আবরার হত্যা ও কিছু কথা…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুমা মোদক

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে র‍্যাগিং বা দলীয় রাজনীতির নিষ্ঠুর শিকার আবরার ফাহাদ।
সংবাদ মাধ্যমের সব ট্রিটমেন্টে আবরার ফাহাদকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে মেধাবী ছাত্র হিসাবে। হ্যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যে ছাত্র বুয়েটে পড়ার সুযোগ অর্জন করতে পারে সে মেধাবী বৈকি। আমার প্রশ্ন মেধাবী ছাত্র না হলে এই পিটিয়ে মারার গুরুত্ব হ্রাস পায়? অন্য কারণে অস্বাভাবিক মৃত্যুগুলো কী গুরুত্বহীন!

যারা পিটিয়ে এই হত্যাকাণ্ড টি ঘটিয়েছে তারা মেধাবী নয়? গত কয়দিনে তো দেখা গেছে শিক্ষার ব্যাকগ্রাউন্ড হীন ভ্যানচালকের ছেলেও রয়েছে খুনি ছেলেদের তালিকায়।কেবল মেধার জোরেই তো সে বুয়েট পর্যন্ত পৌছাঁতে পেরেছে।
পিটিয়ে খুন, গুম খুন, মাদ্রাসায় হত্যা, ব্লগার হত্যা সবই এখন বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতা। তবু কেনো আবরার হত্যা এভাবে ছুঁয়ে গেছে আমাদের?
আবরারের প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থান সন্দেহাতীত নয় জেনেও, আবরারের বিলং করা মৌলবাদী ছাত্র সংগঠনটির বিগত দিনের নৃশংস ভূমিকার কথা জেনেও কেনো আবরার আমাদের ছেলে হয়ে উঠেছে?
এর কারণটি একটু খোঁজে দেখা যেতে পারে।মূলত দেশের ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভবিষ্যৎ স্বপ্ন সন্তানকে এই ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানানোর লক্ষনগণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আমরা অভিভাবকরা সন্তানদের সত্যজিৎ রায় কিংবা মার্কেজ হয়ে উঠার স্বপ্ন দেখাই না। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে প্রজন্মের কোন সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করি না।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্লাসের প্রথম দিকের ছাত্র ছাত্রী আর বিত্তবান, ক্ষমতাবানদের সন্তানদের সঙ্গে যে ব্যবহার করে, অন্য ছাত্রদের সঙ্গে তাদের আচরণগত পার্থক্য প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুষ্পষ্ট। ছাত্র হিসাবে পেছনের সারিতে থাকা ছাত্রদের কিংবা বিত্তহীনদের তাচ্ছিল্যের চোখে দেখাই বরং খুব স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ। এ সম্পূর্ণ রেসিস্ট আচরণ। আমরা একজন শিক্ষকও মুক্ত নই পক্ষপাতদুষ্ট এই আচরণ থেকে।
পরিবারের উচ্চাশায় একটি প্রজন্মের যে আত্মকেন্দ্রিক যাত্রা শুরু হয়, শুরু হয় সাফল্যের সোকল্ড অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠার পথ খোঁজা,তার শেষও হয় সেই অর্থবান,বিত্তবান,ক্ষমতা, প্রতিপত্তিশালীদের চোখ টাটানো সম্ভ্রমেই!
আমরা আবরারের মৃত্যুতে দিকভ্রান্ত, কারণ আবরারের মাঝে আমরা আমাদের সন্তানের চেহারা দেখছি,সারা জীবনের স্বপ্ন,সংগ্রাম,ঘাম দিয়ে যে সন্তানকে ‘সফল’ করে তোলার লক্ষ্যে এগুচ্ছি আমরা,সেই সন্তান প্রান দেবে এমন বেঘোর প্রহারে??
এই বাস্তবতা আমাদের আটপ্রৌরে বেঁচে থাকার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে।এই বিচার চেয়ে ঝলসে উঠা মূলত আমাদের অস্তিত্বের সংকট কিংবা সম্পূর্ণ নিজস্ব লালিত স্বপ্ন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থেকে ।মোটেই প্রতিবাদী চরিত্রে রূপান্তরিত হয়ে নয়।
আমাদের পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্র “সাফল্যের” সংজ্ঞা এখানে নির্ধারিত হয় পেশাগত অবস্থান কিংবা অর্থবিত্ত দিয়ে। মোটেই মেধা সৃজনশীলতা দিয়ে নয়। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার যে সম্মান, একজন কোটিপতির যে সামাজিক গ্রহনযোগ্যতা একজন সৃষ্টিশীল শিল্পী কবির তা নেই। অথচ দেড়শো বছর আগের কোন আমলা কিংবা বিত্তবান কে আমরা চিনি না।যেমন জানি দেড়শো বছর আগে জন্ম নেয়া রবীন্দ্রনাথকে। ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট সে তরী,আমার সোনার ধানে গিয়াছে ভরি। আমরা সাময়িক সাফল্যের সংজ্ঞায় বুঁদ হয়ে অক্ষয় ও অমর ‘ফসল’ সোনার ধানের মর্যাদা তাৎক্ষণিক ভুলে আত্মপ্রতিষ্ঠার নেশার চোরাবালিতে হারিয়ে যাই।

ফলে আমরা পারিবারিক ভাবে সন্তানকে লেলিয়ে দেই ভালো ফলাফলের লক্ষ্যের দিকে,যেনতেন উপায়ে।স্কুলের বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ানো থেকে টাকা দিয়ে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র কিনে এনে তাদের হাতে তুলে দেয়া পর্যন্ত কী না করছি আমরা? তাদের সামনে নিজেদের ভঙ্গুর মেরুদণ্ড বেঁকিয়ে নত হয়ে
সামাজিকভাবে যেনতেন উপায়ে অর্থবান, প্রভাব প্রতিপত্তিশালী হয়ে ওঠাদের ঘাড় নুইয়ে অকুণ্ঠ সম্মান জানাই।
তারপর কেনো আমাদের সন্তানদের কাছে আশা করি তারা আদর্শের পরকাষ্ঠা হবে?
এক আবরার হত্যার বিচার, ছাত্র রাজনীতি বন্ধ ইত্যাদি সাময়িক পদক্ষেপে কি যুগের পর যুগ ধরে তৈরি হওয়া ক্ষতের উপশম হবে?
পচন যে গোড়া থেকে,আগা ছেটে এর সমাধান সম্ভব ??
আসুন প্রশ্ন করতে শিখি।সন্তানদের সোকল্ড প্রতিষ্ঠার ইঁদুর দৌড়ে না পাঠিয়ে তাদের মেরুদণ্ড শক্ত করতে শিখাই। একটু বেয়ারা হয়ে তারা ক্ষমতার কাছে নতজানু না হয়ে প্রশ্ন করুক,তার ক্ষমতার উৎস কী!
এই শিক্ষা আপাতত পরিবার থেকেই শুরু করি, আপনি আমি আমরা সবাই মিলেই তো পুরো সমাজ।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]