আপুদের পথের ভাই …

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মোটর বাইকে চালকের ব্যাস্ত আঙুল চাপ দিলো ইগনিশন সুইচে। জেগে উঠলো বাইক সশব্দে। চমৎকার স্মার্ট একজন নারী কোনো বাড়ি বা অফিস থেকে বের হয়ে এসে উঠে বসলেন বাইকে। চালক তাকে এগিয়ে দিলো হেলমেট। নারীটি বেঁধে নিলেন হেলমেট।চালকের মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে উঠলো গন্তব্যের ম্যাপ। চলতে শুরু করলো বাইক এই শহরের জটিল যানজট টপকে। ঢাকা শহরের রাজপথে নারী যাত্রী নিয়ে মোটরবাইকের এমন ছুটে চলা এখন আর  বিরল কোনো দৃশ্য নয়।

যানজটে নাকাল এখন ঢাকা। কাজে অথবা গন্তব্যে সময়মতো পৌঁছানোর লড়াইয়ে সবাই এখন পাল্লা দিচ্ছেন ঘড়ির কাটার সঙ্গে। এই যুদ্ধে রাজপথে এখন বাইকের সওয়ারী নারী। এই দৃশ্য আমাদের রাজধানীতে নতুন। বলা যায়, নারীরা আরেকটি চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করলেন ভীষণ সপ্রতিভ ভঙ্গীতেই। সমাজের নানা বন্ধন আর পুরুষের বক্র দৃষ্টিকে উপেক্ষা করেই তারা রাজপথে নিজেদের ভূমিকা নিজেরাই ঠিক করে নিয়েছেন।

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো নারীর সেই নতুন লড়াই নিয়ে নানা কথা। প্রাণের বাংলার পক্ষ থেকে আমরা কথা বলেছি প্রতিদিন এই শহরে বাইকের নারী যাত্রী এবং চালকদের সঙ্গে। তারা তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।  

রুম্পা সৈয়দা ফারজানা জামান

সংকীর্ণতা মনে- আচরণে নয়

লেখক- সাংবাদিক

পাঠাওতে প্রথম চড়া আরেক ছোট ভাইয়ের মাধ্যমে। তখন পর্যন্ত আমার কাছে পাঠাও মানে অপরিচিত ব্যক্তির ব্রেকের শিকার হবার সম্ভাবনা! যাই হোক আমার সেই ছোট ভাই অ্যাপ থেকে যাকে আমন্ত্রণ জানালেন আমি খুব ছোট্ট করে তাকে বলতে বললাম- প্লিজ বলে দাও, একজন মেয়ে তার যাত্রী। ছোট ভাইটি বললো- কোন অসুবিধা নাই্ আমি ফোন নাম্বার নিয়ে বাসার নিচে নেমে এলাম। যিনি এলেন, তিনি পরে আছেন সাদা পায়জামা পাঞ্জাবী, বুক পর্যন্ত দাড়ি এবং বয়স পঞ্চাশের অধিক। এবার আমি পড়লাম চিন্তায়। কারণ ইনি আমাকে নিয়ে যাবেন যাত্রী হিসেবে! তার কাছে গিয়ে বললাম, আমি আজকের যাত্রী। পাশাপাশি এটাও বললাম, আমি কিন্তু আপনার মত করে বসবো! তিনি বললেন, `কোনও সমস্যা নাই মা, যে ভাবে আপনার ভালো লাগে।’

এরপর বাইক থেকে নেমে তার সঙ্গে একটা সেলফিও তুললাম। আমার প্রথম ‘পাঠাও’ বা বাইকে রাইড শেয়ারিং এর সহযাত্রী হিসেবে। এরপর থেকে নিয়মিত ‘পাঠাও’ চড়ি। কারণ বাইক আমার কাছে এই বিজি ট্রাফিকের শহরে সহজ সমাধান। চালকদের নানা ধরণের জটিলতা আছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত `চরিত্রহীন’ এমন চালক পাইনি। বরং রোজ চড়ার সুবাদে আলেম, ক্যাডার, ছাত্র, ব্যাংকার কত যে চালক পেলাম। মনে আছে একজন চালক পেয়েছিলাম যিনি এক মাদ্রাসা শিক্ষক। আমি তাকে বিষ্মিত হয়ে বলেছিলাম, আপনি আমাকে নিয়ে যাবেন! তিনি হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আপু আমার পোশাক দেখে এটা বললেন? আপনাকে নিয়ে যাওয়া আমার কাজ। এখানে আমার পেশা বা পোশাক কোনও বাধা নয়।’ আরেকবার এক নারী চালককে পেয়েছিলাম। তিনি তার  দুই সন্তানকে স্কুল থেকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে বিকেলটা রাইড গ্রহণ করেন। তিনি মেয়ে যাত্রী হলেই রাইড গ্রহণ করেন।

প্রায় বছরেরও বেশি সময় ধরে বাইকে রাইড শেয়ার করে যা মনে হলো- ‘সংকীর্ণতা’ আসলে দেশে বা সমাজে নয়- চলে এসেছে আমাদের মাথায়। আমরাই পোশাক দেখে কাউকে অন্য রকম বিবেচনা করি। বা কখনো কখনো লিঙ্গ আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় অন্তরায় মনে হয়। এ কারণেই হয়তো এখনও অনেক চালক শুধু মেয়ের নাম দেখে আমার পিকআপ রিকোয়েস্টই গ্রহণ করেন না। আবার কেউ হয়তো রাতে দরজা খুলতে দেরি হলে না খোলা পর্যন্ত অপেক্ষা করে আমার বাসায় ঢোকা নিশ্চিত করে তারপর ফিরে গেছেন।

যে  দেশের মেয়েরা অনেক আগে থেকেই দুই চাকা চালিয়ে বা চড়ে অভ্যস্ত সেখানে নতুন করে অন্তরায় ভাবা বা তৈরি করা নিজেদের জন্যই বোকামি। বরং- চালক নির্বাচন না করে দক্ষ, অ্যাপ বোঝে ,প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত বাইকার নামালে এই শহরে মেয়েরা আরও দ্রুত চলাচল করতে পারবে। যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে তাহলে মেয়ে সঠিক সময়ে ফিরতে পারবে বাড়ি! ট্রাফিকের শহরে তো দ্রুত বাড়ি ফেরাই আনন্দের।

 

শাহনাজ পারভীন

রাইডার ভালো পেলে ভয় লাগে না

 সিনিয়র ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট, ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন

মনের মধ্যে আমার তেমন কোনো সংকোচ কাজ করে না।কারণ এটাকেও আমি পরিবহনের একটা মাধ্যম বলেই মনে করি।এই শহরের যানজটে আমরা নাকাল সবাই। সেখানে এভাবে নারীদের বাইক ব্যবহার আমার কাছে একটি ইতিবাচক বিষয়।

আমি পাঠাও, উবার মোটো বেশি ব্যবহার করি বিশেষ প্রয়োজনে। আর মাঝেমধ্যে সহজ, ওভাই ও ব্যবহার করি। কোন কোন রাইড প্রায়ই ক্যাশ ডিসকাউন্ট আবার বিকাশে ক্যাশব্যাক অফার দেয়, এটা খুব ভালো লাগে খরচ অনেক কম পড়ে, সময়ও বাঁচে।  তবে কিছু কিছু সমস্যা তো আছেই যেমন বাইকে যে হেলমেট পরতে বলা হয়, তার বেশিরভাগই থাকে লক খারাপ এবং সুবিধাজনক নয়।এগুলো আমার কাছে তেমন নিরাপদও মনে হয় না। তখনবিরক্ত লাগে। উবার মোটো জ্যামে পড়লে বাড়তি টাকা গুনতে হয়।আর ও বোনের রাইড খুঁজে পাওয়া যায় না। আমি এখনও পর্যন্ত একদিনও পাইনি। তবে বাইকের ক্ষেত্রে রাইডার ভালো পেলে ভয় লাগে না।

একবার এক অনভিজ্ঞ চালক রাস্তার ফুটপাতের ঢালে ফেলে দিয়েছিলো…এছাড়া আমার ভাগ্যে এখন পরযন্ত মন খারাপ করার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি।

লাবনী গুহ,

এখন পর্যন্ত কোন ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি

স্টাফ রিপোর্টার বৈশাখী টিভি

বাংলাদেশে উবারের যাত্রা শুরু হওয়ার এক মাসের মাথায় আমি এই সার্ভিস নিতে শুরু করি। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কোন ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি। মোটামুটি ভালই ছিলো। গাড়ি থেকে মটরসাইকেল সার্ভিসও নিই। প্রথমদিকে দেখতাম ছাত্র এবং কিছু অফিসযাত্রীরা এই সার্ভিস দিতো। এখন অনেক পেশার মানুষ এর সঙ্গে জড়িত। কেউ কেউ আবার মূল পেশা হিসেবেই এটাকেই বেছে নিয়েছেন। আবার বিভিন্ন ওয়ার্কশপে কাজ করে এমন কিছু বাইকারও এই পেশায় মাঝে মাঝে কাজ করেন। এটা বড় একটা সমস্যা। কোম্পানীগুলো শুধুমাত্র মটোরসাইকেল এবং লাইসেন্স থাকলেই পারমিশন দিচ্ছে। কোনরকম যাচাই-বাছাই করছে না। এখন আরেকটি সমস্যা দেখছি, রাস্তায় কিছু বাইকাররা চুক্তিতে যাত্রী নিচ্ছেন। অ্যাপ ওপেন করছেন না। ফলে চুক্তিতে যেতে কখনো ভাড়া বেশি হয়।আবার এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তাও থাকে না। কারণ অ্যাপে কেউ কানেক্ট না থাকায় বাইকার ও যাত্রী কারোরই ট্রেস থাকে না। তবে এ কথা নিশ্চিত ভাবে বলা যায়, পরিবহণ খাতে উবার সার্ভিস নতুন দিক উন্মোচন করেছে। কেননা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাসার কাজ- অফিসের কাজ দুটো সামাল দেয়া আমাদের মতো কর্মজীবী মহিলাদের জন্য খুব কঠিন। ঘন্টার পর ঘন্টা বাসের অপেক্ষা আর উচ্চমূল্যে সিএনজি অটোর ভাড়া দুটো এড়িয়ে এখন যাতায়াত অনেকটা সহজ আর সাশ্রয়ী হয়েছে। আমি পাঠাও এবং উবার মোটো দুটোতেই যাতায়াত করি তবে উবার মোটো তুলনামূলক ভাবে পাঠাওয়ের থেকে ভালো।

 

সেঁজুতি রহমান

নির্দিষ্ট গন্তব্যে সময়মত পৌছাতে পারি

কমিউনিকেশন অ্যান্ড ভিজিবিলিটি এক্সপার্ট

পিআরআইএসএম প্রজেক্ট, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন

আমি পাঠাও, উবার মোটো দু’টোতেই চলা ফেরা করি।এতে তুলনামূলক ভাবে উবার মোটো পাঠাওয়ের থেকে অনেক  ভালো।এই বাহনগুলো ব্যবহার করার সুবিধা- অসুবিধা দুটোই আছে। অসুবিধাটাই আগে বলি,‘মাঝে মাঝে অতিরিক্ত ভাড়া চলে আসে। অনেক ড্রাইভার পরে ইমো, WhatsApp এ নক করে বন্ধুত্ব করতে চায়।অনেকে ঠিক করে রাস্তাই চেনেন না। আর সুবিধা হলো আগে সিএনজি পাওয়া যেতো না, বাসেও ওঠা যেতো না, দেশে এই সার্ভিস আসার পর সিএনজি, বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না, আমি অন্তত আমার নির্দিষ্ট গন্তব্যে সময়মত পৌছাতে পারি।

মাঝে মাঝে অ্যাপস সমস্যা করে।তবে সবথেকে বড়কথা রাইড ক্যান্সেল করলে উবার জরিমানা করে। অথচ যখন গাড়ী আসতে দেরী করে তখন যাত্রীরও যে সময় ক্ষেপন  হয় এটা যেনো কোনো ব্যাপার না। উবার মোটোর এসব একপেশে ব্যাপার বিরক্তিকর।তবে এই বাহনগুলো রবি থেকে বৃহস্পতি পর্যন্ত সকালে অফিসের সময় এবং অফিস শেষে এদের চাহিদা বেশী থাকায় ভাড়াটাও বেশী নেয়, এ বিষয়টা এখন রেগুলার হয়ে গেছে।

শামীম রহমান বাইক চালক। ঢাকার রাজপথে বিভিন্ন রাইড সার্ভিসের হয়ে যাত্রী পৌঁছাতে শহরের এমাথা-ওমাথা চষে বেড়ান। তার কাছে জানতে চাইলাম বাইকে নারী যাত্রী বহনের অভিজ্ঞতা নিয়ে। শামীম প্রথমেই বললেন, আমার কাছে সবাই যাত্রী, সে নারী-ই হোক আর পুরুষ।আমার কাজ হলো যাত্রী পরিবহন।

নারীরা এখন ঢাকার রাস্তায় খুব অবলীলায় মোটরবাইকে চড়ে ছুটছেন গন্তব্যে। শহরের সংস্কৃতিতে এই নতুন সংযোজন কেমন লাগছে জানতে চাইলে তিনি জানালেন, এ বিষয়টা সবার কাছেই নতুন। কিন্তু ঢাকার রাস্তায় যানজটের যে অবস্থা তাতে বাইকে চড়ে অল্প সময়ে কাজের জায়গায় পৌঁছানোর আর কোনো বিকল্প নেই। তাই মেয়েরাও এই সুযোগটা গ্রহণ করবেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমার কাছে ব্যাপারটা ভালোই লাগছে। আমরা চালকরা কোনো নারী যাত্রীকে বাইকে তুললে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করি। চেষ্টা করি যাতে তিনি কোনো ধরণের সমস্যার মুখোমুখি না হন।

সংক্ষিপ্ত আলোচনায় কথা উঠলো নারী যাত্রীদের প্রকৃতি নিয়ে। শামীমের সাফ কথা, মহিলারা বাইকের গতি এবং চালানোর ভঙ্গী নিয়ে কথা বলেন। অনেক সময় চালক কেমন করে চালাবেন সে বিষয়ে অনেক পরামর্শ দেন। এটুকু ছাড়া যাত্রী হিসেবে তারাও খুব ভালো।

শামীমের মতোই বাইক নিয়ে যাত্রী পরিবহন করেন আশফাক সাদেক। নারী রাইডারদের নিয়ে তার-ও খুব একটা অভিযোগ নেই। তার ভাষায়,‘আপু’রা খুবই ভালো। কোনো বিষয়ে তারা ঝমেলা করেন না।’ অনেক পুরুষযাত্রীর সঙ্গে কখনো ঝগড়ার বাধার অভিজ্ঞতা আছে তার। কিন্তু নারী যাত্রীদের সঙ্গে এরকম ঝামেলা কখনোই হয়নি।

আশফাক মেয়েদের বাইক রাইডিং বিষয়টাকে খুব সহজ ভাবেই দেখেন। তিনিও মনে করেন ঢাকার যানজট দিন দিন বাড়ছে। সেখানে মেয়েদেরও অবশ্যই বাইকে চলাচলের সুযোগ নিতে হবে। সবাইকেই তো কাজ করতে হয়।

তিনি জানান, নারী যাত্রী বাইকে উঠলে তিনিও যতোটা সম্ভব তাদের নিরাপত্তা বুঝে বাইক চালানোর চেষ্টা করেন। তিনি কথার শেষে হেসে বললেন, ‘আমরা তো আপুদে’র পথের ভাই।’

গ্রন্থনা: আবিদা নাসরীন কলি

সাক্ষাৎকার গ্রহন: রীতা নাহার

ছবি: তানভীর, রূম্পা, গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]