আবার আসিব ফিরে ঋষিখোলার তীরে

অর্ণব সরকার

“ও নদীরে
একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে
বোলো কোথায় তোমার দেশ
তোমার নাইকি চলার শেষ
ও নদীরে”
তবে আমার এই কাহানির নদীর নামও আছে, দেশও আছে. আবার চলার অর্থাৎ বয়ে যাবার সমাপ্তি না থাকলেও নামের সমাপ্তি আছে. নামটি হলো ” ঋষিখোলা অথবা ঋষিনদী”. দেশ হলো সিকিম আর বাংলার সংযোগস্থল অর্থাৎ নদীটির একদিকে সিকিম আর অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ. প্রায় অধিকাংশ নদী বা জলধারার যেমন বয়ে যাওয়া শেষ হয়না কারণ নদী কোনো না কোনো নদীতে বা সাগরে অথবা কোনো মহাসাগরে মেশে. এক্ষেত্রেও ঋষিনদীটিও রংপোনদীতে মিশেছে আর সেখানেই তার নামেরও পরিসমাপ্তি ঘটেছে. যাই হোক এতো গেলো কাহানির প্রধান চরিত্রের পরিচয়, এই প্রধান চরিত্রটির কারণে যে কাহানির উৎপত্তি চলুন সেটাই এবার শুরু করা যাক

আমার কাছে সপ্তাহের সবচেয়ে খুশির দিন শনিবার কারণ পরের দিনটাই পুরো সপ্তাহের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত দিন “রবিবার”. ওই যে বলে না সবকিছুই ” আসছে আসছে ” সেটাই সবচেয়ে আনন্দের. এই রকম একটা শনি- রবিবার এর জন্য ঋষিখোলা-কে বেছে নিলাম. অনেকের কাছেই এই জায়গাটি সম্পর্কে শুনেছি বিশেষত যারা সিল্করুট ভ্রমণে যান। আর বাকি কিছু তথ্যের জন্য তো google দাদু তো ছিলই। সকাল সকাল শিলিগুড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম, আজ আবার আকাশ টাও একটু মুখ টা ভার করে রেখেছে, মনে হচ্ছে এই কাঁদলো বলে। ওপরওয়ালাকে ডাকতে ডাকতে পথ চলা শুরু করলাম। শিলিগুড়ি পার করে সেবক এর জঙ্গল এরিয়া শুরু হতেই দেখলাম গাছ গুলো না না রকম ফুলে ভরে আছে। হাওয়ার সঙ্গে নানা রঙের ফুলের পাপড়ি গুলো চারিদিকে উড়ছে। সে কি যে নয়নাভিরাম দৃশ্য তাহা এখানে বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নেই। এর মধ্যে যেটা না হবার সেটাই হলো, এক দুই ফোটা করে আকাশ কাঁদতে শুরু করলো। রেগে মনে মনে বললাম “তোমার আমার প্রতি এতো কিসের হিংসে হে, সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি না বলে”? কোনো উত্তর না দিয়ে কান্নার বেগ আরও কিছুটা বাড়িয়ে দিলো। বাধ্য হয়ে বাহনটিকে পাশে দাঁড় করিয়ে ঢাল-তলোয়ার (Rain-coat) যেই না বের করেছি আর অমনি তার কান্না বন্ধ”। মজা করার আর সময় পেলে না এখনই করতে হলো”। যাই হোক সব কিছু ব্যাগে ভরে এই সুযোগে যত দূর যাওয়া যায় চলতে শুরু করলাম। সেভক মন্দির পার করে বাগপুল(coronation Bridge) ডানদিকে ছেড়ে এগিয়ে চললাম সিকিমের দিকে। শেষের কিছু দিন পাহাড়ে বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় তিস্তাও আজ কিছুটা উত্তাল হয়ে উঠেছে। সেই সুযোগে adventure প্রিয় মানুষদের ভিড় জমেছে তিস্তাবাজার, মেল্লিতে। জিপের মাথায় বোট নিয়ে তারাও চলেছে rafting করবে বলে। মেল্লি তে কিছুক্ষন দাড়িয়ে তাদের adventure এর সাক্ষী হলাম সঙ্গে একটু জিরিয়ে নেওয়া ও গেলো।আবার চলা শুরু করলাম, যেতে যে হবে অনেকটা এছাড়াও পেটপূজোও তো করতে হবে। মেল্লি থেকে রংপো পর্যন্ত ধীরে ধীরে তিস্তা আমাদের খুব কাছে চলে আসে কারণ আস্তে আস্তে নদীর সঙ্গে রাস্তার উচ্চতার তফাৎ টা কমতে থাকে, যেন মনে হয় ” ইশ হাত টা যদি একটু লম্বা হতো রাস্তা থেকেই যেন তাকে ছুটে পারতাম। যেতে যেতে প্রতিটা বাঁকেই তিস্তা কে আরও সুন্দর লাগছিলো। রংপোর কিছুটা আগে একটা জায়গায় bike টা দাঁড় করলাম। মাঝখানে তিস্তা একপারে আমি আর অন্যপারে সবুজ মাঠ যেন গালিচা বিছানো। স্বর্গ-উদ্যান না দেখে থাকলেও মনে হয় এই রকমই হবে। এরপর একটু এগোতেই পৌছালাম রংপো bridge যা সিকিম আর বাংলার আর একটি সীমানা। প্রতিবারের মতো এবার ও bridge টা পার হবার সময় এক অদ্ভুত আনন্দের স্রোত বয়ে গেলো শরীরে। রংপো পৌঁছে দুজনেই পেটপুজো সেরে নিলাম। রংপো মোড় থেকে রাস্তা টা দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। বাম দিকে চলে যাচ্ছে singtam হয়ে Gantok আর ডানদিকের রাস্তাটা উঠে যায় rorathang, Rongli, রেহেনক। আমি ডানদিকের রাস্তা টা ধরলাম। রাস্তার ডানদিক দিয়ে বয়ে চলেছে রংপো নদী। এই রাস্তা ধরেই অনেকটা যাবার পর রাস্তা টা দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায় সোজা চলে যাচ্ছে Rongli আর ডানদিকে উঠে যাচ্ছে রেহেনক-ঋষি যাবার রাস্তা। দ্বিতীয় রাস্তা টি ধরে এগিয়ে চললাম আগে একটি Fuel station আসবে সেখান টি রাস্তাটি তিনভাগে ভাগ হয়ে যায় সোজা চলে যাচ্ছে Rehenok। বামদিকে কিছুটা পেছনের দিকে চলে যাচ্ছে Rongli যাবার অন্য আর একটি রাস্তা, আর ডানদিকে যাচ্ছে ঋষি হয়ে pedong – kalimpong যাবার রাস্তা। কিছুটা এগোতেই এলো ডানদিকে ঋষিখোলার ধারে resort গুলি তে যাবার রাস্তা। এই রাস্তাটি পুরোটাই মাটির ও পাথুরে। শেষ অবধি ধীরে ধীরে পৌছালাম ঋষিখোলার ধারে। নদীর একপাড়ে সিকিম আর অন্যপারে বাংলা। নদীতে ভালো জল থাকার কারণে bike টিকে এই পাড়েই রাখতে বাধ্য হলাম। তার পর বাঁশ আর গাছের ডাল দিয়ে গ্রামের লোকেদের তৈরী সাঁকোর ওপর দিয়ে নদী পাড় করলাম। room book না করে রাখার কারণে কয়েকটি homestay তে খোঁজার পরেই Rajesh জির Homestay তেই একটা রুম পাওয়া গেলো। সেখানেই ব্যাগ-পত্র রেখে নিচে এসে দেখি খাবার টেবিলে গরম গরম খাবার Ready। রান্নার তারিফ করতে গিয়ে জানতে পারলাম সোনাম দা অর্থাৎ Homestay এর রাঁধুনি শিলিগুড়িরই বাসিন্দা সঙ্গে আরো দুজন ভাই থাকে যাদের আতিথিয়তা আপনাকে মুগ্ধ করবে। বিকেল টা sudesh ভাই আর তার পোষ্য Emo -র সঙ্গে এদিক ওদিক ঘুরে কাটালাম। সন্ধ্যাবেলায় সবাই তারা রান্নাঘরে ব্যাস্ত থাকায় অনুমতি নিয়ে আমিও তাদের রান্নাঘরে প্রবেশ করলাম আর চা খেতে খেতে সবার সঙ্গে আড্ডা জমালাম। জানলাম এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা, ভালো-মন্দ, আনন্দ-উৎসব আরও কত কিছু। সত্যি সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। সঙ্গে চললো কাঠের জ্বালে রান্না। গল্পে গল্পে ঘড়ির কাটা রাত ৯.৩০ পাড়। অন্যান্য tourist দের রাতের খাবার প্রায় শেষের দিকে। অগত্যা আসরে ভঙ্গ দিয়ে রাতের খাওয়া টাও সেরে নিলাম।

কাল যে ফেরার পালা তাই ভাবলাম যার জন্য এতো দূর আসা একবার তার রাতের রূপ টা কাছ থেকে দেখে আসি। Homestay থেকেই তার গর্জনের সঙ্গে বয়ে যাবার উপলব্ধি করতে পারছিলাম। রাতের বেলায় নদীর জলে পা ডুবিয়ে পাথরে বসে থাকার ইচ্ছেটাও পূর্ণ করলাম। কিছুক্ষন পর পেছন থেকে SUDESH ভাই ডেকে বললো ” ভাইয়া ইহাপে লোমড়ি(শিয়াল) কা থোড়া ডর হে, সামাল কে” আমিও বললাম ” হাম, শিলিগুড়ি কা লোগ আভি চিতা কে সাথ রাহেতে হে ” ( প্রসঙ্গত পরপর দুটি চিতাবাঘের দেখা পাওয়া গেছে শিলিগুড়িতে) ,সবাই হেসে বলল ” হা ইয়ে সহি বাত হে “। এভাবেই মধুরেণ সমাপয়েৎ ঘটলো। পরের দিন PEDONG – KALIMPONG হয়ে ফিরে এলাম। বাকি টা তো ফিরে আসার গল্প তার আর কি বর্ণনা দেব পুরোটাই মন খারাপের। তবুও জীবনানন্দ দাশের কথার ছলে কথা দিয়ে এলাম- ” আবার আসিব ফিরে ঋষিখোলার তীরে”।

প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য: শিলিগুড়ি থেকে ঋষিখোলার দূরত্ব: ভায়া রংপো(সিকিম) প্রায় ১০০ কিমি । ভায়া পেডং- প্রায় ১০৭ কিমি ।
রাস্তার অবস্থা: শিলিগুড়ি থেকে রংপো পর্যন্ত ভালো, রংপো থেকে ঋষির মূল রাস্তা পর্যন্ত ২০কিমি রাস্তা বেশির ভাগ টাই ভালো কোথাও কোথাও একটু খারাপ, তবে ঋষির মুল রাস্তা থেকে নদীতে যাবার পথ টি খুবই খারাপ.
গাড়ী ভাড়া: শিলিগুড়ি থেকে ঋষিখোলা প্রায় ৩৫০০/–৪০০০/-, এছাড়াও শেয়ার গাড়ী তে অথবা বাস এ রংপো, সেখানথেকে শেয়ার গাড়ী তে ঋষির মূল রাস্তা, সেখান থেকে হেটে RESORT গুলিতে যেতে হবে.
থাকার জায়গা: অনেক হোমস্টে আছে, নেটে এই কন্টাক্ট নং পেয়ে যাবেন- ( তবে সব হোমস্টে তেই শীতকালে গাড়ি পৌঁছে যায় তবে নদীতে জল বাড়লে বাঁশের BRIDGE পাড় হয়ে যেতে হয়, অনেক সময় জলের স্রোতে বাঁশের BRIDGE টি ভেসে গেলে প্রায় ৩০-৪৫ মিনিট এর পথ হেটে পৌঁছতে হয় HOMESTAY গুলিতে)
থাকার খরচ- জন প্রতি থাকা-খাওয়া সমেত ৮০০-১০০০ টাকা.( সব তথ্যই ২০১৮ মে মাস অনুযায়ী)

ছবি: লেখক