আপনাকে দশদিনের জন্য স্বামী হিসেবে পেলে আমি ধন্য

বিভুতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯১৮ সালে রিপন কলেজ থেকে ডিসটিংশন নিয়ে বিএ পরীক্ষায় পাশ করেন। তার পরে কিছু দিন এমএ এবং ল ক্লাসে পড়েছিলেন। তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময়ে বসিরহাটের মেয়ে গৌরীদেবীর সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই রোগে ভুগে মারা যান গৌরীদেবী। বিভূতিভূষণেরও পড়াশোনায় ইতি ঘটে। হুগলির জাঙ্গিপাড়ার মাইনর স্কুলে শিক্ষকের চাকরি নেন। পরে জাঙ্গিপাড়া থেকে সোনারপুরের হরিনাভি।

সময় এগিয়ে যায় প্রায় দু’দশক। একদিন হঠাৎ হইচই পড়ে যায় ছোট্ট শহর বনগ্রামে।খবর ছড়িয়ে পড়ে, ইছামতী নদীতে স্নান করতে নেমে ডুবে গিয়েছেন বিভূতিভূষণের বোন জাহ্নবীদেবী। আর সেই খবরের সূত্র ধরেই প্রখ্যাত লেখকের ঠিকানা এসে পৌঁছায় ফরিদপুর জেলার ছয়গাঁও নিবাসী ষোড়শীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় কন্যা রমাদেবীর কাছে। বাবার দেওয়া আকাশি-নীল রঙের সোনালি ঢেউ খেলানো শাড়ি পরে বিভূতিভূষণের সঙ্গে দেখা করতে যান রমাদেবী। লেখক তখন ডুবে আছেন স্ত্রী বিয়োগের বেদনায়। ভক্ত পাঠক রমাদেবীর অটোগ্রাফ খাতায় সই করে বিভুতিভূষণ রিখে দিয়েছিলেন: ‘‘গতিই জীবন, গতির দৈন্যই মৃত্যু।’’ অতঃপর ২৯ বছর ব্যবধানের দুই মানব-মানবীর মধ্যে তৈরী হয়ে যায় বন্ধুত্বের সেতু। এই বন্ধুত্বের সূত্রে চিঠি চালাচালি।

বিভুতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

রমাদেবী ভালোবেসে ফেলেছিলেন বিভুতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সেই ভালোবাসাকে স্বীকৃতি দিতেই বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসলেন তিনি। কিন্তু তাঁর কাছে সময় চাইলেন বিভূতিভূষণ। মনে করিয়ে দিলেন গৌরীদেবীর কথা। বোঝালেন নানা ভাবে। বললেন, ‘‘আমার সাথে তোমার বয়সের অসম্ভব তফাত। তুমি না হয় ছেলেমানুষ, বুঝতে পারছো না, কিন্তু আমি একজন বয়স্ক লোক হয়ে কি করে তোমাকে ডোবাই?’’ এমনকি এ-ও বলেছিলেন, ‘‘দেখ আমার গায়ের রোমে, মাথার চুলে পাক ধরেছে।’’ কিন্তু রমাদেবী নাছোড়বান্দা। তিনি লিখলেন কথাশিল্পীকে, ‘‘আপনাকে মাত্র দশদিনের জন্য স্বামী হিসেবে পেলে আমি ধন্য।’’ ৩ ডিসেম্বর, ১৯৪০ সম্পন্ন হল সেই শুভকাজ। সাত বছর পরে জন্ম হলো পুত্র তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের (বাবলু)।

কলেজ জীবনে এমএ এবং ল ক্লাসে পড়ার সময়ে তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল নীরদচন্দ্র চৌধুরীর। তিন বছরের ছোট-বড় এই দুই সহপাঠীর ঘনিষ্ঠতার কথা সুবিদিত। নীরদচন্দ্রের ‘দাই হ্যান্ড গ্রেট অ্যানার্ক’ বইয়ে সেই বন্ধুত্বের কিছু পরিচয় পাওয়া যায়।  মূলত সাহিত্যকে কেন্দ্র করেই দু’জনের বন্ধুত্ব হয়েছিলো। নীরদচন্দ্রের বিয়ে হয়নি তখনও। অন্য দিকে গৌরীদেবীর মৃত্যুতে বিভূতিভূষণ সদা-বিচলিত। সেখানেই একই মেসের বাসিন্দা নীরদচন্দ্র ‘পথের পাঁচালী’ শেষ করার জন্য তাগাদা দিতেন বন্ধুকে। বইতে নীরদচন্দ্র লিখেছেন, ‘‘১৯২৮-এ প্রকাশিত তাঁহার প্রথম উপন্যাস তাঁহার আসন প্রতিষ্ঠিত করিয়া দিল এবং এখন ওই গ্রন্থটির সত্যজিৎ রায়-কৃত চলচ্চিত্র রূপ সারা বিশ্বে সমাদৃত হইয়াছে। ১৯২৪-এ প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা লিখিয়াই তিনি আমাকে পড়িয়া শুনাইয়াছিলেন… ১৯২৮-এ উহা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হইবার পর আমি এক প্রকাশক খুঁজিয়া পাই যিনি উহা গ্রন্থাকারে ছাপিতে সম্মত হন।’’

বিভূতিভূষণের একাকিত্বের কথাও বইতে উল্লেখ করেন নীরদচন্দ্র। প্রায় সন্ধেতেই তাঁর সঙ্গে সময় কাটাতে আসতেন বিভূতিভূষণ। বন্ধুর কাছে স্ত্রী বিয়োগের যন্ত্রণার কথা বলতেন। তবে বিভূতিভূষণের আর্থিক প্রতিকূলতার মধ্যে পড়াশোনা চালানোর ব্যাপারটা তখন জানতেন না নীরদচন্দ্র। পরে সে সব কথা জেনেছেন ‘অপরাজিত’ উপন্যাসের ভিতর দিয়ে। তাঁর কাছে তাই বিভূতিভূষণই স্বয়ং ‘অপরাজিত’। তিনি জানান, বন্ধু ছিলেন কঠোর বাস্তববাদী ও স্থিতধী। প্রবল জীবনসংগ্রাম তাঁকে তেতো করে তুলতে পারেনি। জীবন সম্পর্কে কোনও হতাশাও জাগিয়ে তোলেনি। বরং সকলের প্রতি সহানুভূতিশীল করেছিল। গড়ে তুলেছিল তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। সে কারণেই প্রকৃতি এবং মানুষের মন নিয়ে এত জটিল কাটাছেঁড়া করতে পেরেছেন বিভূতিভূষণ।

বিভুতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি

দু’জনে প্রবল বন্ধুত্ব হলেও জীবনযাপনে তফাৎ ছিল। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ বিভূতিভূষণ চিরকালই খুব সাধারণ জীবন যাপন করেছেন। এমনকি কিছুটা আয়েশ করার সঙ্গতি হওয়ার পরেও। নীরদচন্দ্র লিখেছেন, ‘‘বহু বৎসর পর, আমার বিবাহ পরবর্তীকালে, তিনি আমার স্ত্রীর সঙ্গে ভারী বন্ধুত্ব করিয়াছিলেন, তাঁহার সহিত আসিয়া পছন্দ-অপছন্দের গল্প করিতেন। কিন্তু বৈঠকখানায় না বসিয়া তিনি নির্বিকার, শান্তভাবে বিড়ি টানিতে টানিতে সোজা তাঁহার শয়ন কক্ষে চলিয়া যাইতেন এবং সূচী-শিল্প করা চাদরের উপর বসিয়া, দুর্গন্ধময় নিম্ন মধ্যবিত্ত গন্ধ ছড়াইতেন। আমার স্ত্রী তাঁহাকে বিড়ি ফেলিতে বাধ্য করিয়া, ভৃত্যকে দিয়া একপ্যাকেট খ্যাতনামা সিগারেট আনাইয়া দিতেন।’’

বিভূতিভূষণের প্রিয় ফল ছিল আম আর কাঁঠাল। ভালবাসতেন চাঁপা, বকুল, শেফালি ফুল। বন্য ফুলের মধ্যে পছন্দ ছিল ঘেঁটু আর ছোট এড়াঞ্চি। ঋজু বনস্পতিতেও আকর্ষণ ছিল তাঁর। গাছ আর মেঘমুক্ত রোদের দিনে দিগন্ত— এ সব নিয়েই চলত তাঁর পড়াশোনার নেশা। সাহিত্য পড়তেন। সঙ্গে পড়তেন জ্যোতির্বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান আর উদ্ভিদবিদ্যা। শেষ জীবনে নাকি পরলোকতত্ত্ব নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। পড়াশোনা নিয়েই থাকতেন। তাই সারা বাড়িতে বইপত্র ছড়ানো থাকতো। আলমারিতে গুছিয়ে রাখতে পছন্দ করতেন না।

বাংলা সাহিত্যের এই অসাধারণ মানুষটির দৈনন্দিন রুটিনটাও ছিলো মজার। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতেন। প্রবল গরম হোক বা প্রবল শীত, চলে যেতেন  ইছামতীতে। ফিরে লিখতে বসতেন। প্রথমে দিনলিপি। তার পর চিঠিপত্রের উত্তর। ৭টা নাগাদ প্রাতরাশ। ৯টা নাগাদ স্কুলের পথে যাত্রা। শোনা যায়, গোপালনগর উচ্চ ইংরাজি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে যাওয়ার সময় সদ্য-ভাঙা গাছের ডাল বা বাঁশের কঞ্চি জাতীয় কিছু একটা নিয়ে যেতেন বিভূতিভূষণ। বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে জলযোগ। ইছামতী অথবা বাওড়ের ধারে শক্তপোক্ত গাছের ডালের উপরে গিয়ে বসতেন। খানিক বাদে আবার পড়ানো। প্রতিবেশীদের ছেলেমেয়েরা ভিড় করে আসতো তাঁর কাছে। পড়াতেন, গল্প বলতেন। রাতের খাওয়ার পরে কোনও কোনও দিন আড্ডা দিতে বাইরে যেতেন। বাড়ি ফিরতে হয়তো মধ্যরাত পেরিয়ে যেতো। আর এই পুরো সময়টাই তিনি প্রকৃতিকে নিরীক্ষণ করতেন। বিশেষত, বিকেল আর বেশি রাতে। গাছের ডালে বসে আকাশের বদলাতে থাকা রং দেখতেন। গভীর রাতে দেখতেন গভীর কালো আকাশ।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা
ছবিঃ গুগল