আনন্দ মন্ত্র

সায়ন্তন ঠাকুর (লেখক)

লবণহ্রদের রাস্তায় এখনও ততো রোদ্দুর ওঠেনি। ছায়া ছায়া আলো, বাতাসে দুলছে দেবদারু ম্যালেরিয়া-গাছের ডালপালা। বাড়িঘরে লোকজন থাকে বলে মনে হয় না, ধূ ধূ বারান্দায় জীর্ণ পাতা পড়ে আছে আনমনে। লোক থাকলেও হয়তো দু’ একজন বুড়োবুড়ি। মানুষের গলার স্বর বড় বিরল এখানে।
ঠক ঠক করে আমগাছের মোটা গুঁড়ির ওপর ঠোঁট ঘষছে কাঠঠোকরা। অনেক রকম পাখ-পাখালির আনাগোনা এদিকে। একবার সন্ধ্যেরাতে একটা পেঁচাকে গোল গোল চোখ ঘুরিয়ে ল্যাম্পপোস্টের মাথা থেকে উড়ে যেতে দেখেছিলাম।

রাস্তার দু’পাশ কী সুন্দর যত্ন করে সাজানো! এলোমেলো নিজের খেয়ালে বড় হয়ে ওঠা ঝোপঝাড় গাছের ডালপালা কেটে ছেঁটে আমাদের মাপমতো করে দেয় পুরকর্মীরা। তবুও দু’একটা অবাধ্য ঘাড়ব্যাঁকা গাছ বুনো ঝোপ থাকেই, পোষ মানে না মানুষের হাতে!
ওই যেমন দোতলা বারান্দায় থোকা থোকা মাধবীলতা ফুটেছে, লাল সাদা ফুলের জঙ্গল। পা টিপে টিপে লতা বেয়ে শুয়োপোকা কাঠপিঁপড়ের দল ওঠে আর নামে সারাদিন!

দু’একটা রিক্সা অটো অফিসের বাবু বিবিদের নিয়ে রওনা দিয়েছে। ঠাণ্ডা গাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে সওয়ারি নিয়ে। এসব কোলাহল কিছুক্ষণ মাত্র, আগুনখেকো দ্বিপ্রহর তারপর নিশুত রাতের মতোই নির্জন। রাধাচূড়ার হলুদ পাপড়ি ছাওয়া শুনশান পথ পড়ে থাকবে একপাশে।

আমিও বাস ধরবো বলে হাঁটছি। আজ খুব বাতাস বইছে চারপাশে। কী ফুল এসেছে জারুল গাছটায়! বেগুনি ছায়ার নিচে রোগা হতদরিদ্র এক কিশোরি ডাবের কাঁদি নিয়ে বসে আছে। পাশে ধুলোর ওপর হামা টানছে ন্যাংটো দামাল শিশু। নাকে সিকনি। ওই ক’টা ডাব বিক্রির টাকায় আর কী হবে ! চাল কিনে নুন কিনতেই ফুরিয়ে যাবে। তখন কী করবে ? কী আর করবে, কাঁচা তেঁতুল পাতা মেখে জল ঢেলে খাবে ভাত, টকটক স্বাদ বেশ।

হঠাৎ উল্টোদিক থেকে দেখি একজন লোক এসে দাঁড়ালেন ওই ডাবওয়ালির সামনে। হাট্টাগোট্টা গুন্ডার মতো চেহারা,একমাথা চুল,চওড়া কপাল। শক্তপোক্ত কাঁধ আর চোয়াল। পরনে এই গরমেও মোটা ধূসর খদ্দরের পাঞ্জাবি, সরু পাড়ের শান্তিপুরী ধুতি, পায়ে ক্যাম্বিসের জুতো। হন্তদন্ত ভাব বেশ একটা। একটু হেসে কিশোরীকে জিজ্ঞেস করলেন
—ডাব কত করে দিচ্চ গো খুকি ?
বেজার মুখে মেয়েটি জবাব দিল
—ছ’ আনা!
—তা বেশ! ভালো শাঁসওয়ালা দেকে একটা দাও দিকিনি! বেশ শাঁস হয় যেন!

ছ’আনা দাম শুনে চমকে উঠলাম। কবেকার কথা এসব ? এগিয়ে গিয়ে লোকটির পাশে দাঁড়ালাম, কেমন যেন চেনা চেনা, কোথায় দেখেছি, কোথায় যেন দেখেছি! আমিও জিজ্ঞেস করলাম
—ডাব কত করে ?
পরিস্কার গলায় মেয়েটি উত্তর দিল
—পনেরো টাকা, বড় গুলান কুড়ি।

কিছু বলার আগেই দেখি লোকটি খোশগল্প জুড়েছে মেয়েটির সঙ্গে। হাতে মুখ কাটা বড় ডাব একখান।
—তা খুকির ঘর কোতায় ? খোকা কে হয় গো ?
এমন সব সাধারণ গল্প। দু’জনেই হাসছে। মেয়েটা বলছে
—দিনমানে ত্যামন বিককিরি লাই গো!
লোকটি মুচকি মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলো
—এ কি তোদের গাছের ডাব খুকি ?
—গাছ কুতায় পাব বাবা! হুই মহাজনের কাচ থিকি লিয়েচি ধারে।
মেয়েটির দিকে চেয়ে আছে লোকটি। কী সজল দুটো চোখ। দু’এক মুহূর্ত পর বলছে
—চল না একবার চালকি-ব্যারাকপুর, আমার গাঁয়ে, রায়খুড়োদের কত ডাব গাচ, নোনা গাচ, পাকা আতার জঙ্গল,খাওয়ার লোক নাই, পেড়ে এনে বিককিরি করবি! নোনা খেয়েচিস খুকি কোনওদিন ?

কত কথা দু’জনের! যেন শুধু কথা দিয়েই টেনে নেবেন মেয়েটির সব যন্ত্রণা। এক হৃদয়বান পুরুষ একটি সরলমতি কিশোরী অবোধ শিশু আর কতগুলো ডাব। এই সামান্য মাত্র আয়োজন।
একটু তফাতে দাঁড়িয়ে আছে রাক্ষুসে আমার শহর।

কেমন যেন মাথাটা একটু ঘুরে উঠলো। পরমুহূর্তেই দেখি কোথায় কী! কেউই নেই।
শুধু দু’একটা জারুল ফুল খসে পড়ছে বাতাসের দোলায় ধূলার ওপর।

এগিয়ে গিয়ে মাথা নিচু করে তুলে নিলাম একটি ফুল। থাক আমার কাছে একটুকরো। ওই কুসুমরেণুর শরীরে লেগে আছে আনন্দ মন্ত্র।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে