আপনার বেঁচে থাকাটাই একটা মিরাকেল

ডা: অনির্বাণ ঘোষ

আজকে তিনটে ছোট ছোট ঘটনা আপনাদের বলে নেই-

এক.

২০০৮ সালের দোলের দিন,

বছর পনেরোর ছেলেটা বন্ধুদের সঙ্গে রঙ খেলছিলো। এই বয়সটাই যে রঙীন, এই বয়সই বাঁধভাঙার স্বপ্ন দেখায়। তেমনই রঙীন ছেলেটা পাড়ার বাকি সব্বাইকে রাঙিয়ে নিজেও ভূত হয়ে চান করতে এসেছিল টিউব ওয়েলের জলে। এক বালতি, দু’বালতি জল শেষ। তিন নম্বর বালতিটা যখন ভরতে যাবে তখনই..

ওকে যখন প্রতিবেশীরা নীলরতনের এমার্জেন্সিতে নিয়ে এলো তখন ও অচৈতন্য। মুখটা সোনালী বেগুনী রঙে মাখামাখি, দুই হাতেও সেই রঙ। কিন্তু পরণের জামাটা গাঢ় লাল, রক্ত জমাট বেঁধে আছে সেখানে। গলায় একটা গামছাকে কুন্ডলী পাকিয়ে চেপে রেখেছে এক যুবক। সেই গামছা ছাপিয়েও রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে।

বালতি ভরার জন্য অন্যান্য বারের মতোই টিউবওয়েলের হাতলটা যেই নামিয়েছিলো ছেলেটা তখনই অঘটনটা ঘটে যায়। হয়ত কোন নাট বোল্ট শিথিল হয়ে গিয়েছিলো। তাই হাতলটা ভেঙে গিয়ে ছিটকে আসে ছেলেটার দিকে। ধারালো লোহার টুকরোটা গেঁথে যায় ওর গলায়। পাড়ার লোকজন টুকরোটাকে সরিয়ে ক্ষত স্থানটাকে কোন রকমে গামছা দিয়ে চেপে নিয়ে আসে আমাদের কাছে।

আমি সেই সময় নীলরতন সরকার হাসপাতালে সার্জারির ইন্টার্ন৷ ডাক্তারির জ্ঞান খুব কম, কিন্তু এটা বুঝতে পেরেছিলাম যে ছেলেটাকে এক্ষুনি থিয়েটারে নিয়ে যেতে হবে। গলার মধ্যে দুটো বড় ধমনী আর শিরা আছে। ক্যারোটিড আর জুগুলার। তাদের কোনটাতেই চোট লেগে এত ব্লিডিং হচ্ছে। সার্জারির দুজন সিনিয়র দাদার সঙ্গে থিয়েটারে ঢুকলাম। তাদের একজন তখনও গামছাটা চেপে আছে ছেলেটার গলায়। আরেকজন হাতে একটা আর্টারি ফরসেপস নিয়ে তৈরি হলো। গামছাটা সামান্য ফাঁক করলেই সে চট করে ধরে ফেলবে কেটে যাওয়া ধমনীটাকে। এভাবেই রক্তক্ষরণ বন্ধ করা সম্ভব হবে। আর আমার কাজ তখন একটা মোটা গজ দিয়ে ক্ষতস্থানটাকে আবার চেপে ধরা।

প্রথম জন গামছাটা সামান্য সরাতেই ফিনকি দিয়ে রক্তের স্রোত বেরিয়ে এলো। ছিটকে এসে লাগলো আমাদের তিনজনেরই মুখে,গলায়, থিয়েটারের দেওয়ালে। তার মধ্যেই দ্বিতীয় জন চেষ্টা করল ফরসেপস দিয়ে শিরাকে কবজা করার। কিন্তু ওই লাল পুকুরের মধ্যে আলাদা করে কোন কিছুকেই চেনা যাচ্ছিল না। ফরসেপসটা বসানোর পরেও রক্তক্ষরণ হওয়া বন্ধ হলো না। আমি গজ দিয়ে চেপে ধরার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেটা একদম ভিজে গেলো।

কিন্তু হাল ছাড়লে তো চলবে না। আবার গজটা সামান্য সরালাম , আবার সেই রক্তের ধারা বেরিয়ে এলো। আবার চেষ্টা ফরসেপস দিয়ে শিরার মুখ বন্ধ করার, আবার হেরে যাওয়া, আবার গজ চাপা দেওয়া, ফের চেষ্টা..

এভাবে বার তিনেক লড়াই করার মাঝেই অ্যানেস্থেসিস্ট হটাৎ বললেন ‘ক্যুইক! ও কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে যাচ্ছে!’ এবারে আমি ক্ষতটা চেপে ধরলাম। সিনিয়র দাদারা তখন বুকের খাঁচায় চাপ দিচ্ছে বারবার, মুখে মুখে লাগিয়ে শ্বাস দিচ্ছে।

মিনিট তিনেকের মধ্যে সব শেষ।

দুই.

২০১৬ সালের কথা,

চার্লস লামলে তার বান্ধবীকে নিয়ে এক ক্যারিবিয়ান দ্বীপে ঘুরতে গেছে। ওর বয়স ওই তিরিশের আশেপাশে। মেয়েটিকে চার্লস ভালবাসে প্রায় পাঁচবছর ধরে। দুজনে একসঙ্গেই থাকে। বছরে একবার ঘুরতে যায় এক সঙ্গে। তবে এবারের ট্রিপটা চার্লসের কাছে অন্যরকম ছিলো। একদিন দুপুরে সমুদ্র সৈকতেই  চার্লস মেয়েটিকে অবাক করে দিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। মেয়ে তো হ্যাঁ বলবেই! নিজের সঙ্গে করে নিয়ে আসা হীরের আঙটিটাও সেই দিনই ওর বাঁ হাতের আঙুলে পড়িয়ে দিলো চার্লস। দুজনের জীবনেই হয়তো এর চেয়ে আনন্দের দিন আগে কখনো আসেনি। একটা নতুন সংসারের শুরু হল।

সেইদিনই হোটেলে ফিরে চার্লস কাশতে শুরু করে। সেই কাশি আর কিছুতেই থামতেই চায় না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার সঙ্গে শুরু হলো রক্তবমি। রাতের ফ্লাইট নিয়েই ওরা ফিরে এলো ইংল্যান্ডে। হিথরো থেকে সোজা হাসপাতালে। এমার্জেন্সিতে যখন প্রথম চার্লসকে দেখলাম তখনো বেশ হাসি খুশি। শুয়ে আছে বিছানায়, রক্তবমি হওয়াটা কমেছে। কিন্তু মুখটা ফ্যাকাশে লাগছে। হিমোগ্লোবিন বেশ কম। তার মধ্যেও আমাকে মজা করে বলল,

আই হ্যাভ বিন পিউকিং সিন্স আই হ্যাভ ডিসাইডেট টু ম্যারি হার ডক্টর।

সো ইউ আর অলরেডি সিক অফ হার মিস্টার লামলে!

তিনজনেই হাসলাম এতে। চার্লসকে ভর্তি করে নিলাম। কয়েক বোতল রক্ত দিতে হবে ওকে। আর কয়েকটা পরীক্ষা করতে হবে।

পরেরদিনই চার্লসের এন্ডোস্কোপি হল। দেখা গেলো ওর স্টমাকে একটা টেনিস বলের আকারের টিউমার বেশ জাঁকিয়ে বসে আছে। সেটার গা দিয়েই রক্ত বেরোচ্ছিল। দেখেই বোঝা গেল ক্যান্সার। কয়েক ঘন্টার মধ্যে সিটি স্ক্যান ও হল, ক্যান্সার ছড়িয়ে আছে দুটো ফুসফুসে, পেটের ভিতরে চারিদিকে।

এই ঘটনার মাস দুয়েকের মধ্যেই চার্লস মারা যায়। অপারেশন, কেমোথেরাপি কিচ্ছু বাঁচাতে পারেনি ওকে।

 তিন.

এই বছরের মার্চ মাসের ঘটনা,

পর পর চারবার গর্ভপাত হওয়ার পরে ৩৮ বছর বয়সে আবার মা হতে চলেছে মেলিসা জোন্স। মেলিসা পেশায় নার্স। সব কিছু ঠিকঠাকই চলছিলো, কিন্তু মেলিসার যখন সাড়ে পাঁচ মাস তখনই হঠাৎ করেই পেটের ডানদিকে ব্যথা শুরু হল। সে ব্যথার তীব্রতা দিন দুয়েকের মধ্যেই চরম পর্যায়ে পৌঁছলো। তাও দাঁতে দাঁত চেপে তা সহ্য করেছে মেলিসা। নিজের স্বামীর কাছেও লুকিয়ে গেছে কষ্টটাকে। চারদিনের মাথায় সন্ধ্যেবেলায় মেলিসা অজ্ঞান হয়ে যায়, সঙ্গে ধুম জ্বর।

এমার্জেন্সিতে ওকে যখন দেখলাম তখন জ্ঞান ফিরেছে। জ্বর কমানোর ওষুধ দেওয়া হয়েছে। তাও যেন ওর চোখ দুটো ঘোলাটে হয়ে আছে। ওকে পরীক্ষা করতে গিয়ে অবাক হলাম, পেটে সামান্যতম চাপ দিলেও ব্যথায় কঁকিয়ে উঠছে বেচারি। সবচেয়ে বেশি ব্যথা সেই ডানদিকে। রক্ত পরীক্ষাতে ধরা পড়লো ওর শরীরে জীবাণুর সংক্রমণ মারাত্মক। মেলিসার রোগটা বুঝতে পেরেছিলাম আমি, কিন্তু কিছু বলার আগে ও নিজেই আমাকে বললো সে কথা,

-আমার অ্যাপেন্ডিসাইটিস হয়েছে তাই না?!

-সেরকমই মনে হচ্ছে, আপনি বুঝতে পেরেছিলেন?

-হ্যাঁ, ওয়ার্ডে এমন রুগী আগে দেখেছি তো। তিনদিন আগেই পেটের ঠিক ওইখানটাতেই ব্যথা শুরু হলো, তার সঙ্গে বমি বমি ভাব। তার দু’দিন আগেই আমার প্রেগন্যান্সির চেক আপ ছিলো, তখনকার রিপোর্ট একদম ভাল ছিলো। তাই জানতাম বেবির কিছু হয়নি।

-তিনদিন আগে! আপনি এইটা নিয়ে বাড়িতে বসেছিলেন মিসেস জোন্স!

-আমার যে আর উপায় ছিলো না ডক্টর।

-কেন? কেউ ছিলো না আপনাকে হাসপাতালে নিয়ে আসার? এমার্জেন্সিতে কল করলেই তো..

-না সেটা না, ভাবছিলাম যদি একটু সহ্য করতে পারি, যদি নিজে থেকে সেরে যায় ব্যথাটা।

-আপনি নিজে একজন নার্স, ক’জন রুগীকে দেখেছেন অ্যাপেন্ডিসাইটিস হওয়ার পরেও অপারেশন ছাড়াই ভাল হয়ে গেছে?

-আমি জানি সেটা, কিন্তু আমার অপারেশন হলে যে বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সেটা কি করে পারি আমি। তার চেয়ে যদি আর  কয়েকটা সপ্তাহ যদি কষ্টটা সহ্য করতে পারি তাহলে তো ওকে বাঁচানো যাবে!

-মনে হয় না সেই সময় আমাদের হাতে আছে বলে। অপারেশন হয়ত করতেই হবে। সন্তান নষ্ট হলেও আপনি তো বাঁচবেন। আরেকবার না হয় চেষ্টা করবেন মা হওয়ার।

-আমি আটত্রিশ ডক্টর, আপনি নিজেও জানেন আমার আবার মা হওয়ার আশা কতটুকু। প্লিজ এমন কিছু একটা করুন যাতে অপারেশনটা না করতে হয়।

ডাক্তার তো আর ম্যাজিক জানে না। তার বিদ্যার দৌড় ওই স্ক্যালপেল অব্দিই। তবু নিশ্চিত হওয়ার জন্য মেলিসার পেটের একটা আলট্রাসাউন্ড করালাম। গর্ভের সন্তান ঠিকই আছে। কিন্তু অ্যাপেন্ডিক্সের অবস্থা খুব খারাপ। আলট্রাসাউন্ড করার পরে ওয়ার্ডে আনার সময়তেই মেলিসা আবার অজ্ঞান হয়ে গেল। রক্তচাপ কমতে থাকল বিপজ্জনক ভাবে। আর একটাই উপায় হাতে, অপারেশন।

সেদিন মেলিসাকে আর বাঁচানো যায়নি। অ্যাপেন্ডিক্স আগেই ফেটে পুঁজ জমা হয়েছিল গোটা পেটের মধ্যে। সেই অ্যাপেনডিক্স আমরা বাদ দিয়েছিলাম। পুঁজও পরিষ্কার করেছিলাম। কিন্তু অপারেশন চলাকালীনই মেলিসা শকে চলে যায়। সেখান থেকে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট।

যে আগত সন্তানের জন্ম দেওয়ার জন্য মেলিসা এত কষ্ট সহ্য করল সেও পৃথিবীর আলো দেখতে পেল না।

মৃত্যু কেমন? তাকে দেখতে কেমন? শেষ সময়ে শিয়রের কাছে কালো আলখাল্লা পরে দাঁড়িয়ে থাকে সে? জীর্ণ শরীরটাকে ফেলে রেখে আত্মাটাকে নিয়ে ফুরুৎ হয়ে যাবে বলে?

এমন একটা মানুষকে দেখিনি যে কখনও মৃত্যুকে কামনা করেনি। কখনও ভাবেনি, আমি মরে গেলেই ভাল হয়। সব ক্ষেত্রেই এই চাওয়া গুলো কোন একটা কষ্টের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। প্রেমিকা ছেড়ে চলে গেছে, স্ত্রী অন্য পুরুষে আসক্ত, ডিভোর্স আসন্ন, হঠাৎ করে বাজারে অনেক দেনা হয়ে গেছে, কাছের মানুষের আচরণ ব্যথা দিয়েছে অথবা পরীক্ষার ফল খুব খারাপ হয়েছে। শহুরে জীবনের এইসব কারণগুলোর জন্য মৃত্যুকে ডাকাটা বিলাসিতা ছাড়া আর কিচ্ছু না। বিশ্বাস করুন।

কারণ আমি দেখেছি তাকে, খুব কাছ থেকে। প্রতিবার ছদ্মবেশে এসে ধোঁকা দেয় আমাদের। কিন্তু ও যাওয়ার বেলায় চিনতে পারি ওকে। চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে থাকে সেই সময়। মৃত্যু আসলে করাল, ভয়ঙ্কর, নিষ্ঠুর। সব ইচ্ছা, সব স্বপ্ন দুমড়ে মুচড়ে দেয়। আসার আগে জানিয়ে আসে না, এলেও এক দন্ড অপেক্ষা করে না। আপনি এই যে লেখাটা পড়ছেন এখন, এর কয়েক মুহূর্ত পরেই যে আপনার সঙ্গে হয়তো দেখা হয়ে যেতে পারে ওর। হয়তো ও আপনার সঙ্গেই বাসে যাতায়াত করে, রাস্তায় হাঁটে, অফিসে বসে। রাতে যখন ঘুমিয়ে আছেন তখনও হয়ত আপনার দিকে নজর রাখছে। তাই জীবনের তুচ্ছ তুচ্ছ কারণগুলোর জন্যে ওকে না ডাকাই ভাল। কত মানুষ এক একটা দিনের হিসাবে বাঁচতে চায়। প্রতিটা শ্বাসে জড়িয়ে থাকে কত আশা। যে তিনজনের গল্প আজকে বললাম তাদের কেউই কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও মৃত্যুকে কামনা করেনি। তাও তো ওদের বাঁচার ইচ্ছাগুলোর ওপর দিয়ে স্টীম রোলার চলে গেল।

তাই আপনি যখন মেঘলা বিকেলের মনখারাপের সময় ভাবেন, ‘আমি মরে গেলেই ভাল’ তখন নিজের অজান্তেই অযুত কোটি মানুষের বাঁচতে চাওয়া গুলোর অপমান করে ফেলছেন। কারণে অকারণে মৃত্যুকে ডাকবেন না।

মনে রাখবেন, আপনার বেঁচে থাকাটাই একটা মিরাকেল। তার শেষ বিন্দু অবধি শুষে নিন।

ছবি: গুগল