আমরা লাইটহাউস

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

এক একটা দিন বড় বেদনার হয়, এক একটা দিন বড় আনন্দের হয়…। এক একটা দিনে সব চেনা-অচেনা-ভাল-খারাপ-চাওয়া-পাওয়া-আশা-হতাশা মিশে যায় দিন-শেষের কালো কফির কাপে…। এক একটা দিনের ব্যক্তিগত রক্তপাতের মুখে ভালোবাসা-গাছের পাতা থেঁতো করে পরম যত্নে বুলিয়ে দেয় নেহাৎই অপরিচিত কিছু হাত…। এক একটা দিনের শেষে মানুষ নিজেই গাছ হয়ে যায়…।

আজ আমাদের পিকনিক ছিল…।
আমার ক্ষেত্রে এই মরসুমের প্রথম পিকনিক, আর সম্ভবত শেষও…। আমাদের পিকনিক মানে এই আমাদের…। যাঁরা এই ক’দিন আগে রাতভর কম্বলের বোঝা টেনে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন না, শহর-মফস্বলের রাস্তা-ফুটপাথ-স্টেশন জুড়ে…? তার পর ওই যাঁরা ফালাকাটার কাদম্বিনী চা বাগানের চা-শ্রমিকদের কম্বল দিয়ে এলেন… তার পর যাঁরা আরও নানা সময় নানা রকম কাজে সব ফেলে ছুটে বেড়ান কিন্তু আমার মতো ফলাও করে লেখেন না আর কী…

এই আমি-তুমি-সে-তারা মিলে যে ‘আমরা’ হয়েছি, তাদের পিকনিক…। বেশির ভাগ মানুষই বেশির ভাগ মানুষকে দেখল প্রথম বার…। দেখল। চিনেছে অবশ্য আগেই…। কাজের জন্য বারবার হাতে হাত বেঁধে পাশাপাশি দাঁড়িয়েছে যে সবাই…। আমাদের একটা নাম আছে বটে, লাইটহাউস। কিন্তু নামের এখনও কোনও অফিসিয়াল স্বীকৃতি নেই বলে নিজেদের নাম-বন্দি করি না…। আমরা-আমরা করেই কাজ চালাই…। আমরা শব্দটাও আসলে খুব প্রিয় আমাদের…।

তো পিকনিক যেমন হয়… ব্যাডমিন্টন, কফি, কচুরি, মাংস-ভাত, আড্ডা, পেছনে লাগা, ফুটবল— আরও কত কী…। সবই তো চেনা, নতুন শুধু মানুষগুলোকে কাছ থেকে দেখা…। যে মালিদিদিকে ভার্চুয়ালি খুব মা-মা মনে হতো, আজ কাছ থেকে দেখলাম তিনি মা-মা নন, মা-ই…। সমিতদাকে একটু রাগী মনে হতো…। আজ কেমন চোখে চোখ রেখে কথা বলে নিলাম, বেশ সিরিয়াস একটা বিষয় নিয়ে…!
কাঞ্চন, বাদলদা, অদিতি, স্বরলিপি, পরিচয়, মাহি, রিমা, আহেলী, সোহন, রাজা, পথিকৃৎ, মিঠুনদা, মলয়, শুভজিৎ, রাজাদা, সংযুক্তাদি, দোলনদি, শিপ্রাদি, শিল্পীদি, বাপাইদা— এদের তো আগেই চিনতাম (জানি না কাকে কাকে বাদ দিলাম)। আর নতুন করে চিনলাম অভিভাবক-সম শৌভিকদা, সঞ্জীবদা, সলিলদা, সুজয়দাকে…। সুস্মিতা আর মোহনা, দুই পুচকিকেও প্রথম দেখলাম… সেই কৃষ্ণনগর থেকে এসেছিল ওরা…।

আজ বিশেষ প্রাপ্তি ছিল Sayantan-এর উপস্থিতি…। ওর হাত ধরে পরের একটা বড় কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা…।
দৃষ্টিহীন পড়ুয়াদের প্রবল অসুবিধার জায়গা— রিডার এবং রাইটারের অভাব…। আমরা স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েদের নিয়ে একটা ‘রিডার-রাইটার ব্যাঙ্ক’ তৈরি করার কথা ভেবেছি…। কারণ শুধু এই সুবিধাটুকুর অভাবে বহু দৃষ্টিহীনের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেতে বসেছে…। কী ভাবে কাজটা হবে, সে বিষয়ে পরে জানাব… সেই হাত বাড়াব এই ফেসবুকের জানলাতেই…।

ভেতরের ছবি-jan-4.1

পিকনিকের ছবি

তার পর…

দিন ফুরোলে সন্ধে নামে, সন্ধে নামলে ঘরে ফিরতে হয়…। আমার মতো হতভাগ্য কাউকে কাউকে অবশ্য অফিসে ফিরতে হয়…।

তো সেই ফেরার আগে নন্দন চত্বর।
সঙ্গে বেঁচে যাওয়া বেশ কিছু পরিমাণ খাবার, গুছিয়ে প্যাক করা…। পিকনিকের পর উদ্বৃত্ত খাবারটুকু ফেলে না-দিয়ে রবীন্দ্র সদন এলাকার ফুটপাথে থাকা বাচ্চাগুলোকে খাইয়ে দেব বলে ঠিক করেছিলাম আমরা…। নন্দন চত্বরে একজোট হয়ে কাঞ্চন আর সোহন চলল বাচ্চাদের ডাকতে…।
কাঞ্চন বলল, ‘‘তিয়াষদি তুমিও চলো, মায়ের মতো করে বাচ্চাগুলোকে ডেকে আনবে…।’’ এই ঝাঁকড়া চুল, কপাল জোড়া সবুজ ফেট্টি আর জ্বর আসব-আসব লালচে চোখ দেখে যে কী করে আমায় মায়ের মতো মনে হল ওর, ঈশ্বর জানেন…!
বস্তুত ছেলেধরার মতো বেরোলাম, মায়ের মতো নয়…। প্রচণ্ড ঠান্ডায় হোক বা রবিবার বলেই হোক, বেশির ভাগ ফুটপাথবাসীই তত ক্ষণে শুয়ে পড়ার তোড়জোড় করছেন…। তার মধ্যে থেকেই জনা বারো বাচ্চাকে ডেকে আনলাম আমরা…। খুব ছানা যারা, তাদের মায়েরাও সঙ্গে এলেন…।

—দিদি, কী খাব গো?
—ভাত খাবি। মাছ দিয়ে…
—আমি চাউমিন খাব।
—চাউমিন খায় না…। আগে ভাত, পরে চাউমিন…।
—চাউমিন সস্তা…।
—কী করে জানলি?
—এইটুকুতে পেট ভরে যায় যে!

ফুটপাথের শৈশব পুষ্টি বোঝে না, পেট-ভরা বোঝে শুধু…।

-jan-4.1-2017

ফুটপাথের বাচ্চাদের খাওয়া

গগনেন্দ্র প্রদর্শনশালার ঠিক পেছন দিকটায় যে ফাঁকা জায়গা, সেখানে সার দিয়ে বসেছে ধুলো মাখা ছোট ছোট মুখগুলো…। কোমরে আঁচল বেঁধে মাঠে নেমে পড়েছে আমাদের দিদিরা…। দাদারাও দাঁড়িয়ে নেই…।
জায়গাটায় কিছু বেঁটে বেঁটে আবছা আলো লাগানো রয়েছে সার দিয়ে…। তবে ওই ছোট ছোট মুখগুলোয় জ্বলা আলোর কাছে তা নেহাৎই ম্লান…।

আর সেই আলো-মুখগুলো ঘিরে ‘ওরে এখানে ডাল আন না!’, ‘মাছটা এ বার দিয়ে দে।’, ‘আর দু’টো কচুরি নিবি?’— এই করতে করতে ছুটে বেড়াচ্ছে একগাদা মানুষ নয়, গাছ…। ছায়া-মায়া দিতে দিতে কিছু মানুষ এ ভাবেই গাছ হয়ে যায়…।

আমার শরীর, মন দু’টোই আজ চূড়ান্ত খারাপ…।
চরম গলাব্যথা, সর্দি, কোমরে চোট। তার পর অফিসে এসে কয়েক ঘণ্টা এসি-তে কাটানোর পর যে জ্বরটা সারা দিন ধরে টুকি টুকি করছিল, সেটাও কপালে-গলায়-গালে বিছিয়ে গিয়েছে বেশ পুরু করেই…।
আজ ভাল নেই আমি…।

তবে অনেক ক্ষণ অনেকগুলো ভালমানুষের সঙ্গে সময় কাটিয়ে যে আন্তরিকতার উত্তাপ মনে বিছিয়ে যায়, তা শরীরের জ্বরের চেয়ে ঢের বেশি…।
তাই, আজ ভাল আছি আমি… 🙂

ছবি: লেখক