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আর আরো লক্ষ মানুষের অবর্ণনীয় নির্যাতন ভোগ আর ত্যাগের বিনিময়ে  I

আজকের দেশপ্রেমিক প্রজন্ম, যারা  আমাদের স্বাধীনতা রক্ষায় দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ তারা আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বাধীনতা যুদ্ধের কাহিনী জানে ইতিহাস পড়ে , কিন্তু ইতিহাসে সব সত্য থাকে না , থাকেনা সব ঘটনার পূর্ণ বিবরণ I  আমরা একটি জাতির সার্বিক ত্যাগস্বীকার কে সংখ্যায় প্রকাশ করি, যেমন আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লক্ষ্ শহীদ আর ২ লক্ষ্ মা বোনের  সম্ভ্রমহানী কিন্তু আমরা প্রতিটি শহীদের অপরিসীম ত্যাগের কাহিনী, তাদের পরিবারবর্গের জীবনাশ্রয়ী দুঃখের কথা জানিনা , আমরা জানিনা সেই বীরাঙ্গনাদের নাম ও পরিচয় যাদের প্রতি অন্যায়ের বিচার আমরা কখনো করতে পারি

নাই , যাদের কে আমরা দু’হাত বাড়িয়ে আপনজন হিসেবে সমাজে স্থান দেই নাই I  আমরা তাদের কাছে টানি নাই তাই তারা সমাজে অপাংতেয় হওয়ার ভয়ে নিজের দুঃখের ভার নিজেই বহন করেছে I আমরা তাদের সংখ্যা বলেছি , কারো কারো পরিচয় হঠাৎ প্রকাশিত হয়েছে আর একজন অসীম সাহসিনী  দীর্ঘদিন আমাদের উদাসীনতার   যাতনা সহ্য করে একদিন নিজেই জনসমক্ষে বললেন তিনি বীরঙ্গনা হিসাবে কি অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেছেন I তিনি আমার পরম প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় ফেরদৌসী প্রিয়দর্শিনী, যিনি অনেক আগে সেই বাংলাদেশ টেলিভিশনে আমার “আইন আদালত ” অনুষ্ঠান করার দিনগুলোতে তার ৭১’র এর ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন  আর চোখের পানি ফেলেছিলেন  I তখনও  তিনি প্রকাশ্যে  তার কথা সবাইকে বলতে পারেন নাই , প্রতিকূল সামাজিক ও রাজনৌতিক কারণে তাকে সব গোপন রাখতে হচ্ছিলো  I তার কথা শুনে কেঁদেছি , অসীম বেদনায়  ক্ষত  বিক্ষত হয়েছি,  আর মনে হয়েছে স্বাধীনতার মূল্য আমরা কখনোই পুরপুরি বুঝবোনা যদি  প্রতিটি মানুষের ত্যাগ ও বেদনা আমাদের অজ্ঞাত থাকে I

৬৯; এর ১৮ ফেব্রুয়ারী পাকিস্তানী সৈন্যরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও আমার চাচা ডক্টর শামসুজ্জোহাকে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে নৃশংস ভাবে হত্যা করে I  পাকিস্তানী সৈন্যদের হুমকি উপেক্ষা করে নির্ভিক ভাবে ছাত্রদের রক্ষা করতে যেয়ে তিনি শহীদ হন  I তার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ কারফিউ ভেঙে ও পাকিস্তানী মিলিটারির হামলা উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে আসে  I গণ অভ্যূথানে ভীত পাকিস্তানি সরকার ২১ ফেব্রুয়ারী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে ও ২২ ফেব্রুয়ারী  বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান কে মুক্তি দেয়  I ২৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট আয়ুব খান পদত্যাগ করে   I চাচার হত্যাকান্ড তার  ও আমাদের পরিবারে যে কি  অতলান্ত ও অসহনীয় বেদনার সৃষ্টি করেছ তা কোনোদিন মুছে যাওয়ার নয় , এই বেদনার কথা দেশবাসী জানেনা ঠিক যে ভাবে জানেনা আরো লক্ষ্ শহীদের কথা I  একসময়ে প্রতি বছর ১৮ ফেব্রুয়ারী তার স্মরণে সংবাদ পত্রে অনেক লেখা ও ছবি ছাপা  হতো , আজ আর তেমন হয় না , কালে কালে অনেক শহীদের স্মৃতি অনেক সংগ্রামী মানুষের কাহিনী আমাদের মন থেকে মুছে যাবে, থাকবে শুধু কিছু শহীদের কথা , কিছু মুক্তিযোদ্ধার বীরত্ব ও ত্যাগের কাহিনী কিন্তু আমাদের স্বাধীনতার জন্য বাঙালি জাতি কি বিশাল ত্যাগ শিকার করেছে তা সম্পূর্ণ  ভাবে উপলব্ধি না করলে আমরা স্বাধীনতা রক্ষার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, নিবেদিতপ্রাণ ও শক্তিশালী  হতে পারবো না

আজকের এই লেখার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে  আমাদের অতীতে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপুর জাতীয় ঘটনাগুলির পটভূমি ও তার কারণ এখনো কেন প্রাসঙ্গিক ও অর্থবহ তার বিশ্লেষণ I  বাংলাদেশের ক্ষমতা বৃদ্ধি ও এর স্বাধীনতা রক্ষার অন্যতম বাধা হচ্ছে আমাদের আত্মবিস্মৃতি ও আমাদের ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ ও চুলচেরা বিশ্লেষণে অনীহা ও ব্যার্থতা I

পলাশীর যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা হারানোর বিষয়টি আমাকে প্রায়ই ভাবাতো  I  স্কুল জীবনেই এই বিষয়ে পড়া শোনা করতাম I  ১৯৮৯ -৯০ তে বাংলাদেশ টেলিভিশনে “জনতার সামনে ” নামে বাংলাদেশের প্রথম রাজনীতি বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানের (সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে  এই অনুষ্ঠান আর প্রচারিত হয়নি ) প্রতিবেদন তৈরির জন্য আমি মুর্শিদাবাদ যাই  I আমি তখনও  জানতাম না আমার জন্য কি বিস্ময়কর ইতিহাস  অপেক্ষা করছে ! পলাশীর আম্রকানন , যেখানে ১৭৫৭ সনের ২৩ জুন যুদ্ধ হয়েছে সেখানে তখনও  ব্রিটিশদের স্থাপিত পলাশী যুদ্ধের বিজয় স্তম্ভ সগর্বে টিকে আছে কিন্তু বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদৌল্লা , তার বিশ্বস্ত সেনাপতি মিরমদন আর মোহনলালের নামে কোনো স্মৃতি ফলক নেই ! পলাশীর যুদ্ধ হয়েছে আজ থেকে ২৬২ বছর আগে  , এই যুদ্ধের পরে বৃটিশরা ভারতবর্ষ শাসন করেছে ১৯০ বছর সুতরাং সেই সময়ে ব্রিটিশদের তথাকথিত বীরত্বের প্রতীক হিসেবে তাদের বিজয় স্তম্ভ পলাশীর প্রান্তরে মাথা উঁচু করে থাকবে সেটাই স্বাভাবিক কিন্তু স্বাধীন ভারত ৭২ বছরে পা দিয়েও কেন আজ পর্যন্ত সরকারি ভাবে তার মুক্তিকামী . দেশপ্রেমিক সন্তানদের আত্মদানের স্মরণে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন না করে অবনত মস্তকে ও সম্মানের সঙ্গে  স্বাধীনতা হরণকারী , আগ্রাসক ব্রিটিশদের আগ্রাসনের বিজয় চিহ্নকে  স্বীকৃতি দিচ্ছে তার কোনো যুক্তি সঙ্গত ব্যাখ্যা আমি পাইনি I

২০০৭ এর ২৩ জুন পলাশী যুদ্ধের ২৫০ তম বার্ষিকীতে সরকারি নয় বেসরকারি উদ্যোগে পলাশীতে ব্রিটিশ বিজয়স্তভের সামনে নওয়াব সিরাজুদ্দৌলার একটি আবক্ষ মূর্তি সম্বলিত স্বারক  স্তম্ভ স্থাপন করে “বাংলাদেশ  ভারত পাকিস্তান পিপল’স ফোরাম ” নামে একটি  সংগঠন I এর উদ্বোধন  করে সাংসদ দেবব্রত বিশ্বাস ও বিধায়ক হরিপদ বিশ্বাস I এই উদ্দোগ প্রশংসনীয় কিন্তু স্মারক স্তম্ভের ত্রূটি  লক্ষণীয়,  প্রথমত , সিরাজুদৌলার মূর্তির সাথে তার ঐতিহাসিক চিত্রের কোনো মিল নেই , দ্বিতীয়ত তার পরিচয় দেয়া হয়েছে “বিদেশী বেনিয়া বশ্যতা বিরোধী জোহাদি (এই ভাবে লেখা) নায়ক ”  I  বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে জেহাদি শব্দটি অহেতুক বিভ্রান্তি ও বিভাজন সৃষ্টি করবে তার চেয়ে “বিদেশী বেনিয়া বশ্যতা বিরোধী দেশনায়ক ” বা অন্য কোনো যথার্থ বিভূষণে ভূষিত করলে ভালো হতো I

বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষার কথা ভাবতে হলে পলাশীর যুদ্ধ আর ১৮৫৭ সনের সিপাহী বিপ্লব নিয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে I  যে কারণে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও তার বিশাল সৈন্য বাহিনীর পরাজয় ঘটেছিলো ও ১৮৫৭ সনে সিপাহী বিপ্লব বার্থ হয়ে ছিল , যে রাজনৈতিক চেতনার অভাব, অনৈক্য, বিদেশী শক্তির স্বার্থ রক্ষায় দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার প্রলোভন ও প্রবণতা বাংলার তৎকালীন অধিবাসীর মধ্যে ছিল সেই মূল কারণ আজও আমাদের মাঝে বিদ্যমান I

মনে রাখতে হবে ১৭৫৭ সনে আমরা ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে হেরে যায়নি আমরা হেরেছি ব্রিটেনের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে যুদ্ধ করে I  তার মানে সেই সময়ে সমগ্র ভারতবর্ষে এবং বিশেষ করে বাংলা প্রদেশে জনগণের মধ্যে  অন্তর্দ্বন্দ্ব ও অনৈক্য এতো ব্যাপক ও গভীর ছিল যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করার পাশাপাশি  প্রথমে বাংলা দখল ও পরে সমগ্র ভারতবর্ষ তাদের দখলে নিয়ে আসে I আমরা পলাশীর যুদ্ধে হেরে যাওয়ার কারণ হিসেবে নবাবের প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খান (মীরজাফর) আর তার সহযোগী রায়দুর্লভ , জগৎশেঠ , উমিচাঁদ ও অন্যানদের ষড়যন্ত্রের কথা বলি আর দুঃখ করি কিন্তু এর বাইরেও আরো কিছু কারণ আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায় I  প্রথমত সেই সময়ে বাংলার মানুষের মধ্যে না বাঙালি জাতীয়তাবাদ না সার্বজনীন ভারতীয় জাতীয়তাবাদের কোনো চেতনা ও তার বহিঃপ্রকাশ ছিল I  সাধারণ মানুষ এই যুদ্ধ সম্পর্কে খুবই উদাসীন ছিল I  তাদের কাছে পুরো বিষয়টি  এক শাসক ও তার অনুগত  সুবিধাভোগি অভিজাত শ্রেণীর সঙ্গে আরেক উদীয়মান বিদেশী শাসকের যুদ্ধ ছাড়া কিছু ছিল না  I   সেই সময়ে বাঙালিরা এই যুদ্ধ কে তাদের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ হিসেবে দেখে নাই I

বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য যে নবাব যুদ্ধ করলো, প্রাণ দিলো তাকে সেই সময়ের বাংলার অধিবাসীরা বাঙালি জাতির প্রতিনিধি হিসেবে দেখেনি দেখেছে ফার্সিভাষী , ইরানি বংশোদ্ভূত আর এক নবাব হিসেবে  যার রাজত্বের অবসান হলে আর এক অবাঙালি নবাব ক্ষমতায় আরোহন করবে  এবং তাতে সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে বাংলার জনগণ এবং আরো নির্দিষ্ট করে সেই সময়ের বাংলাভাষী জনগণের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবেনা I  সেই সময়ে বাংলার অধিবাসীদের সবাই বাঙালি ছিলোনা , ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ ব্যবসা, বাণিজ্য, চাকুরী আর নবাবের সৈন্যবাহিনীতে যোগ দেয়ার কারণে বাংলায় বসতি গড়েছিল তখন সিরাজুদ্দৌলা বাংলার নবাব ছিলেন , কিন্তু তিনি শুধু বাঙালির নবাব ছিলেন না তিনি বাংলার অধিবাসী সকল ভাষাভাষীর নবাব ছিলেন তাই তাকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতিসত্তার কোনো উন্মেষ ঘটেনি আর সেই সময়ের বাঙালিরা তার যুদ্ধকে বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধ হিসাবে ভাবেনি I

পলাশীর যুদ্ধ নিয়ে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রজতকান্ত রায় লিখেছেন “মোগল শাসক, অবাঙালি বণিক ও হিন্দু জমিদার শ্রেনীর মধ্যে থেকে উদ্ভুত ষড়যন্ত্রের কলকাঠিতে  রাষ্ট্রবিপ্লব ঘটে গেলো . রাষ্ট্রশক্তির বহির্ভুত  সাধারণ লোকে তা নিতান্ত নিরুৎসুকভাবে তাকিয়ে দেখে আবার নিজের নিজের কাজে মন দিলো – চাষা লাঙ্গল ধরতে গেলো , ফড়িয়া ফিরি করতে বেরোলো . পোতদার  কড়ি বিছিয়ে বসলো , বোকা জোলাকে নিয়ে হাটের লোকে তাদের অভ্যস্ত  রসিকতা করতে লাগলো  I এ সমস্ত কাজের ভিত্তি যে নড়ে গিয়ে জনজীবনে বিপুল বিপর্যয় দোরে এসে হাজির হয়েছে , সে বোধশক্তি মনসবদার জমিদার সওদাগরের ছিল না , জনতার কথা থেকে আসবে ?”(পলাশীর ষড়যন্ত্র  ও সেকালের সমাজ , রজতকান্ত রায় ,২০০৮,  প্রকাশক , আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা,  পৃ:২৪৬ )

আজকের বাঙালি জাতি আর সেই সময়ের বাঙালি জনগোষ্ঠী এক নয়  I পলাশীর  যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা হারানোর পর ক্রমান্বয়ে পরবর্তী বাঙালি প্রজন্ম নবাব সিরাজুদ্দৌলার বীরত্ব , বাংলার স্বাধীনতা রক্ষায় তার আন্তরিক প্রয়াস ও তার বিয়োগান্তক পরিণতির কাহিনী শুনতে শুনতে তাকে বাঙালি হিসাবে ভাবতে শুরু করলো , নাটক ,গল্প , প্রবন্ধ বিশেষ করে ১৯৬৭ সালে নির্মিত “সিরাজুদৌলা ” চলচ্চিত্রে খ্যাতিমান ও শক্তিশালী অভিনেতা আনোয়ার হোসেন এর অভিনয় দেখে বাঙালি তার মাঝেই নবাব সিরাজুদৌলা কে প্রত্যক্ষ করলো,  তাকে আরো গভীর ভাবে ভালোবাসলো I  পলাশীর যুদ্ধের সময় তখন নবাবের প্রতি  যে সহমর্মিতা , সমর্থন,  আর  ভালোবাসা বাঙালি দেখাতে  পারেনি পলাশী যুদ্ধের বহু বছর পর থেকে আজ অবধি বাঙালি তা প্রকাশ করছে I

পলাশীর যুদ্ধ থেকে আজকের বাংলাদেশ যে শিক্ষা নিতে পারে তার সারসংক্ষেপ হচ্ছে :

১. স্বাধীনতার পূর্বশর্ত জাতিসত্তার উন্মেষ : ভাষা ও সংস্কৃতি, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট , ধর্ম বা অঞ্চল ভিত্তিক জাতিসত্তার উন্মেষ ব্যাতিত একটি বিশা

পলাশীর প্রান্তর

ল জনগোষ্ঠীর  স্বাধীন জাতি হিসেবে উত্তরন ঘটেনা I পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজুদ্দৌলার পরাজয়ের ফলে তাৎক্ষণিক ভাবে রাজভাষা হিসেবে ফার্সির অবসান না ঘটলেও , পরবর্তীতে ইংরেজি রাজভাষার মর্যাদা লাভ করে   কিন্তু বাংলা ভাষা ও বাংলা সংস্কৃতির কোনো গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়নি I বাঙালি নিজেকে পৃথক জাতি হিসেবে চিন্তা করার বদলে ধর্ম ভিত্তিক জাতি হিসেবে চিন্তা করেছে ,কেউ ভেবেছে সে মুসলমান ,কেউ হিন্দু , কেউ বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান I

 ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭  অনেক বিদ্রোহ ও আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে যার   লক্ষ্য ছিল কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্টির বিরুদ্ধে বৃটিশ শোষণের অবসান এবং সামগ্রিক ভাবে ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসন এর  অবসান কিন্তু এর কোনোটাই ঠিক বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পরিচালিত হয়নি I যেমন কৃষক বিদ্রোহ, ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ , নীল বিদ্রোহ , সাঁওতাল বিদ্রোহ ,ফারায়েজ এবং ওহাবী আন্দোলন এবং শেষ অবধি ১৯৪৭ সনে  বৃটিশ শাসনের অবসানে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম হলো কিন্তু বাঙালির স্বাধীনতা এলোনা , কারণ তখনও বাঙালি তার বাঙালি জাতিসত্তার  উর্ধে তার ধর্মীয় পরিচয়টি তার জাতিসত্তা হিসেবে গ্রহণ করেছে I পাকিস্তান সৃষ্টির স্বল্প সময়ের মধ্যেই পাকিস্তানের  বাঙালিরা উপলব্ধি করলো যে তারা সংখ্যাগরিষ্ট ও একই ধর্মের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও শুধু বাঙালি জাতীয়তার কারণে সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে চলেছে I

পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী প্রথম আঘাত হানলো বাংলা ভাষার উপর , পাকিস্তানের জাতির পিতা মুহম্মদ আলী জিন্নাহ যখন উর্দুকে  পাকিস্তানের একমাত্র জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিলো এবং বাংলা কে সমমর্যাদা দিতে অস্বীকার করলো তখন বাঙালিরা সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে অস্বীকার করে I  ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত ১৯০ বছরে বাঙালি তার জাতীয়তা নিয়ে যে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি , মাত্র একবছরে অর্থাৎ ১৯৪৮ সনে সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার উর্ধে তার ভাষা ও সংস্কৃতি ভিত্তিক জাতীয়তাকে  স্থান দিলো I  বাঙালি উপলব্ধি করলো তার ধর্ম বিশ্বাস যাই হোক না কেন তার সাথে তার বাঙালি জাতীয়তার কোনো বিরোধ নেই  I পাকিস্তানের বাঙালিরা বুঝলো যে মুসলমান হিসাবে একটি স্বাধীন ইসলামী প্রজাতন্ত্রের নাগরিক হওয়ার পর তাদের চূড়ান্ত স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে বাঙালি জাতি হিসেবে I

বাঙালির ভাষা আন্দোলন , ১৯৫২ সনে ভাষার জন্য আত্মদান এবং পরবর্তীতে বাঙালি জাতির উপর পাকিস্তানিদের অবর্ণনীয় শোষণ ও অত্যাচার বাঙালি কে আরো বেশি স্বাধীনতামুখী করে তুললো I আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম নির্ভিক, নিবেদিত প্রাণ নেতা ,

পলাশীর যুদ্ধ

কর্মী ও সাধারণ মানুষের ত্যাগের ইতিহাস কিন্তু তার মধ্যে যিনি শ্রেষ্ঠ, চির উজ্জ্বল , চির অম্লান ,  যিনি  দীর্ঘ কারাজীবন ভোগ করেও শাসকের কাছে মাথা নত  করেন নাই ,যার অননুকরণীয় নেতৃত্ব আর ত্যাগ এর মোহনীয় কাহিনী শতাব্দির পর শতাব্দী বাঙালি তার সন্তানদের শোনাবে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ  মুজিবুর রহমান , আপদমস্তকে , অন্তরে বাহিরে যিনি ছিলেন বাঙালি জাতিসত্তার প্রতীক I ইতিহাসে তার নাম লেখা থাকবে স্বাধীন বাঙালি জাতির পিতা ও স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে I  তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সফল ভাবে পরাধীন বাঙালি  জাতিকে উজ্জীবিত ও সংগঠিত করে স্বাধীনতার বিজয়মাল্য ছিনিয়ে নিয়েছেন I

মূলকথা: ১৯৪৭ এর পরে বাঙালি যখন তার জাতিসত্তা চূড়ান্ত ভাবে সনাক্ত করেছে  এবং সেই জাতি সত্তার ভিত্তেতে স্বাধিকার ও পরবর্তীতে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সংগ্রাম ও যুদ্ধ করেছে তখন তারা হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে পেরেছে I

২. সবাই স্বাধীনতা চায়না: পরাধীন জাতির একাংশকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিয়ে শাসকগোষ্ঠী তাদের ক্ষমতার ভীত শক্ত করে I এই সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তখন স্বজাতির স্বাধীনতাকামী মানুষদের উপর শাসকের পক্ষে অত্যাচার চালিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলকে দমন বা ব্যর্থ করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালায় I  নবাব সিরাজুদৌল্লা যখন বিদেশী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখন মীর জাফর ও তার সঙ্গীরা কোনো আত্মগ্লানি ছাড়াই ব্রিটিশদের হাতে বাংলার স্বাধীনতা তুলে দেয়ার ষড়যন্ত্র করেছে I  পলাশীর যুদ্ধে নবাবের পক্ষে প্রায় ৩৫০০০ পদাতিক সৈন্য ও    ১৫০০০ অশ্বারোহী সৈন্য উপস্থিত  ছিল আর এদের বিপরীতে , ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে ছিল ৭৮৪ বৃটিশ সৈন্য , ২ ,১০০ ভারতীয় সৈন্য, ও ১২টি কামান I যুদ্ধের সময় নবাবের প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আর সেনাপতি রায়দুর্লভ তাদের অধীনে থাকা প্রায় ৩৩ হাজার সৈন্যকে নিষ্ক্রিয় করে রাখে I যুদ্ধে নবাবের একমাত্র বিশ্বস্ত সেনাপতি মোহনলাল বীরত্বের সাথে যুদ্ধরত অবস্থায় নিহত হলে নবাবের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে I নবাবের পরাজয় আসন্ন দেখে তার সৈন্য বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়  I সকাল ৮ টায় শুরু হওয়া যুদ্ধ ৫টার  মধ্যেই নবাবের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় I

মূলকথা: বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর সমর্থক   বেশ কিছু সুবিধাভোগী বাঙালি ব্যাক্তিগত ও  দলগত ভাবে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে I স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ইসলাম ও পাকিস্তান রক্ষার দোহাই দিয়ে  বাঙালিদের মধ্যেই অনেকে রাজাকার  বাহিনী, জামাত, আলবদর ও আলশামশের সদস্য হিসেবে  পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর গণহত্যা , ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটে সরাসরি অংশ নিয়েছে এমনকি বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের নৃশংস ভাবে হত্যা করে বাঙালির জাতিকে মেধাশূন্য করতে চেয়েছে  I (চলবে)

লেখক: বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান আইন আদালত  (১৯৮৩ -১৯৮৭) এর উপস্থাপক , প্রখ্যাত  ব্যারিস্টার এন্ড সলিসিটার, কানাডা 

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]