আমজাদ হোসেনের সঙ্গে আমার বাজি ধরার কাহিনিটা

লুৎফর রহমান রিটন,লেখক

চ্যানেল আই অফিসে প্রযোজক জামাল রেজার কামরায় তুমুল আড্ডা জমিয়েছিলাম আমাদের চলচ্চিত্রের মাল্টিডাইমেনশনাল ক্যারেক্টার আমজাদ হোসেনের সঙ্গে। সময়কাল মার্চ ২০১৬। ভার্সেটাইল প্রতিভা আমজাদ ভাই। সেদিনের আলোচনার অলিখিত বিষয় ছিলো আমাদের সিনেমায় আমজাদ হোসেনের লেখা দুর্দান্ত সব গান। একক বক্তা আমি। মূখ্য শ্রোতা আমজাদ হোসেন। সঙ্গে আছেন গবেষক আহমাদ মাযহার। আমার বিরামহীন কথার তোড়ে মুগ্ধ বিস্ময়ে মাঝে মধ্যে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ছিলেন হাস্যোজ্জ্বল আমজাদ হোসেন। আমার প্রিয় আমজাদ ভাই।

এক পর্যায়ে আমি ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ছবির ‘আইছে দামান সাহেব হইয়া/বইছে মাথায় রুমাল দিয়া/ঘুমটা খোলার আগে তোমায় করি গো সাবধান/চান্দের আলো দেইখ্যা তুমি হইও না অজ্ঞান’ গানটা নিয়ে পড়লাম।

গানটির কথায় ও সুরে আমাদের গ্রাম বাংলার চিরচেনা সংস্কৃতির নির্দয় নিষ্ঠুর প্রেক্ষাপট এবং বিয়ের অনুষ্ঠানে পাত্রপক্ষ কর্তৃক পাত্রীপক্ষকে পীড়ন ও ঠকানোর বিষয়টিকে উপজীব্য করা হয়েছিলো। আমার ‘ফ্রেম টু ফ্রেম’ বর্ণনা আর বিশ্লেষণে আমজাদ ভাই রীতিমতো মুগ্ধ–তুমি তো মিয়া সাংঘাতিক!
আমার সিনেমা নিয়ে এর আগে তোমার সঙ্গে অনেকবার আড্ডা দিয়েছি। আমার সিনেমার দর্শক হিশেবে তুমি দুর্ধর্ষ সেটা আমি জানতাম কিন্তু আমার গান নিয়েও তোমার এতো আগ্রহ আর এতো বিস্তারিত নলেজ সেটা আমি ধারণাও করি নাই।

আমি বললাম, আহা কী লিখছেন আমজাদ ভাই–‘দামান মিয়া কিপ্টার ব্যাটা/ শাড়ি আনছে বহর খাটা/ গয়না দিছে সদরঘাটের নকল সোনা/ মনে করছে গরিব মানুষ চিনতে পারবে না…’
আমজাদ ভাই, এই শেষ লাইনটায় এসে বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। ধনীরা চিরকাল গরিবদের ঠকিয়ে এসেছে। ঠকানোর সেই বর্ণনায় আপনি যে উপমা ব্যবহার করেছেন তা এক কথায় বিস্ময়কর রকমের ইফেক্টিভ। মনে করছে গরিব মানুষ, চিনতে পারবে না। হ্যাঁ। চিনতে না পারারই কথা। স্বর্ণ বা সোনা গরিবরা চেনে না। এমন কি নকল সোনা ধরিয়ে দিলেও ব্যাটারা বুঝতেই পারে না ওটা আসল না নকল। স্বর্ণের মতো দেখতে হলেই হলো। এই যে সামাজিক বৈষম্য, এই যে দু’টি শ্রেণি চরিত্র, এই দু’টি শ্রেণি চরিত্রের চিত্রায়ণে মাত্র একটি পঙ্‌ক্তি–”মনে করছে গরিব মানুষ চিনতে পারবে না”–শোনার পরে বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চিনচিনে মোচড় আর চোখের ভেতর কয়েক ফোঁটা অশ্রুর টলটলে উপস্থিতি আমি টের পাই। টের পেয়েছিলাম মধুমিতা সিনেমা হলে বসে, আটত্রিশ বছর আগে, ১৯৭৮ সালে। ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ মুক্তি পেয়েছিলো সে বছর। আপ্নে একটা জিনিস আমজাদ ভাই!

এবং এর পরের প্যারাতেই আপনি লিখছেন–রেলি সাইকেল চাইছে মিয়া/দশ গ্যারামের ধনী হইয়া/ তার বদলে দিতে আইছে পিতলের বালি/ এমন দামান মিয়ার মুখে দিলাম চুন কালি…”
আহা আমজাদ ভাই দুর্দান্ত। সোনার বদলে পিতলের গহনা দিতে এসেছে পাত্রপক্ষ, ঠাট্টার ছলে বলা বা গাওয়া হলেও এই গানটাই প্রতিষ্ঠিত করে দেয় আমাদের সমাজ কাঠামোয় ধনী গরিবের বৈষম্য আর গরিবের নিত্য ঠকে যাবার ধারাবাহিক ইতিহাসটা।

আমার স্মৃতিশক্তির ভূয়সী প্রশংসা করলেন আমজাদ ভাই । বললেন তুমি যেভাবে লাইন ধরে ধরে প্রতিটা প্যারা মুখস্ত বলে গেলে তাতে আমি অবাক না হয়ে পারিনি। আমার দীর্ঘ চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে এ পর্যন্ত আমাকে এরকম অবাক কেউ করতে পারেনি। কিন্তু একটা জায়গায় সামান্য একটু ভুল হয়েছে তোমার। তুমি বলেছো—-‘দামান মিয়া কিপ্টার ব্যাটা/ শাড়ি আনছে বহর খাটা’। আসলে আমি লিখেছিলাম–দামান মিয়া কিপ্টার ব্যাটা/ছোনো আনছে আঠা আঠা। এইখানে তোমার সামান্য ভুল হয়েছে। হতেই পারে।

আমি বললাম,–উহু আমজাদ ভাই। আমার মনে হয় ভুল হয়নি। আপনার লেখা গানে অই প্যারাটায় ‘দামান মিয়া কিপ্টার ব্যাটা/ শাড়ি আনছে বহর খাটা’ই ছিলো। ছোনো আনছে আঠা আঠা অন্য প্যারায় ছিলো। আমি বাজি ধরতে পারি। ধরবেন বাজি? নগদ একশো টাকা। যে জিতবে সে পাবে একশো টাকা।

বন্ধু আহমাদ মাযহার হই হই করে উঠলো–আমজাদ ভাই খবরদার গান নিয়া ওর সঙ্গে বাজি ধইরেন না। গান নিয়া বাজিতে রিটন কখনো হারে না।

আমজাদ ভাই মাযহারের কথাকে ফুঁ মেরে উড়িয়ে দিলেন–আমার লেখা গান আর জিতবে রিটন? এইটা হতেই পারে না। ধরলাম বাজি। ডান।

কিন্তু প্রমাণ করবা ক্যাম্নে?
জামাল রেজাকে বললাম–ওর স্মার্ট ফোনে ইউটিউবে গানের কলিটা লিখে সার্চ দিতে। খুব দ্রুতই জামাল খুঁজে পেলো গানটা। অতপর প্লে বাটনে ক্লিক করতেই ফুল ভল্যুমে বেজে উঠলো আইছে দামান। আমরা সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে গানটা শুনছি। দেখছিও। বউয়ের সাজে ববিতা। তাঁর পাশে বালিকা তারানা হালিম ও অন্যান্য সখিবৃন্দ। বিখ্যাত অভিনেত্রী আনোয়ারা ঠোঁট মেলাচ্ছেন নীনা হামিদের কণ্ঠের সঙ্গে–‘দামান মিয়া কিপ্টার ব্যাটা/ শাড়ি আনছে বহর খাটা/ গয়না দিছে সদরঘাটের নকল সোনা/ মনে করছে গরিব মানুষ চিনতে পারবে না…’

হুর্‌রে…

আমি জিতে গেলাম। হতবাক আমজাদ ভাই ধরা পড়া কিশোরের মতো মুখ টিপে হাসছেন–এইটা কী হইলো!

মাযহার বললো–আমি আগেই আপ্নারে সাবধান করছিলাম আমজাদ ভাই ওর সঙ্গে বাজিটা ধইরেন না। দেখলেন তো!

আমজাদ ভাই হাসেন। পরাজিতের অপরূপ হাসি। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে আমি হাত বাড়াই–আমজাদ ভাই টাকাটা…

নড়েচড়ে বসেন আমজাদ ভাই–আরে! সত্যি সত্যি একশো টাকা দিতে হবে নাকি তোমাকে!

হ্যাঁ। দিতে হবে।

পুরা একশো টাকাই নিবা?

হ্যাঁ। কোনো দামাদামি নাই।

না মানে না নিলে হয় না?

না হয় না। বাজির টাকা না নেওয়া গঠনতন্ত্র বিরোধী। ওটা দিতেই হবে।

মাপ কইরা দেওন যায় না জ্যাডা? (এটা আমজাদ হোসেনের বিখ্যাত ডায়ালগ, বিটিভির জব্বর আলী সিরিজ নাটকের।)

না বাজির টাকায় মাপের কারবার নাই। একদাম। একরেট।

অতঃপর আমজাদ ভাই তাঁর মানিব্যাগ খুলে একটা একশো টাকার নোট আমার হাতে অর্পণ করলেন।

ঐতিহাসিক সেই দৃশ্যটা মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ধরে রাখলো আহমাদ মাযহার।

মাযহারের তোলা আমাদের সেই হাস্যোজ্জ্বল ছবিটার দিকে তাকিয়ে আজ সারাদিন কতোবার যে অশ্রুসিক্ত হলাম!

প্রিয় আমজাদ ভাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া একশো টাকার সেই নোটটা আমি খরচ করিনি। সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি কানাডায়। অনেক যত্নে ওটা রেখে দিয়েছি। ওই নোটটায় আমজাদ ভাইয়ের স্মৃতির স্পর্শ লেগে আছে।

গুডবাই আমজাদ ভাই…

অটোয়া ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮

ছবি: গুগল