আনন্দ-বেদনার আসা যাওয়াতেই জীবন

গান লেখার গল্প। গীতিকার হবার উপাখ্যান।সে গল্পও মন্দ নয়।কেবল তাকে পেছনে ফেরানো। ফিরেতাকালে মনে হবে খুলে গেছে আস্ত এক জাদুর বাক্স।উনিশ বছর পূর্তিতে ভাবলাম গান লেখার গল্প হোককিছু। ইদানিং অনুজ গীতিকারদের জানতে চাওয়া কিছু প্রশ্নের উত্তরও হয়তো এসে যাবে আলগোছে।এভাবেই আমাদের প্রাণে বাংলায় শুরু করলেন গীতিকার শেখ রানাতার গান লেখার গল্প

শেখ রানা

শেখ রানা

(গোর্গি রোড,এডিনবরা, স্কটল্যান্ড থেকে): জীবনের মানে না খুঁজে জীবনকে একটা সুন্দর মানে দেয়া দারুণ ব্যাপার।

সেই দারুণ ব্যাপারটা কেউ যদি শান্ত হয়ে কথায়, সুরে জড়িয়ে রাখতে পারেন- তাঁর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে। একজন গীতিকবি সেই সুন্দরতম কাজটা করেন সযত্নে।

বাংলাদেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি খুব মজার একটা জায়গা। নেই নেই করেও অনেক দিন হয়ে গেল। কিন্তু এখনও পেশাদারিত্বের সঠিক বেশভুষা গায়ে উঠলো না তাঁর। সেই মলিন পোষাকের ভারে জুবুথুবু হয়ে পথ চলে গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত আয়োজক আর এমনকি শিল্পী স্বয়ং। এই নিয়ে কথা বলব বিশদ। পরে, একদিন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে। সেই অভিজ্ঞতা দুঃখের এবং হতাশার। মুখ বদলে মুখোশ হবার গল্প। অনুগল্প। আজ গীতিকারের গল্পে ফিরি।

গীতিকার হব বলে কোনো কিছু না ভেবে, ক্যারিয়ার এর কথা চিন্তা না করে কবিতার বই আর ঝোলা কাঁধে বেরিয়ে পড়েছিলাম আমি। সেটা আদতে কোনো কাজের কথা না বাংলাদেশে। অর্থ-ই যেখানে মুল মাপকাঠি হয় নাগরিক ধারাপাতের জীবনে, সেখানে একজন গীতিকার বা কবির জন্য যে জিজ্ঞাসা অপেক্ষা করে থাকে তা হলো- ‘ আচ্ছা, আপনি গীতিকার! আর কি করেন?

আমি এই প্রশ্ন এত বেশিবার শুনেছি যে এখন হাসি পায় সেসব মনে করলে। আমি হাসি। মানুষকে ভালোবেসে হাসি। অতি দুঃখের দিনে যারা পাশ ছেড়ে আমার আর কিছু হবে না বলে চলে গেছেন তাদের জন্য যেমন, অনেক আশ্বাস দিয়ে এখন ভুলে যাওয়া বন্ধুকেও আমি তেমনভাবেই ভালোবাসি। এই আক্ষেপ ভুলে থাকার অভ্যাস আমাকে ঋদ্ধ করে লেখায়। আমি অবারিত ভাবতে পারি। ভালোবাসার শব্দচয়ন অথবা নাগরিক দৃশ্যকল্প-ও ধরতে পারি নিজের মত করে। এটা পরম পাওয়া।

একজন গীতিকার সুন্দর ধরেন। শব্দে এবং ভাবনায়। সেই ভাবনার ঘুলঘুলিতে শব্দপাখির দল থাকলেই সৌরভ, আক্ষেপ আর পরচর্চার কদর্যতা থাকলেই অন্ধকার।

আমি খুব বিশ্বাস করি, একজন গীতিকবি মন ও মননে সুন্দর হবেন, আশাবাদী হবেন। আশার কথা বলবেন বন্ধুকে। তাঁর শব্দচয়ন শুনে মানুষ ভিড় ঠেলে সামনে আসার কথা ভাববে যেমন তেমনি ধূলো পরা চিঠি আর এক কাপ চা নিয়ে একাকী বসে স্মৃতিকাতর হবেন। এক রাতে, একা। নিজের মত করে।

আমার গীতিকার জীবন আনন্দ আর বেদনার কাব্যে টইটুম্বর। এই পথচলায় যারা আমাকে দুঃখ দিয়েছেন তাদের জন্য শুভাশিষ। সেই দুঃখবোধ আমি আমার মত বদলে ফেলে লিরিক লিখেছি। কিন্তু মনে রেখেছি যারা আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন, প্রেরণা দিয়েছেন কাজ করে যাওয়ার, অনেক গান লিখে যাওয়ার। সামনের পর্বগুলোতে তাদের কথা বলব এক এক করে।

মানুষের জীবন তো এক বাঁকে আটকে থাকে না। বদলে যায় একটু একটু করে। ভাবনা বদলায়, বোধ বদলায়, শব্দচয়নও বদলায়। আমিও বদলেছি। তারুন্যে কাউকে পরোয়া না করার যে মানসিকতা ছিল, তা এই মধ্য বয়সে এসে আমাকে জানিয়েছে জীবনে প্রজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। জীবনের জন্য। লেখালেখির জন্য। গীতিকাব্যের জন্য।

একজন গীতিকার শত দুঃখে, শত বঞ্চনায় অটল থাকবেন। নিজস্ব ভাঙ্গা-গড়ার শব্দ টের পাবে না কেউ। অনেক বিষাদে খাতা টেনে একটা আনন্দের গান লিখতে বসবেন। সেই লিরিক সুর পাবে, গান হবে। শ্রোতা গভীর আনন্দে উদ্বেল হবেন গান শুনে।

অন্তরালে হু হু বিষাদ নিয়ে গীতিকার সেই আনন্দ গায়ে মাখবেন। এই আনন্দ-বেদনার যুগপৎ আসা যাওয়াই তাঁর জীবন।

সেই জীবনটাই সুন্দর। সেই সৌন্দর্য তাঁর জীবনকে এক আশ্চর্য মানে দেয়। শব্দে আর দৃশ্যকল্পে।

ছবি: শাহানা হুদা